সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। কোনো পেনশনার মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী এখন থেকে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পাবেন। এতদিন এ বয়সসীমা ছিল ৭৫ বছর। একই সঙ্গে সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আপাতত ৬০ বছর বয়সেই পেনশন পাওয়ার নিয়ম বহাল থাকছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, পেনশনারের মৃত্যুর পর তার স্পাউসের পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে। আগে ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত এ সুবিধা পাওয়া যেত। এখন তা বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে। পেনশনার আজীবন পেনশন পাবেন। আর তার স্পাউস ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পাবেন। সাধারণত স্ত্রী বা স্বামীকে স্পাউস হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তিনি জানান, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালুর অনুমোদন দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রচলিত স্কিমের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতিতে পেনশনের সুযোগ তৈরির প্রক্রিয়া এখন শুরু হবে।
নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, সর্বজনীন পেনশন স্কিমের ইসলামিক ভার্সন অনুমোদন হয়েছে। এটি চালুর আগে কাঠামো ও পরিচালন পদ্ধতি চূড়ান্ত করতে হবে। এজন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরা কাজ করছেন। একচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণসহ প্রয়োজনীয় কাজ শেষে বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, সর্বজনীন পেনশনে পেনশন শুরুর বয়স ৬০ থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়ে আলোচনা চললেও বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। একচুয়ারিয়াল সায়েন্সে নিয়োগ পাওয়া বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী গভর্নিং বডির সভায় বিষয়টি আবার উপস্থাপন করা হতে পারে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে পেনশন শুরুর বয়স ৬২, ৬৬ বা ৬৭ বছর। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের তহবিল বিনিয়োগ করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশের বেশি মুনাফা হয়েছে। সভায় এ মুনাফা অনুমোদন করা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশনভোগীদের মুনাফা দেওয়ার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তহবিলের পরিধি আরো বাড়লে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি জানান, সর্বজনীন পেনশনে মানুষকে যুক্ত করতে নিবন্ধনের প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি), মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান একজন নতুন সদস্য নিবন্ধন করালে ২৫ টাকা পাবে। আগে এ প্রণোদনা ছিল ১৫ টাকা। প্রণোদনা বাড়ানো হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আরো বেশি মানুষকে নিবন্ধনের আওতায় আনার চেষ্টা করবে।
এছাড়া সরকারি মালিকানাধীন যেসব কোম্পানিতে পেনশন দেওয়া হয় না, সেসব কোম্পানির কর্মীদের নিয়ে আসা হবে ‘প্রগতি’ স্কিমে। কোন কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এর আওতায় আসবেন এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে, তা পরে নির্ধারণ করা হবে বলে জানান ড. সুরাতুজ্জামান।
তিনি জানান, ডাক বিভাগ ছাড়া যেসব সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির কর্মীরা বর্তমানে কোনো পেনশন স্কিমের আওতায় নেই, তাদেরকেই ‘প্রগতি’ স্কিমে আনা হবে। এ ছাড়া বিদেশগামী কর্মীদের ‘প্রবাস’ স্কিমে যুক্ত করতে বিদেশ যাওয়ার আগে ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশনের সময় তাদের এ বিষয়ে জানানো হবে। হাতে তুলে দেওয়া হবে লিফলেট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। সরকারি ব্যবস্থায় বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে ‘প্রবাস’ স্কিমে নিবন্ধনকে শর্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, সভায় ঋণ ও স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে পর্যালোচনা হয়। পেনশন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ঋণ দিলে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন নিশ্চিত করা যাবে কিনা, সুদের হার ও অন্যান্য শর্ত পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একইভাবে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় স্বাস্থ্যবিমা চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এখনই এটি চালু করা হচ্ছে না। একচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাব্য আর্থিক চাপ ও ঝুঁকি যাচাই করে পরে মডেল চূড়ান্ত করা হবে।
তিনি আরো জানান, আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়াতে সরকারি নিয়মে সাধারণ অডিটের পাশাপাশি নির্বাচিত একটি বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ফার্ম দিয়ে অডিট করানো হবে। এতে কর্তৃপক্ষের হিসাব ও আর্থিক কার্যক্রম আরো স্বচ্ছ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিদ্যমান পেনশন–ব্যবস্থায় একবার কোনো কর্মসূচিতে ঢুকলে আর বের হওয়ার সুযোগ নেই। কেউ চালিয়ে নিতে না পারলে জমা টাকা ‘মার’ যেত। এ নিয়ম বদল করার দাবি ছিল গ্রাহকদের দিক থেকে। বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে নিয়ম বদলের প্রস্তাব ছিল। পাঁচ বছর অর্থ জমা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক কারণে অক্ষম হয়ে পড়লে পেনশনগ্রহীতাকে বিশেষ বিবেচনায় অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া নিয়ে আলোচনা হলেও এ প্রস্তাব পাস হয়নি বৈঠকে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









