৩০ সেপ্টেম্বর, বুধবার। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর প্রায় আড়াইটা। ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ‘মামুন শেখ’ নামে আইডি থেকে কল আসে। রিসিভ করার পর অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয় জুরাইন (পোস্তগোলা) ওভারব্রিজে ওঠার আগে রাস্তার ঢালে আসেন। আমি সেখানে আছি।’ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার নেশায় দৈনিক এদিনের বিশেষ প্রতিনিধি কামরুজ্জামান বাবলুও তার কথামতো সেখানে যান। দেখা হয় দুজনের। এরই মধ্যে মামুন তার বন্ধু অনিককে পরিচয় করিয়ে দেন বাবলুর সাথে।
এ পর্বে বাবলু বলেন, ‘চলেন, আমরা কোথাও একটা রেস্টুরেন্টে বসে কথা বলি।’ তারাও সায় দেন। এরই মধ্যে মামুন বলেন, ‘এখানে তো তেমন কোনো হোটেল দেখা যাচ্ছে না। তার চেয়ে বেটার চলেন, ওই যে আমার গাড়ি আছে সেখানে বসি। কয়েক মিনিট গাড়িতে বসে কথা বলে তারপর না হয় চা নাস্তা খাব।’
প্রথমে গাড়িতে যেতে না চাইলেও শেষতক তার কথায় সরল বিশ্বাসে সাড়া দেন কামরুজ্জামান বাবলু। কয়েক কদম হাঁটার পর তিনি গাড়িতে এক পা রাখামাত্রই তাকে বিদ্যুৎ বেগে পেছন থেকে মামুন ও অনিক ধাক্কা দিয়ে গাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে দেন। মুহূর্তেই বদলে যায় পরিস্থিতি। পেছনের সিটে বসে থাকা অপর তিন যুবক দেশীয় ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জাপটে ধরে বাবলুকে। বেশকিছু গালির সাথে চোখে-মুখে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি দিয়ে বলে, ‘একদম চুপ। কোনো কথা বলবি না। বললে জানে শেষ করে দেব।’ এ সময় তারা বাবলুর হাত ও চোখ বেঁধে ফেলে। সাথে থাকা মোবাইল ও মানিব্যাগ নিয়ে সাঁইসাঁই করে ছুটে চলে গাড়ি।
এভাবে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা একটানা গাড়ি চলার পর এসে একটি নির্জন এলাকায় থামে। বাবলুকে নিয়ে যাওয়া হয় গভীর এক জঙ্গলে। চোখের বাঁধন খুলে দিলে বাবলু যেন নিজেকে আবিষ্কার করেন কল্পনার আমাজন জঙ্গলে। এ সময় তাঁকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে লেখালেখির জন্য শক্ত কিছু গালি দিয়ে বলে ‘আজ তোর মাংস ঘেরের মাছকে খাওয়াব। তুই যে শেখ হাসিনাকে খারাপ বলিস, এটা তারই জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়া। এখানে তোকে উদ্ধারের জন্য পুলিশ-আর্মি কেউ আসবে না।’ এই বলে শারীরিক নির্যাতন শেষে তাঁর মোবাইলের সিকিউরিটি প্যাটার্ন ও ব্যাংক কার্ডের পাসওয়ার্ড নিয়ে যায় অপহরণকারীরা।
নাটকীয়ভাবে সেই অপহরণকারীদের হাত থেকে বেঁচে ফেরা সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলুর জবানিতে উঠে এসেছে এমন রোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর অপহরণের রুদ্ধশ্বাস কাহিনী। যা রীতিমতো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ‘মামুন শেখ’ নামে একটি আইডির সঙ্গে কামরুজ্জামান বাবলুর পরিচয় হয়। প্রথমে সাধারণ কথাবার্তা হলেও এক পর্যায়ে ওই ব্যক্তি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হিসেবে পরিচয় দেন। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তিনি বিটকয়েনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য’ দেওয়ার কথা বলেন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার ঢাকায় আসার কথা জানিয়ে মামুন শেখ সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলুকে দেখা করার প্রস্তাব দেন। সাংবাদিক বাবলু তাঁকে অফিসে আসতে বললেও মামুন জানান, তিনি জুরাইনে আত্মীয়ের বাসায় রয়েছেন। পরে জুরাইনে এসে দেখা করার অনুরোধ করলে কামরুজ্জামান বাবলু সেখানে যান। এরপর একে একে ঘটে উপরি-উক্ত ঘটনাগুলো।
কামরুজ্জামান বাবলু বলেন, প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা গাড়িতে নেওয়ার পর তাঁকে একটি গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন মাগরিবের আজান হচ্ছিল। চারপাশে অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা পাহারা দিচ্ছিলেন। সেখানে তাঁকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও গালিগালাজ করা হয়। এ সময় তাঁর মোবাইল ফোন, ব্যাংকের কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র নিয়ে নেয় অপহরণকারীরা। তাঁর সঙ্গে বাইরের কারও যোগাযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বাবলু বলেন, রাত ৯টার দিকে তাঁর স্ত্রী ফোন করলে অপহরণকারীরা তাঁকে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে বাধ্য করে। তবে কথাবার্তার মধ্যেই তাঁর স্ত্রী পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেন। পরে তিনি কামরুজ্জামান বাবলুর বড় ভাইদের বিষয়টি জানান। স্বজনরা পল্টন থানায় গিয়ে বিষয়টি জানালে থানার এসআই তুষার দেবনাথ বাবলুর ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
বাবলুর ভাষ্য, রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে পুলিশ তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও অপহরণকারীরা তাঁকে ফোন ধরতে দেয়নি। পরে রাত আড়াইটার দিকে তাঁদের উপস্থিতিতেই তিনি স্ত্রীর সঙ্গে এবং পুলিশের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন।
এদিকে অপহরণকারীরা তাঁর ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে উত্তোলনযোগ্য টাকা তুলে নেন মর্মে জানান, ব্যাংক হিসাবের তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জের একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। পরে তাঁকে আরো টাকা দিতে চাপ দেওয়া হয়। তাঁর নিজের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
কামরুজ্জামান বাবলু জানান, তাঁর মোবাইল ফোনটি তখনো অপহরণকারীদের কাছে ছিল। মোবাইল ফোনটি পরে আর তাঁর কাছে ফেরত দেওয়া হয়নি। তবে ফোনটির আইএমইআই নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য তাঁর কাছে রয়েছে।
ঘটনার শেষ পর্যায়ে অপহরণকারীরা কয়েকজন মিলে এরপর কী করা হবে তা নিয়ে আলোচনা করছিল। এ সময় ভোর হয়ে এলে বাবলু কৌশলে অপহরণকারীদের নজর এড়িয়ে কিছুটা দূরে সটকে পড়েন। একপর্যায়ে দৌড়ে তিনি একটি প্রধান সড়কে উঠে আসেন। পরে একটি পিকআপ ভ্যান থামিয়ে চালককে বিস্তারিত জানিয়ে সাহায্য চাইলে তিনি বাবলুকে গাড়িতে তুলতে রাজি হন। পরে তাঁকে বাগেরহাটের মোল্লাহাট এলাকায় নামিয়ে দেন। সেখানে একটি বাস কাউন্টারে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বাবলু। পরে স্বজনদের সহায়তায় ঢাকায় ফিরে আসেন তিনি।
এ ঘটনায় নিজের ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, বিকাশের লেনদেনের তথ্য, টাকা উত্তোলনের তথ্য, ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর এবং মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য দিয়ে মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর মুখ্য হাকিমের আদালতে একটি অপহরণ মামলা করেছেন কামরুজ্জামান বাবলু। যার নং-২৮২/২৬।
এ বিষয়ে সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলু বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আমি চাই, তদন্ত করে যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।’ মামলার তদন্তের পরই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কী উদ্দেশ্যে সাংবাদিককে অপহরণ করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলায় অপহরণ, জিম্মি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ব্যাংক ও বিকাশের লেনদেনের তথ্য, এটিএম বুথের অবস্থান, সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর এবং আইএমইআই নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হলে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
এদিকে সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলুকে অপহরণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরাম (পিআরএফ), রিলিজিয়াস রিপোর্টার্স ফোরাম (আরআরএফ) ও কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম, ঢাকা। পৃথক বিবৃতিতে সংগঠন চারটির নেতারা ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলু ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) স্থায়ী সদস্য এবং জাতীয় দৈনিক ‘এদিন’-এর বিশেষ প্রতিনিধি। তিনি পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরামের (পিআরএফ) সাবেক দপ্তর সম্পাদক, রিলিজিয়াস রিপোর্টার্স ফোরামের (আরআরএফ) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম, ঢাকার (সিজেএফডি) সাবেক যুগ্ম সম্পাদক।
গতকাল বুধবারও পৃথক বিবৃতিতে ডিআরইউ, পিআরএফ, আরআরএফ ও সিজেএফডির নেতারা এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। অন্যদিকে, পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরামের (পিআরএফ) সভাপতি খোন্দকার কাওছার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী এক বিবৃতিতে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তাঁরা অবিলম্বে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান।
এ ছাড়া আরআরএফের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ, সিজেএফডির সভাপতি সাঈদ আহমেদ খান এক যৌথ বিবৃতিতে সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলুকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি, অপহরণ, হত্যার হুমকি এবং তাঁর ব্যাংক ও বিকাশ-নগদ হিসাব থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তীব্র ক্ষোভ, গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানান।
আরআরএফ নেতারা অবিলম্বে ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করে জড়িতদের শনাক্ত ও দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান। একই সঙ্গে ব্যাংকিং লেনদেন, এটিএম বুথের সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) হিসাব, সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর এবং আইএমইআই নম্বর আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান ও যাচাই করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান তাঁরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্র নিউ নেশন, যায়যায়দিন, মানবজমিন ও যুগান্তরসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









