বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ হলেও, এই অর্জনের নেপথ্যের কারিগর শ্রমিকদের জীবনচিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশ্বের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন—যা কেবল তাদের জীবনযাত্রার মানকেই সংকটে ফেলছে না, বরং প্রায়শই শিল্পাঞ্চলকে করে তুলছে উত্তপ্ত ও অস্থিতিশীল।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট হয়ে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে যখন মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করার জোরালো দাবি উঠেছে, ঠিক তখনই পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। রপ্তানির মুকুট আর সর্বনিম্ন মজুরির এই বৈপরীত্যের মাঝে দাঁড়িয়ে তৈরি পোশাক খাতের এই নতুন মজুরি পুনর্নির্ধারণ উদ্যোগ কতখানি যুগান্তকারী হবে, তা এখন এক বড় প্রশ্ন।
নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে মালিকপক্ষের উদ্বেগও রয়েছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ক্রয়াদেশের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক কারখানা আর্থিক চাপে রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর পক্ষে একযোগে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, নতুন মজুরি নির্ধারণে শ্রম আইন অনুযায়ী মজুরি বোর্ডেই তথ্য-উপাত্ত ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আলোচনা হওয়া উচিত। বোর্ডের সিদ্ধান্ত মালিকপক্ষ মেনে নেবে। তবে নতুন মজুরি বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। কারণ, বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা ও দর-কষাকষির প্রয়োজন হবে।
নবগঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বিজিএমইএ-এর পরিচালক এবিএম সামছুদ্দিন বলেন, এখন শুধু ৬ সদস্যের বোর্ড গঠন করা হয়েছে কিন্তু বোর্ডে কে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবে, সেটা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। মজুরি বোর্ডের আনুষ্ঠানিক কোন কার্যক্রম শুরু হয়নি। শ্রমিকদের মজুরি নূন্যতম কত টাকা বৃদ্ধি করা হবে জানতে চাইলে তিনি জানান, যেহেতু আমরা এখন কোন মিটিং করিনি তাই কত টাকা বৃদ্ধি পাবে, সে বিষয়ে এখনো বলতে পারছি না। মজুরি বোর্ডের মিটিংয়ে সবার মতামত নিয়ে নূন্যতম মজুরি প্রস্তাব করা হবে। একটা বোর্ড গঠন করলে সাথে সাথেই মিটিং বসতে পারে না ।
তাছাড়া বোর্ডে নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। তিনি তো পোশাকশিল্প সেক্টরের নয় বা তিনি গার্মেন্টস এর কিছুই জানেন না। তার ক্ষেত্রে পোশাক শিল্প নিয়ে আরোও বেশি গবেষণা করতে হবে। আমাদের নিজেদেরও আরও জেনে বুঝে মিটিং এর মাধ্যমে আলাপ করে জানতে হবে। যারজন্য একটা কমিটি গঠন করলে মিনিমাম এক সপ্তাহ সময় দিতে হয় কমিটি মেম্বারদেরকে স্টাডি করার জন্য। তবে আমরা ডিসেম্বরে যাবো না, নভেম্বরেই মিটিং হবে।
নূন্যতম মজুরি কত হওয়া যৌক্তিকতার প্রশ্নে তিনি আরও জানান, নূন্যতম মজুরি আমি ৩৫ হাজার টাকা দিতে পারলে খুশি। কিন্তু এভাবে হলে একমাস পরেই কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে কমিটির আলোচনা ছাড়া এককভাবে কত মজুরি বৃদ্ধি পাবে এই বিষয়ে বলা শোভনীয় বলে মনে করছি না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমারা কমিটির সবাই মিটিংয়ে একত্রিত হতে না পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত নির্ধারিত ভাবে বলার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও নবগঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আক্তার জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই যৌক্তিক ও মানসম্মত নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে। শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের প্রধান দাবি ছিল ন্যূনতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন। সরকার দ্রুততম সময়ে সেই বোর্ড গঠন করেছে। এখন মজুরি বোর্ডের প্রথম সভায় শ্রমিক পক্ষের জোরালো প্রস্তাব তুলে ধরা হবে।
শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি কত টাকা হওয়া যৌক্তিক বলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল একটা জোট থেকে আমরা মাসিক ২৬০ ডলার বা ৩২ হাজার ১১০ থেকে ১৮০ টাকা অথবা পার ডে বা প্রতিদিন ১০ ডলার বা ১২শ’ ৪৫ টাকা নূন্যতম মজুরি চেয়েছি, যা বাংলা টাকায় । অন্যন্য জোট ১০ ডলারই চেয়েছে আবার কিছু কিছু জোট চেয়েছে ৩০ হাজার, কেউ চেয়েছে ৩২ হাজার, কেউ চেয়েছে ৩৭ হাজার টাকা। আমরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে চেয়েছি আর কি । তবে নুন্যতম মজুরি হলে এমন হলেই বর্তমান বাজার মূল্যের সাথে নিজেদের জীবন যাত্রার মান সামঞ্জস্য হবে বলে আশা করছি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, নতুন মজুরি বোর্ডের দায়িত্ব হলো এমন একটি ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা, যা শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের জীবনযাত্রার বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের খরচ বিবেচনায় নিতে হবে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতিতে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে; তাই মজুরি বৃদ্ধি এখন জরুরি।
তবে সিদ্ধান্তটি অনুমাননির্ভর না হয়ে শ্রমিক পরিবারের ব্যয়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, কর্মস্থলের অবস্থান এবং প্রয়োজনীয় জীবনমান নিয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, শিল্পের প্রতিযোগিতা বজায় রাখার যুক্তিতে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি উপেক্ষা করা যাবে না। একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও কর্মপরিবেশ উন্নত করে উৎপাদন ব্যয় সামলানোর উদ্যোগ দরকার। এ দায়িত্ব শুধু কারখানামালিকের নয়; আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডকেও ন্যায্য পণ্যমূল্য দিতে হবে এবং অর্ডার, মূল্য ও সরবরাহের শর্তে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। সরকারকে নিয়মিত মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় পর্যালোচনা করে মজুরি সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা করতে হবে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। টানা কয়েক বছর ধরে এ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। অথচ যাদের পরিশ্রমে এ খাতটি দাঁড়িয়ে আছে তারা যথাযথ পারিশ্রমিক পাচ্ছে না। বরং বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা মজুরি পান প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন দেশের চেয়ে অনেক কম। বর্তমানে তা বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের চেয়ে কম মজুরি পান শুধু শ্রীলঙ্কার পোশাক শ্রমিকরা। অন্যদিকে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে শ্রমিকদের মজুরি বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। এর মধ্যে চীন ও তুরস্কের শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক অনেক বেশি। এছাড়া দেশগুলো নিয়মিতভাবে মজুরি সমন্বয় বা বৃদ্ধি করে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও বিভিন্ন দেশের তথ্য ঘেঁটে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
দেশভিত্তিক মজুরির তুলনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা যা ডলারের হিসাবে প্রায় ১০১ ডলার। এশিয়ার কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের তুলনায় এ মজুরি বেশ কম। বাংলাদেশের চেয়ে কম মজুরি শুধু শ্রীলঙ্কায়। দেশটির পোশাক খাতে শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৯০ ডলার। আর বাংলাদেশের কাছাকাছি মজুরি রয়েছে উজবেকিস্তানের।
দেশটিতে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০৬ ডলার। বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি গড়ে ১৪৫ ডলার, ভিয়েতনামে ১৭৫ ডলার, ভারতে ১৯২ ডলার, কম্বোডিয়ায় ২১০ ডলার, ইন্দোনেশিয়ায় ২২২ ডলার ও চীনে ৩৩৭ ডলার। তবে এ খাতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ন্যূনতম মজুরি তুরস্কে ৬৬২ ডলার। এ অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরির পার্থক্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালে। ওই বছরের ১২ নভেম্বর নতুন মজুরি কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। ১ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। ফলে প্রায় তিন বছর পর আবারও নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, তুরস্ক ও শ্রীলঙ্কা ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করেছে। ইন্দোনেশিয়া ও চীনে নিয়মিত অঞ্চলভিত্তিক মজুরি সমন্বয় হচ্ছে।
বাংলাদেশে ২০২৩ সালের মজুরি কাঠামোয় তৈরি পোশাক শ্রমিকদের জন্য চারটি গ্রেড নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে গ্রেড-১-এর সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১৫ হাজার ৩৫ টাকা, গ্রেড-২-এর ১৪ হাজার ২৭৩ টাকা, গ্রেড-৩-এর ১৩ হাজার ৫৫০ টাকা এবং গ্রেড-৪-এর ১২ হাজার ৫০০ টাকা। সর্বনিম্ন গ্রেডের ১২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে মূল বেতন ৬ হাজার ৭০০ টাকা। এছাড়া বাড়িভাড়া ৩ হাজার ৩৫০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৭৫০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ৪৫০ টাকা এবং খাদ্য ভাতা ১ হাজার ২৫০ টাকা। এছাড়া শিক্ষানবিস শ্রমিকদের জন্য তিন মাসের শিক্ষানবিসকাল নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ সময়ে তাদের মোট মাসিক মজুরি ৯ হাজার ৮৭৫ টাকা। ওই মজুরি কাঠামোয় মূল বেতনের ওপর বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের বিধান ছিল। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করা হয়। অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বশেষ মজুরি কাঠামো নির্ধারণের পর বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার বাড়লেও নতুন করে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়নি। শ্রমিকদের বর্তমান আন্দোলনে তাই শুধু বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নয়, পুরো মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণের দাবি সামনে এসেছে।
এবারের আন্দোলনে শ্রমিকদের একটি বড় অংশের দাবি, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার তুলনায় এই দাবি ১৭ হাজার ৫০০ টাকা বেশি। অর্থাৎ বর্তমান মজুরির তুলনায় শ্রমিকরা ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছেন। ডলারের হিসাবে বর্তমান ন্যূনতম মজুরি প্রায় ১০১ ডলার। অন্যদিকে ৩০ হাজার টাকা প্রায় ২৪২ ডলারের সমান। শ্রমিকদের যুক্তি, গত কয়েক বছরে চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে তাদের আয় বাড়েনি। ফলে বর্তমান মজুরিতে সংসারের মৌলিক ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ তৈরি পোশাকশিল্প খাত। যে শিল্পের হাত ধরে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ নিজের অবস্থান তৈরি করেছে, যে শিল্পের ওপর নির্ভরশীল দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ, সেই শিল্পের প্রাণশক্তি লাখো শ্রমিক। অথচ এই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠলেই বারবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে শিল্পাঞ্চল। সড়কে নামেন শ্রমিকরা; শুরু হয় বিক্ষোভ, বন্ধ হয় কারখানা, থমকে যায় উৎপাদন, তৈরি হয় রপ্তানি অনিশ্চয়তা। এ যেন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের এক পরিচিত চিত্রনাট্য। শ্রমিকদের অসন্তোষ বাড়ে, আন্দোলন শুরু হয়, সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করে, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা হয়, নতুন মজুরি ঘোষণা করা হয়।
কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকে। এরপর মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে পুরোনো অসন্তোষ আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গত মাসের শেষ দিকে সেই চিত্রই আবার সামনে এসেছে। এবার শ্রমিকদের দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা। শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্যেই গত ১ নভেম্বর সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়ার সময় শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তার বক্তব্যের সারকথা ছিল, নতুন বোর্ড এখন মজুরি নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করবে; তাই সড়ক অবরোধের প্রয়োজন নেই। তিনি তখন সতর্ক করেছিলেন, কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা ও রপ্তানি চালান ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের বেতন ও কর্মসংস্থানেও পড়বে। মন্ত্রীর এমন কথায় অবশ্য শ্রমিকদের আন্দোলন থেমে যায়নি। পরদিন ২ নভেম্বরও রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২৫ অনুযায়ী, টানা পঞ্চমবারের মতো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর বাংলাদেশ ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। তৃতীয় স্থানে থাকা ভিয়েতনামের তুলনায় তা প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বেশি। অথচ দেশটির শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ৭৩ শতাংশ বেশি। যদিও দেশভিত্তিক মজুরির এই তুলনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মজুরি নির্ধারণের পদ্ধতিও বিবেচনার বিষয়। কারণ সব দেশে পোশাক শ্রমিকদের জন্য একই ধরনের জাতীয় মজুরি কাঠামো নেই। কোনো দেশে অঞ্চলভিত্তিক, কোনো দেশে প্রদেশভিত্তিক আবার কোনো দেশে নির্দিষ্ট শিল্প খাতের জন্য আলাদা মজুরি নির্ধারণ করা হয়।
চীনে সারা দেশের জন্য একই সময়ে অভিন্ন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় না। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশ ও শহর নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করে। ২০২৫ সালেও বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন মজুরি কার্যকর হয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রেও রাজ্য ও কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি ভিন্ন। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল দেশটিতে কেন্দ্রীয় শ্রমক্ষেত্রে পরিবর্তনশীল মহার্ঘ ভাতা বা ভেরিয়েবল ডিয়ারনেস অ্যালাউন্স (ভিডিএ) সংশোধন করা হয়েছে। পাকিস্তানেও প্রদেশভেদে মজুরির পার্থক্য রয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সিন্ধু প্রদেশে ৪৩ হাজার রুপি ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হয়েছে। অন্য প্রদেশে মজুরির হার আলাদা। ইন্দোনেশিয়ায় প্রদেশ ও জেলাভিত্তিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়।
অন্যদিকে কম্বোডিয়ায় পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য প্রতি বছর মজুরি আলোচনা ও সমন্বয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে নতুন মজুরি কার্যকর হয়েছে। ভিয়েতনামেও একই দিন থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করা হয়েছে। তুরস্কে সাধারণত প্রতি বছর জাতীয় পর্যায়ে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
শুধু মজুরির পরিমাণ নয়, কত সময় পরপর শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেখানেও বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলোর পার্থক্য রয়েছে। চীনে অঞ্চলভেদে সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে মজুরি সমন্বয়ের প্রবণতা রয়েছে। ভিয়েতনামে সাধারণত এক থেকে দুই বছর পর মজুরি পর্যালোচনা করা হয়। কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্কে সাধারণত প্রতি বছর মজুরি পুনর্নির্ধারণ বা সমন্বয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতে আইনগতভাবে মজুরি পর্যালোচনার সময়সীমা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর হলেও পরিবর্তনশীল মহার্ঘ ভাতা ছয় মাস অন্তর সমন্বয় হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাধারণত তিন বছর পর নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের বিধান রয়েছে। যদিও তা অনেক সময় বিলম্বিত হয়।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বোর্ডের সুপারিশ এবং সকল পক্ষের সাথে পর্যালোচনার ভিত্তিতে শিগগিরই তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য নতুন বেতন স্কেল নির্ধারণ ও তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









