প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বর্তমান যুগের এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রযুক্তি। এটি মানুষের মতো চিন্তা, শেখা এবং সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম মেশিন এবং সিস্টেম তৈরি করেছে। যা আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ এবং উন্নত করছে। তবে, এর অপব্যবহার বা ভুল উদ্দেশ্যে ব্যবহার একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এআইর অপব্যবহার বিভিন্নভাবে মানবাধিকার, গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। একশ্রেণির অসৎ ও অপরাধী চক্রের খপ্পরে পড়ে একদিকে যেমন সাইবার জগৎ অনিরাপদ হয়ে উঠছে, অন্যদিকে এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে কোমলমতি উঠতি বয়সী শিশু-কিশোর ও রাজনৈতিক নেতারা। ‘দুষ্টের এআই’বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষতিকর প্রয়োগের ফলে বিশ্বজুড়ে শিষ্ট ও সাধারণ মানুষ আজ একপ্রকার বড় ধরনের সামাজিক ও মানসিক সংকটে বা বিপাকে পড়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই কোনো সমস্যা নয়, বরং এর পেছনে থাকা ‘দুষ্ট লোক’বা কুচক্রী মহলের উদ্দেশ্যই বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় হুমকি। শিশুদের সুরক্ষায় কোনো শক্তিশালী ফিল্টারিং বা কঠোর আন্তর্জাতিক নীতিমালা না থাকায় অপ্রাপ্তবয়স্করা খুব সহজেই এসবের ক্ষতিকর প্রভাবের মুখে পড়ছে। তাছাড়া, চ্যাটবট বা এআই মাধ্যমগুলো থেরাপিস্ট বা সঠিক অভিভাবক হতে পারে না। ফলে মানসিক বা ব্যক্তিগত জটিল কোনো বিষয়ে শিশুদের এআইয়ের ওপর ভরসা করাটা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই সংকট থেকে রক্ষা পেতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ে নানা সংবাদ ও বক্তব্যের ফটোকার্ড। এর মধ্যে যেমন রয়েছে সঠিক পেজ, পাশাপাশি আছে ভুয়া পেজও। দেশের পরিচিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম ও ছবি ব্যবহার করে তৈরি করা ভুয়া পেজ থেকে ছড়ানো হচ্ছে নানা মনগড়া তথ্য। বাদ যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাও। তাদের ছবি ও নাম ব্যবহার করে বানানো হয়েছে অনেক ভুয়া আইডি ও পেজ। এসব আইডি থেকে ছড়ানো হচ্ছে সম্পূর্ণ কাল্পনিক বক্তব্যের ফটোকার্ড। শুধু ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমও এমন নকলের শিকার হচ্ছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ও টিভি চ্যানেলসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নাম, লোগো, ফন্ট ও ডিজাইন হুবহু নকল করে বানানো হয়েছে অনেক পেজ। এসব পেজ ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে নানা ভুয়া ফটোকার্ড। দেখতে আসলের মতো হওয়ায় যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনেক সাধারণ মানুষ শেয়ার করছেন এসব কার্ড। এমনকি সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেক পরিচিত মুখও এগুলো বিশ্বাস করে শেয়ার করছেন তাদের আইডিতে। ফলে একটি শেয়ার থেকেই মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে ছড়িয়ে যাচ্ছে বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা অনেকটা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ পরিচিত অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে অনেক পেজ ও অ্যাকাউন্ট দেখা যায়। এসব আইডির নাম, প্রোফাইল ছবি, কভার ছবি ও পোস্টের ধরন এমনভাবে সাজানো, যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে এগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তার পরিবারের অনুমোদিত পেজ বলে মনে হতে পারে। কখনো পরিচিত কোনো ব্যক্তির পুরনো ছবি ব্যবহার করে তার সঙ্গে সম্পূর্ণ কাল্পনিক বক্তব্য জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার কোনো ব্যক্তির একটি বক্তব্যের অংশবিশেষ নিয়ে তার সঙ্গে নতুন কথা যুক্ত করে তৈরি করা হচ্ছে ভুয়া ফটোকার্ড। ফলে শুধু বক্তব্যের সত্যতা নিয়েই নয়, সেটি ওই ব্যক্তিরই কি না, তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি। তারেক রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ঘিরে এমন একাধিক ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানোর ঘটনা এরই মধ্যে ফ্যাক্টচেকিং সংস্থাগুলো শনাক্ত করেছে।
গত সেপ্টেম্বরে সংসদে দেওয়া তথ্যে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর নাম ও ছবি ব্যবহার করে ১৩৭টি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপ শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের ফ্যাক্টচেকিং ইউনিট ‘বাংলাফ্যাক্ট’। একই সময়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো আরো শতাধিক ফেসবুক ও এক্স অ্যাকাউন্ট এবং গণমাধ্যমের আদলে তৈরি ১৬টি ওয়েবসাইট শনাক্তের তথ্যও জানানো হয়। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নামিদামি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন পেজ খুলে সেখান থেকে এসব ভুয়া কার্ড ছড়ানো হচ্ছে। মানুষকে প্রভাবিত করতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই কেউ কেউ কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক গ্রাফিক্স কার্ডে পরিচিত সংবাদমাধ্যমগুলোর লোগো, ফন্ট, রং ও নকশা হুবহু নকল করা হয়েছে, যাতে বানোয়াট তথ্যও সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানোর হার বাড়তে থাকে, যা বাংলাদেশের গত সংসদ নির্বাচনের আগে আরো বেড়ে যায়। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে সংবাদমাধ্যমের আদলে বানানো ভুয়া ফটোকার্ড।
ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর থেকে এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রচারিত মোট রাজনৈতিক অপতথ্যের প্রায় অর্ধেকই ছড়িয়েছে এসব ভুয়া ফটোকার্ডে। রাজনৈতিক কোনো ঘটনা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ভুয়া ভাষ্য ছড়াতে এগুলো প্রায়ই ব্যবহার করা হচ্ছে।
ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের যাচাইয়ে ৬৯০টি আলাদা ভুয়া ফটোকার্ড শনাক্ত হয়েছে। যার অনেকগুলোই সংবাদমাধ্যম আমার দেশ, কালের কণ্ঠ, নয়া দিগন্ত ও যমুনা টেলিভিশনের মতো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি। এসব কার্ডের প্রায় অর্ধেকই রাজনৈতিক অপতথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
রাজনৈতিক পক্ষগুলো প্রতিপক্ষকে হেয় করতে এবং নিজেদের জনপ্রিয়তা নিয়ে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা দাবি প্রচার করতে এসব ফটোকার্ড ব্যবহার করে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ২৭৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে ২৪০টি প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব ভুল তথ্যের ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়েছে। ফ্যাক্টচেকাররা বলছেন, এসব কার্ডের একটি বড় কৌশল হলো- পাঠকের আস্থা অর্জনের জন্য পরিচিত গণমাধ্যমের পরিচয় ধার করা। লোগো ও পরিচিত ডিজাইন দেখেই অনেক ব্যবহারকারী কার্ডটিকে সত্যিকারের সংবাদ হিসেবে ধরে নেন।
যাচাই ছাড়া শেয়ারে ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি
অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী যাচাই না করে এসব তথ্য শেয়ার করছেন সামাজিক মাধ্যমে। এমনটি অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত ব্যক্তিরাও যাচাই না করে এসব কার্ড শেয়ার করছেন তাদের আইডি বা পেইজে। কোনো একটি পেইজ বা ব্যক্তির পোস্ট থেকে একটি কার্ড ছড়িয়ে পড়ার পর সেটি একাধিক পরিচিত ব্যক্তি শেয়ার করলে সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে সেটি আরো বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়। ফলে একটি ভুয়া তথ্যের বিস্তার ঘটতে সময় লাগছে মাত্র কয়েক মিনিট। পরে সেটি বিভিন্ন পেইজ, গ্রুপ, ব্যক্তিগত আইডি ও মেসেঞ্জার গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
ভুয়া কার্ড চেনার উপায়
কোনো ফটোকার্ড দেখেই শেয়ার না করে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি। প্রথমত, কার্ডটি কোন পেইজ বা অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল ও ভেরিফায়েড পেইজে একই তথ্য আছে কি না, তা মিলিয়ে দেখতে হবে। কোনো সংবাদমাধ্যমের নামে কার্ড হলে ওই সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট ও অফিশিয়াল সামাজিক মাধ্যমের পেইজে গিয়ে খবরটি খুঁজে দেখা উচিত। একই বক্তব্য বা সংবাদ অন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা যেতে পারে। কার্ডে ব্যবহৃত ভাষা, বানান, ফন্ট, লোগোর অবস্থান, তারিখ এবং শিরোনামের ধরনেও অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে। তবে শুধু এসব দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে মূল উৎস খুঁজে বের করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
এআই’র অপব্যবহার ও চ্যালেঞ্জ
ডিপফেক ও সাইবার বুলিং : প্রযুক্তির অপব্যবহার করে এআইর মাধ্যমে অতি বাস্তবসম্মত ভুয়া ছবি ও ভিডিও (ডিপফেক) তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও কিশোর-কিশোরীদের হেনস্তা বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার বানানোর ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন: বিভিন্ন এআই চ্যাটবট বা প্ল্যাটফর্মের কাছে না বুঝে অভিভাবক বা শিশুরা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক নানা সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার করে ফেলছে। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, বড় একটি অংশ নিয়মিত এআই চ্যাটবট ব্যবহার করলেও এগুলোর ডেটা পলিসি বা নিরাপত্তা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি তীব্র হচ্ছে।
ভুল তথ্য ও মানসিক বিভ্রান্তি: অনেক সময় এআই চ্যাটবটগুলো ব্যবহারকারীদের মন জুগিয়ে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করে। শিশুরা পড়াশোনা বা কৌতূহল মেটাতে এআইর ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করায় তাদের সঠিক জ্ঞান অর্জন ব্যাহত হচ্ছে এবং তারা ভুল ধারণার বশবর্তী হচ্ছে।
অনলাইন প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইল: দুষ্টচক্র এআইকে হাতিয়ার বানিয়ে ভুয়া আইডি, কণ্ঠস্বর ক্লোনিং এবং বিভিন্ন ডিপফেক কনটেন্ট তৈরি করে জালিয়াতি ও ব্ল্যাকমেইলের মতো অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে, যার সহজ টার্গেট হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম।
গোপনীয়তার লঙ্ঘন : এআই প্রযুক্তি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। তবে, এর অপব্যবহার হতে পারে যখন ব্যক্তিগত তথ্য অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ এবং ব্যবহার করা হয়, যা গোপনীয়তার লঙ্ঘন ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ, ডেটা মাইনিং এবং প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের অসাধু উদ্দেশ্যে লক্ষ্যবস্তু করা।
ভুয়া তথ্য এবং মিথ্যা প্রচারণা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য বা ফেক নিউজ তৈরি করা অনেক সহজ হয়ে উঠেছে। ‘ডিপফেক’ ভিডিও বা ছবি তৈরির মাধ্যমে রাজনৈতিক এবং সামাজিক উদ্দেশ্যে ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি বিশেষত নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং সামাজিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হতে পারে।
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থার উত্থান : কিছু দেশ এবং সংস্থা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রোবটিক অস্ত্র তৈরি করছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সুসঙ্গত এবং স্বায়ত্তশাসিত যুদ্ধযান তৈরি করা হচ্ছে, যা মানুষের জীবনে বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। অপব্যবহারের ক্ষেত্রে এই অস্ত্রগুলো যুদ্ধ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হতে পারে।
বেকারত্বের সংকট: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবটিক্সের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় কাজের ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান বিপন্ন হতে পারে। যদিও এটি অর্থনীতির উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করতে পারে, তবে এটি শ্রমবাজারে বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে অনেক মানুষ চাকরি হারাতে পারে। এর অপব্যবহার হতে পারে যদি সংস্থাগুলো মানবাধিকার বা সামাজিক দিক বিবেচনা না করে শুধু মুনাফা অর্জনে মনোযোগ দেয়।
বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার : কিছু ক্ষেত্রে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থায় পক্ষপাতিত্ব এবং ন্যায্যতার অভাব দেখা দিতে পারে। যেসব অ্যালগরিদমগুলো সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত নয় বা পক্ষপাতিত্বপূর্ণ ডেটার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে, সেগুলো ন্যায়বিচারের ভুল ফলাফল সৃষ্টি করতে পারে, যেমন বিচার প্রক্রিয়ায় বৈষম্য বা পক্ষপাতিত্ব।
অপব্যবহার প্রতিরাধে করণীয়
নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য স্পষ্ট নীতিমালা এবং আইন তৈরি করা জরুরি, যাতে এর অপব্যবহার প্রতিরোধ করা যায়। সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এর নিয়ন্ত্রণের জন্য একযোগে কাজ করতে হবে।
অথেনটিকেশন এবং নিরাপত্তা: তথ্য সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী অথেনটিকেশন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং সম্মতির প্রক্রিয়া জরুরি।
শিক্ষা এবং সচেতনতা : সাধারণ জনগণকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, কিভাবে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ রাখবে এবং এআইর অপব্যবহার সম্পর্কে সাবধান থাকবে তা শেখানো উচিত।
বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্ব কমানো : এআই সিস্টেমগুলোতে পক্ষপাতিত্ব রোধ করতে এবং সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বিচারের ক্ষেত্রে সঠিক এবং সুষম ফলাফল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মানবজাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যে সব সংস্থা তাদের মধ্যে অ্যানথ্রোপিক অন্যতম। সংস্থাটির একজন নিরাপত্তা বিষয়ক শীর্ষ গবেষক সতর্ক করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এত দ্রুত উন্নত হচ্ছে যে তিনি বিশ্বাস করেন আগামী ১০ বছরের মধ্যে এটি ‘সমস্ত মানুষকে হত্যা করতে পারে’ এমন আশঙ্কা ১০ শতাংশেরও বেশি। ইভান হাবিঙ্গার এক্স-হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করে বলেছেন, বর্তমানে বিদ্যমান মডেলগুলোর কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি ‘কম’; তবে তিনি এ বিষয়ে ‘উদ্বিগ্ন’ যে, এই প্রযুক্তি হয়তো শিগগিরই এমন পর্যায়ে বিকশিত ও উন্নত হয়ে উঠতে পারে, যা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
তবে ভবিষ্যতে এআই কিভাবে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে বলে তিনি মনে করেন, সেটা তিনি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেননি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে একের পর এক যেসব মন্তব্য আসছে, তার মন্তব্য সেই ধারাবাহিকে সর্বশেষ সংযোজন। বিতর্কটা এখন এটা নিয়ে নয় যে, এআইয়ের থেকে সত্যিই কোনো ঝুঁকি আছে কি না, বরং ঝুঁকিটা কত বড়, তা নিয়ে চলছে আলোচনা। হাবিঙ্গারের এই মন্তব্যটি ছিল অ্যানথ্রোপিকের সাবেক একজন গবেষক জ্যাকব কক্সনের একটি পোস্টের জবাবে। কক্সন এর আগে ওপেন এআই-তে কাজ করতেন। তিনি লিখেছিলেন, কোনো কোম্পানিই দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। এগুলো শিগগিরই এমন অতিমানবীয় সিস্টেমে পরিণত হবে যা যেকোনো কিছু হ্যাক করতে, রাতারাতি যেকোনো ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে এবং প্রকৃত ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জন করতে পারবে।
ডেম ওয়েন্ডি একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী যিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে জাতিসংঘকে পরামর্শ দেন। তিনি বিবিসিকে বলেছেন যে তিনি সামাজিক মাধ্যমে হাবিঙ্গার এবং কক্সনের পোস্ট দেখে ‘হতবাক’ হয়েছেন। তিনি বলেন, এর কিছু অংশ ‘জনসংযোগ এবং বিপণন’-এর জন্যও হতে পারে, কারণ অ্যানথ্রোপিক এবং ওপেনএআই শেয়ার বাজারে তাদের বহু প্রতীক্ষিত আত্মপ্রকাশের জন্য দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তিনি আরো বলেন, কেউ এমন কথা বলতে চাইবে কেন? আমি বিনিয়োগকারীদের কাছে অনুরোধ করব, যদি এটাই তাদের মূল্যবোধ হয়, তবে তারা যেন এই কোম্পানিতে বিনিয়োগ না করেন।
এই পদত্যাগের ফলে ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন চিফ সেক্রেটারি এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের চিফ সেক্রেটারি ড্যারেন জোন্স প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামকে একটি খোলা চিঠি লেখেন, যেখানে তিনি নিরাপদভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের জন্য একটি নতুন বহুজাতিক চুক্তির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সুপার ইন্টেলিজেন্সের উন্নতির উপর ভিত্তি করে একটি চুক্তি কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে সরকারগুলোকে একত্রিত হয়ে ‘সহযোগিতার’হাত বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকারগুলো যদি এই সতর্কবার্তাগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে না নেয় এবং এর মোকাবিলায় এগিয়ে না আসে, তবে উন্নয়নের গতি এমন হতে পারে যে, এটি আমাদের জন্য কোনো সমস্যা কি না, তা খতিয়ে দেখার আগেই আমরা সমস্যায় পড়ে যাব।
অন্যদিকে, ফিনান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে যে, অ্যানথ্রোপিক যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট (এআইএসআই)-এর কাছে তাদের সর্বশেষ মডেলটি প্রকাশ করেনি। এআই-এর ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই সংস্থাটির কাছে অ্যানথ্রোপিক তাদের তথ্য গোপন রেখেছে। তবে অ্যানথ্রোপিক তাদের কর্মীদের পোস্ট বা এআইএসআই-এর পরিস্থিতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
মডেলটি এআইএসআই থেকে গোপন রাখা হয়েছিল কি না সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে ক্যাবিনেট অফিসের একজন মুখপাত্র বলেছেন যে, তারা ‘মডেলগুলিকে আরো নিরাপদ করার জন্য অ্যানথ্রোপিক-সহ শিল্প অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই পোস্ট, যা ১০ মিলিয়নেরও বেশি বার দেখা হয়েছে, সেখানে হাবিঙ্গার বলেছেন, ‘আমরা সত্যিই আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি’যে এআই মানুষের প্রজাতি-বিলুপ্তির ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি আরো বলেছেন, আমি বিশ্বাস করি অ্যানথ্রোপিক সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে, কিন্তু সুপারইন্টেলিজেন্সের জন্য অ্যালাইনমেন্টের সমাধান করার কোনো পরিকল্পনা আমাদের কাছে এখনো নেই এবং আমরা সেই পথে এগোচ্ছিও না। হাবিঙ্গার এআই অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে কাজ করেন, যার লক্ষ্য হলো এই প্রযুক্তির মধ্যে মানুষের নৈতিক ধারণা ও নীতিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা। এর লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিকে মানুষের মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রাখা।
অনেক শীর্ষস্থানীয় গবেষক বলছেন যে এই প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যার প্রমাণ মেলে চলতি গ্রীষ্মকালে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনায়, যেখানে এআই এজেন্টরা—অর্থাৎ স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতিপ্রাপ্ত এআই সিস্টেম—সাইবার-হামলা চালিয়েছে। ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক এবং মেটা সকলেই তাদের এআই টুলের মাধ্যমে সংঘটিত হ্যাকিংয়ের ঘটনা প্রকাশ করেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









