নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। ক্ষমতাসীন বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা না করলেও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
এমন বাস্তবতায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও কূটনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে এমন একজন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে, যার রয়েছে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, বৈশ্বিক যোগাযোগ, কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠার সক্ষমতা।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা, জাতীয় সংকটে নৈতিক নেতৃত্ব প্রদান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক বিভিন্ন মহলে চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। চারজনই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গনে আন্তর্জাতিক বা জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব।
আলোচনায় রয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী আইরিন জুবাইদা খান এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আসতে পারেন ড. ইউনূস
তবে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিদের আলোচনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ক্ষুদ্রঋণ এবং সামাজিক ব্যবসার ধারণাকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করে তিনি বাংলাদেশের পরিচিতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। প্রায় দেড় বছরের দায়িত্বকালে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার পর নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। সেই নির্বাচনে ড. ইউনূসের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের ক্যারিশমেটিক ভূমিকার জন্যই পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। তাই নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বেশ আলোচিত।
এমন অবস্থায় ড. ইউনূসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও পরাশক্তি একটি দেশের আশীর্বাদপুষ্ট বলে পরিচিত ড. খলিলের সামগ্রিক কর্মতৎপরতায় শেষ পর্যন্ত নানা সমীকরণে ড. ইউনূস রাষ্ট্রপতি হলে খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছুই নেই। এ ছাড়া চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণকারী ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালু করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি নতুন বৈশ্বিক মডেল প্রতিষ্ঠার জন্য ২০০৬ সালে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম, কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেলসহ বিশ্বের বহু মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।
বর্তমানে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে তার সামাজিক ব্যবসা ও ক্ষুদ্রঋণ মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে। ১৩০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান এই ধারণার ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশ্বের ৮০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে 'ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার', যেখানে তার সামাজিক ব্যবসা দর্শন, উন্নয়ন ভাবনা এবং অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে।
এ পর্যন্ত বিশ্বের ২৪টি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ৬০টি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি এবং ৩০টিরও বেশি দেশ থেকে ১৩০টির বেশি আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন ড. ইউনূস। তার জীবন ও কর্ম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এতটাই সমাদৃত যে কানাডা ও জাপানের মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকেও তার জীবনী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এমন আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও বৈশ্বিক পরিচিতির কারণেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনায় তার নাম অন্যতম গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ।
দলীয় আলোচনায় মির্জা ফখরুল
রাজনৈতিক মহলে বিশেষ করে বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতার নাম আলোচিত হলেও বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বর্তমানে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার অবস্থান তাকে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলকে এগিয়ে রাখার পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা।
বিএনপির নেতারা বলছেন, দলের দীর্ঘ দুঃসময়ে মির্জা ফখরুল সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবন্দি থাকা এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিদেশে অবস্থানের সময় তিনি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও দলের কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার কারণে তিনি দলের মধ্যে বিশেষ আস্থার জায়গা তৈরি করেছেন বলে নেতাকর্মীদের অভিমত।
দলীয় সূত্রমতে, মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ওঠেনি। রাজনৈতিক বক্তব্য ও আচরণে তিনি সবসময় সংযমী এবং শালীন বলে পরিচিত। এ কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অনেকের কাছেও তিনি একজন গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে বিবেচিত হন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক ও মর্যাদাপূর্ণ পদে এমন একজন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে, যিনি সংকটকালে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখতে সক্ষম হবেন। সেই বিবেচনায় মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় রয়েছে বলে তারা জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি পদটি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাই এ পদে এমন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে, যিনি সংলাপ, সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাদের মতে, মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং কূটনৈতিক মহলে পরিচিতি এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এ বিষয়ে এখনো বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের বিষয়টি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত হতে পারে।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এরপর কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আছেন ড. এম ওসমান ফারুকও
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা শুধু সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক। শিক্ষকতা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় দায়িত্ব পালন এবং শিক্ষা খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে তিনি দেশের পরিচিত ব্যক্তিত্ব।
ড. ওসমান ফারুক ১৯৫৬ সালে সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৫৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে ইউএসএইড ফেলোশিপ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৭০ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে দীর্ঘদিন বিশ্বব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। ২০০১ সালে বিশ্বব্যাংকের চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন এবং একই বছর কিশোরগঞ্জ-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ড. ওসমান ফারুক শিক্ষাবিদ পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা ড. মুহাম্মদ ওসমান গনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর মা শামসুন নাহার গনি।
আলোচনায় আইরিন খান
সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় থাকা আরেকটি নাম আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী আইরিন খান। মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, নারী ও শিশু অধিকার এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিনের কাজের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছেন। সর্বশেষ গত সপ্তাহে তাকে সরকার জাতিসংঘে স্থায়ী মিশনে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার নামও বেশ আলোচিত। মূলত, মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার মতো একজন নারী দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হোক- নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এমন ইচ্ছার কারণেও নাকি তাঁর নাম আলোচনায় আসছে বলে একাধিক সূত্র জানায়।
ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী আইরিন খান প্রাথমিক শিক্ষা শেষে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। মূলত
১৯৭৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টসের মাধ্যমে মানবাধিকার অঙ্গনে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর প্রায় দুই দশক জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালে তিনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রথম নারী মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে সংস্থাটি নাগরিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার, সন্ত্রাসবিরোধী নীতিমালা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে তিনি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোতেও দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মানবাধিকার রক্ষায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ২০০২ সালের ফোর্ড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ, একই বছরের পিলকিংটন ওম্যান অব দ্য ইয়ার পুরস্কার, ২০০৬ সালের সিডনি শান্তি পুরস্কার এবং ২০০৭ সালে গেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম বলেন, অতীতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। সেই বিবেচনায় বিএনপির উচিত হবে এমন লোককে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা, যিনি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য এবং আনুগত্যশীল ও প্রাজ্ঞ।
ড. আলম আরো বলেন, জিয়া পরিবারের প্রতি তো বটেই, দলের দলের প্রতি অবশ্যই আনুগত্যশীল থাকতে হবে। এটা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিজেই বাছাই করতে হবে। অন্যদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। যেহেতু তারেক রহমান দীর্ঘ ১৬ বছর নেতাদের দেখছেন; কার কী অবদান— সবই তিনি জানেন। সুতরাং তাকেই এসবের মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি হতে হবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সবার কাছে শ্রদ্ধাভাজন। সেইসঙ্গে সৎ, দক্ষ এবং সাহসী হতে হবে। কারণ যাদের আগে দেওয়া হয়েছিল তারা কিন্তু শুধু পদ অনুযায়ী চেয়ারেই বসেছিলেন। তারা দলের দুঃসময়ে কোনো সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারেননি। বিশেষ করে ইয়াজ উদ্দিন আহমেদের সময় দেখা গেছে তিনি অনেক কিছুই করতে পারতেন; কিন্তু সেটা তিনি পারেননি। এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, এখন রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের ব্যাপার আছে। সেই বিষয়গুলো তো মাথায় রাখতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা বলেন, ‘বিএনপিতে যোগ্য বেশ কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতা আছেন, যারা রাষ্ট্রপতি পদের জন্য যোগ্য। তবে শারীরিক সক্ষমতা ও সংকটকালে প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন— এমন কাউকেই রাষ্ট্রপতি পদের জন্য যোগ্য মনে করি। এক্ষেত্রে বিএনপি মহাসচিব যোগ্যতম। রাজনীতিবিদকেই রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত করা উচিত হবে বলেও আমি মনে করি।‘
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দায়িত্ব জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী রাজনৈতিক জোট বা দলই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়ন ও নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, কূটনৈতিক দক্ষতা, নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষার সক্ষমতা, এই বিষয়গুলো নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় আসতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য মিলবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং দেশ ছাড়েন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এরপর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) পদত্যাগ করলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









