ক্যাম্প ন্যুতে শেষ পর্যন্ত গোলই সবকিছু। খেলার ছন্দে নয়, বরং গোল করার নিখুঁত দক্ষতায় কঠিন এক ম্যাচের সমাধান করল বার্সেলোনা। লামিনে ইয়ামালের একটি এবং রাফিনিয়ার জোড়া গোলে অ্যাস্টন ভিলাকে হারিয়েছে হান্সি ফ্লিকের দল। অন্যদিকে, তরুণদের নিয়ে গড়া উনাই এমেরির দলকে হারাতে বার্সেলোনাকে বেশ কঠিন পরীক্ষাই দিতে হয়েছে।
লামিনে এখন শুধু প্রতিভাবান ফুটবলার নন, প্রতিপক্ষের ভুল কাজে লাগাতেও বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছেন। আর রাফিনিয়া যেন গোলের নেশায় মেতেছেন। অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯-এ। ম্যাচের প্রথমার্ধে লামিনের গোলটি আসে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ভুল থেকে। বিরতির পর রাফিনিয়া করেন বাকি দুই গোল। তাতে জয় নিশ্চিত হলেও পুরো ম্যাচে বার্সেলোনার খেলা খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না।
ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে রদ্রির চোট। বিরতির সময় তাকে তুলে নিয়ে মাঠে নামানো হয় মার্ক বার্নালকে। দীর্ঘদিন পর ক্যাম্প ন্যুতে ফিরে নিজের উপস্থিতি বেশ ভালোভাবেই জানান দেন এই তরুণ মিডফিল্ডার।
প্রথমার্ধের খেলা অনেকটা চ্যাম্পিয়নস লিগের চেয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচের মতো মনে হয়েছে। অ্যাস্টন ভিলার শারীরিক শক্তি, গতি এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলে শুরু থেকেই চাপে ছিল বার্সেলোনা। ম্যাচের আগে চ্যাম্পিয়নস লিগের সংগীত বাজানো হয়নি। যিশুস দে মিগেল ও উর্দার ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর খেলা শুরু হতেই আনুষ্ঠানিকতার রেশ কাটিয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইংলিশ দলটি।
প্যারিসে হারের পর এই ম্যাচে জয় পাওয়া বার্সেলোনার জন্য জরুরি ছিল। বিশেষ করে গ্রুপে ম্যানচেস্টার সিটি ও কোমোর মতো প্রতিপক্ষ থাকায় পয়েন্ট হারানোর সুযোগ ছিল না। কিন্তু চাপ ও দায়িত্বের ভার যেন দলটির স্বাভাবিক আনন্দময়, নির্ভার ফুটবলকে কিছুটা আড়াল করে দিয়েছিল। মিলানে শেষ হওয়া সেই দুঃসাহসী অভিযানের পর বার্সেলোনাকে এদিন দেখা গেছে অনেক বেশি সতর্ক, দায়িত্বশীল ও পরিণত রূপে। ক্লান্তি এবং একের পর এক চোটের সমস্যাও ছিল দলের সঙ্গে। তাই বড় ভুল এড়িয়ে ম্যাচ জেতাই ছিল প্রধান লক্ষ্য।
সেই লক্ষ্য পূরণেও সফল হয়েছে ফ্লিকের দল। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় টানা ১৮ ম্যাচ গোল হজমের পর এবার প্রথমবারের মতো প্রতিপক্ষকে গোল করতে দেয়নি বার্সেলোনা।
এসপার্ট না থাকায় ফ্লিক আবারও ফারিনাসকে খেলান। মাঝমাঠে পাস দেওয়ার দক্ষতা ও খেলা বোঝার ক্ষমতা ভালো হলেও রক্ষণভাগের প্রান্তে তার পারফরম্যান্স নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, বাঁ প্রান্তের সেন্টারব্যাক হিসেবে আবারও খেলেন জেরার্ড মার্টিন। দলে ডি ইয়ংকে শুরু থেকে খেলানো হয়নি। কারণ, ওলমো না থাকায় মাঝমাঠে রদ্রি, পেদ্রি ও ফেরমিন লোপেজের জায়গা ছিল প্রায় নিশ্চিত।
মাঝমাঠে ফ্লিকের মূল পরিকল্পনা ছিল বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং আক্রমণভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করা। বল হারানোর পর দ্রুত তা পুনরুদ্ধার করে গোলের সুযোগ তৈরি করাই ছিল লক্ষ্য।
পিএসজি ও রিয়াল মাদ্রিদের মতো অ্যাস্টন ভিলাও বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগতভাবে পাহারা দেওয়ার কৌশল নেয়। গোমেস ও মানজাম্বি দায়িত্ব পান প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের আটকে রাখার। এতে পাস দেওয়ার জায়গা তৈরি করতে কুবার্সিকে আরও বেশি নিচে নেমে আসতে হয়। পাশাপাশি গর্ডনের চলাচল এবং লামিনের ড্রিবলিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয় বার্সেলোনাকে।
লামিনে শুরু থেকেই নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন। বল পাওয়ার পরপরই ফাউলের শিকার হন তিনি। পরে নিজেদের বক্স থেকে বল বের করতে গিয়ে গোমেসের ভুলের সুযোগ নেন বার্সেলোনার ১০ নম্বর জার্সিধারী। সুযোগটি কাজে লাগাতে কোনো ভুল করেননি লামিনে। তার গোলেই এগিয়ে যায় স্বাগতিকেরা।
তবে গোল পাওয়ার পরও স্বস্তিতে ছিল না বার্সেলোনা। কর্নার থেকে গোল হজম করার পুরোনো দুর্বলতা যেন আবারও সামনে আসে। অ্যাস্টন ভিলার সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র ছিল সেটপিস। প্রতিটি কর্নারেই বার্সেলোনার রক্ষণে দেখা দেয় অস্থিরতা। শারীরিক লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকা এবং প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের ঠিকমতো সামলাতে না পারায় একাধিকবার বিপদে পড়ে দলটি।
দুই প্রান্তের রক্ষণেও ছিল দুর্বলতা। অ্যাস্টন ভিলার আক্রমণ ছিল ঘন ঘন এবং বেশ বিপজ্জনক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গোলরক্ষক হোয়ান গার্সিয়ার দ্রুত সিদ্ধান্ত ও ক্ষিপ্রতায় রক্ষা পায় বার্সেলোনা। অন্যদিকে, বার্সেলোনার আক্রমণেও আগের মতো ধার ছিল না। ক্যাম্প ন্যুর গ্যালারিতে নীরবতা, মাঠে দুই দলের অনিশ্চিত লড়াই—সব মিলিয়ে ম্যাচটি একসময় যেন গতি হারিয়ে ফেলে।

বার্সেলোনার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র ছিল প্রতিপক্ষের বক্সের কাছে গিয়ে চাপ তৈরি করা। তবে দুই দলের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয় আক্রমণ শেষ করার দক্ষতা। লামিনে যেখানে প্রতিপক্ষের ভুল কাজে লাগাতে পেরেছেন, গর্ডন সেখানে তেমন সফল হননি।
শারীরিকভাবে কঠিন এই ম্যাচে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে বারবার একের পর এক ব্যক্তিগত লড়াই হয়েছে। সাধারণত বলের নিয়ন্ত্রণ ও পাসিংয়ে স্বচ্ছন্দ বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের এদিন শারীরিক লড়াইয়েও নিজেদের মানিয়ে নিতে হয়েছে। অ্যাস্টন ভিলার জ্যাকসনের দ্রুত পাল্টা আক্রমণ ছিল বড় হুমকি।
জোয়ান গার্সিয়ার দুর্দান্ত এক সেভের পর রদ্রি উঁচুতে লাফিয়ে গোলের সামনে থেকে বল সরিয়ে দিয়ে বার্সেলোনাকে রক্ষা করেন। অন্যদিকে, রাফিনিয়ার শট আটকে দিতে পাউ তোরেসকে অসাধারণ ডাইভ দিতে হয়। দুই দলের পাল্টাপাল্টি আক্রমণে ম্যাচের গতি এতটাই বেড়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত রদ্রি ও পেদ্রিও ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
এ সময় লামিনেকে গ্যালারির সমর্থন চাইতে দেখা যায়। গ্রাদা দে আনিমাসিওন নামে পরিচিত সমর্থকগোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তনে গ্যালারিতে কিছুটা প্রাণও ফিরে আসে।
বল দখলে রাখতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল বার্সেলোনা। অন্যদিকে, অ্যাস্টন ভিলার খেলোয়াড়েরা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত পাহারা থেকে বেরিয়ে এসে আরও স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে শুরু করেন। ফ্লিকের তুলনায় এমেরির দলে শারীরিকভাবে বেশি শক্তিশালী ও দীর্ঘ পদক্ষেপে ছুটতে সক্ষম খেলোয়াড় থাকায় মাঠে তাদের প্রভাবও ছিল স্পষ্ট।
তবে বিরতির পর বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। মার্ক বার্নাল মাঠে নামার পর বার্সেলোনার মাঝমাঠে ফিরে আসে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ। বল নিজেদের দখলে রাখার সময় বাড়ে, খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয়ও উন্নত হয়। এর ফল আসে দ্রুতই।
ফেরমিন লোপেজের বাড়ানো বল পেয়ে শট নেন রাফিনিয়া। তবে পাউ তোরেসের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করা বল জালে জড়ায়। ভাগ্যের সহায়তা পাওয়া গোলটিতে ব্যবধান ২-০ করে বার্সেলোনা।
এরপর কানসেলোর অসাধারণ এক বাইরের পায়ের পাস থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন রাফিনিয়া। তার নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে আসে বার্সেলোনার হাতে।
এতক্ষণ পর্যন্ত অপরাজিত থাকা অ্যাস্টন ভিলার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে বার্সেলোনার কার্যকর আক্রমণের সামনে। ক্যাম্প ন্যুতে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে স্বস্তি। গুরুত্বপূর্ণ এই জয় নিয়ে এবার আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে লিগে নিজেদের শীর্ষস্থান ধরে রাখার লড়াইয়ে নামবে বার্সেলোনা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









