বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

নামজারি ফি ১১৭০ টাকা ‘আদায়’ ৩০ লাখ!

আপেল মাহমুদ

প্রকাশিত: ২০ মে ২০২৬, ১০:৪৬ এএম

আপডেট: ২০ মে ২০২৬, ১০:৪৬ এএম

নামজারি ফি ১১৭০ টাকা ‘আদায়’ ৩০ লাখ!

নামজারির সর্বসাকুল্যে ফি ১১৭০ টাকা (রেকর্ড সংশোধন ফি ১০০০, খতিয়ান সরবরাহ ১০০, নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা ও কোর্ট ফি ২০)। সেটা এক লাখ টাকার জমি হোক আর ১০০ কোটি টাকার জমিই হোক। কিন্তু তেমন একটি নামজারির জন্য যদি ৩০ লাখ টাকা নেওয়া হয়, তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায়!

এটা অবশ্য সরকারি ফি নয়, ঘুষ হিসাবে নেওয়া হয়েছে। ঢাকার ধানমন্ডি রাজস্ব সার্কেলে এসি ল্যান্ড ও উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তার যোগসাজশে এ অভাবনীয় ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। এক নম্বর খতিয়ানভুক্ত খাসজমি ব্যক্তির নামে নামজারি করার বিনিময়ে তারা সেটা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ধানমন্ডি লাগোয়া কলাবাগানের সরকারি খাস এক বিঘা (২০ কাঠা) জমি নামজারির ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

ধানমন্ডি মৌজার ডিপি ৫২৩ নম্বর খতিয়ানে আরএস ৬৩০ নম্বর দাগে ০.৩১৯২ একর জমি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত হয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ঢাকা জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ড হয়। অথচ সেই সম্পত্তি ধানমন্ডির সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) জুলহাস হোসেন সৌরভ ১৩৯ লেক সার্কাস কলাবাগানের বাসিন্দা আশ্রাফুল হক, সাইফুল হক, আসিফুল হক ও ইমরোজ জাহান; সর্বপিতা- আহাম্মদুল হকের নামে নামজারি করে দেন। এই নামজারির জন্য তিনি এক ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন। ধানমন্ডি ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. আবুল কালামকে ঘুষের দর কষাকষি করার জন্য নির্দেশ দেন। অবশেষে ৩০ লাখ টাকা রফা হওয়ার পর নামজারি সম্পন্ন করেন এসি ল্যান্ড জুলহাস হোসেন সৌরভ।

ধানমন্ডি ভূমি ও এসি ল্যান্ড অফিসের একাধিক সূত্র জানায়, আদালতের রায় কিংবা সেটেলমেন্ট কোর্টের নির্দেশনার পরই কেবল রেকর্ড সংশোধন শেষে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তির নামে নামজারি হতে পারে। কিন্তু ধানমন্ডি মৌজার আরএস-৬৩০ ও সিটি ৭৭০ নম্বর দাগের এক বিঘা জমি নামজারির মাধ্যমে রেকর্ড সংশোধন করা নজিরবিহীন ঘটনা। যে জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা।

ধানমন্ডি তহশিল অফিসের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম পার্টির সঙ্গে দরকষাকষি করে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে নামজারির ব্যবস্থা করেছেন। তিনি আর এসি ল্যান্ড যোগসাজশ করে খাসজমি নামজারি করে সরকারের বড় ধরনের স্বার্থ নষ্ট করেছেন।’

নামজারির নথি ঘেঁটে দেখা যায়, জমিটি একসময় আহাম্মদুল হকের স্ত্রী সুফিয়া খাতুনের নামে রেকর্ড হয়। তখন এসএ ২১৭ নম্বর দাগে তার নামে নামজারি হয়। কিন্তু আরএস ৬৩০ নম্বর দাগটি সরকারি খাস হলে তিনি মালিকানা হারান। সরকারি খাস রেকর্ডটি বাতিলের জন্য তারা আদালতে যাননি। উপরন্তু ওয়ারিশরা ৭৭০ নম্বর সিটি রেকর্ডমূলে ৭৬৫৩/২১-২২ নম্বর নামজারির মাধ্যমে তাদের মালিকানা বহালের চেষ্টা করেন। কিন্তু আরএস রেকর্ডকৃত জমিটি খাস হওয়ায় রিভিউ মিস কেস নম্বর-১১৭/২৩ মূলে সেই নামজারিটি বাতিল করা হয় ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে।

মূলত তখন থেকেই জমির মালিক দাবিদাররা নামজারিটি পুনর্বহাল করার চেষ্টা করেন। ঠিক তখনই উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আবুল কালাম ঘুষের টোপটি ফেলেন। ৫০ কোটি টাকার জমি মাত্র ৩০ লাখ টাকা ঘুষে নিষ্কণ্টক করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে সেজন্য এখানে ত্রিপক্ষীয় একটি মতামত দরকার পড়ে।

তহশিলদার (উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা) ও কানুনগোর মতামতের ভিত্তিতে সেটা পক্ষে নেওয়া সম্ভব। এসি ল্যান্ড তার প্রতিবেদনে সে কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তহশিলদার ২৮ মার্চ ২০২৪ তারিখে পক্ষে মতামত দেন। অপরদিকে ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে দেওয়া প্রতিবেদন এসি ল্যান্ড কানুনগোর মতামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ‘নামজারি কেস বাতিলের আদেশ পুনর্বিবেচনা পূর্বক ওই নামজারি কেসটি পুনর্বহাল করা যেতে পারে।’ এসি ল্যান্ড আদেশ দেন- ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে এক আদেশে ৭৬৫৩/২১-২২ নম্বর নামজারি ও জমাভাগ কেস বাতিলের আদেশ পুনর্বিবেচনা পূর্বক ওই নামজারি কেসটি পুনর্বহাল করা হোক।’

এভাবে সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ৫০ কোটি টাকার খাস সম্পত্তি ব্যক্তিনামে নামজারি হয়ে যায়।

এমন নজিরবিহীন ঘটনা কিভাবে ঘটল সে ব্যাপারে প্রশ্ন করলে উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আবুল কালাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ঘুষের অভিযোগ সঠিক নয়। তবে একটি নামজারি নিষ্পত্তি করার এখতিয়ার এসি ল্যান্ডের। এখানে তহশিলদার ও কানুনগোর ভূমিকা গৌণ।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইসরাইল হোসেন খান এদিনকে বলেন, ‘সরকারি খাসজমি নামজারি করলে তা হস্তান্তর করা সহজ। এতে কোটি কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন স্বাভাবিক ঘটনা। খাসজমিতে কারো স্বার্থ জড়িত থাকলে তা কোর্টের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করতে হবে। কোর্ট ছাড়া জমির রেকর্ড পরিবর্তন করা যায় না। এসি ল্যান্ড ও তহশিলদার মিলে যে কাজটি করেছেন তা নজিরবিহীন ঘটনা।’

উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আবুল কালাম শুধু ৩০ লাখ টাকা ঘুষকাণ্ডের সঙ্গেই জড়িত নন, তার বিরুদ্ধে আগে আরো অনেক ঘুষ, দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত আছেন। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান রয়েছে।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ঘুষের ৪ হাজার টাকাসহ তাকে হাতেনাতে ধরেন এসি ল্যান্ড আবদুল্লাহ আল ইমরান। সেবাপ্রার্থী আজাদুর রহমানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই অভিযান পরিচালিত হয়। আজাদুর রহমান ঘুষ দেওয়ার আগে টাকার নোটে চিহ্ন দিয়ে রেখেছিলেন। ঘুষের টাকা উদ্ধারের পর উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা স্বীকারোক্তি দিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এসি ল্যান্ড জেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে অবহিত করেন। যার প্রেক্ষিতে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, কোটিপতি ভূমি কর্মকর্তা আবুল কালাম এমএলএসএস থেকে পদোন্নতি পেয়ে উপ-সহকারী কর্মকর্তা হওয়ার পর ঘুষ-দুর্নীতিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। বাড়ি-গাড়ি, টাকা এমনকি সুপারশপের মালিক বনে যাওয়া কালামের বাড়ি পিরোজপুর জেলায়।

এসব বিষয়ে জানতে ধানমন্ডির তৎকালীন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) জুলহাস হোসেন সৌরভের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.