স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে আরও তিন বছর বাড়তি সময় দেওয়ার সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। এর ফলে এলডিসি থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতির সময়কাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বর্তমান সূচি অনুযায়ী, এ বছরের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটার কথা ছিল।
সিডিপি জানিয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় মানদণ্ড অনেক বড় ব্যবধানে ধরে রেখেছে। নিকট বা মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের এই মানদণ্ড থেকে নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে। তবে শক্তিশালী পারফরম্যান্স সত্ত্বেও কমিটি মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির মতো বাহ্যিক চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশের মসৃণ উত্তরণের পথে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করছে সিডিপি।
সিডিপির চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পো জোর দিয়ে বলেন, ‘‘কমিটির মূল্যায়ন অনুযায়ী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি করা যথাযথ হবে। বরং প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির এই সময়ে বাংলাদেশকে তার বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে।’’
কমিটির মতে, ‘‘উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, কর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ।’’ এছাড়া এলডিসি পরবর্তী পরিবেশের জন্য বেসরকারি খাতকে প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এই সুপারিশ অনুমোদন করলে বাংলাদেশ তার ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি' বা মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় পাবে। এর ফলে বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে দেশ নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।’
সিডিপি আরও উল্লেখ করেছে যে, প্রস্তুতির সময়কাল এবং উত্তরণ-পরবর্তী উভয় পর্যায়েই বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্প সুদে ঋণ, কারিগরি সহায়তা, এলডিসি-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্য আলোচনার সক্ষমতা বৃদ্ধি।
বাংলাদেশ সরকার সিডিপির এই ইতিবাচক মূল্যায়ন ও সুপারিশকে স্বাগত জানিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি টেকসই, মসৃণ ও সফল এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে বলে তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য এই উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদুল হাসান খান। তিনি বলেন, ‘‘এই উদ্যোগের ফলে আমরা বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কিছু সময় পাব। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি বড় সুফল বয়ে আনবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) বা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির মতো নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব চুক্তি রাতারাতি সম্ভব নয়; এগুলোর জন্য সময়, কারিগরি বিশ্লেষণ এবং ধাপে ধাপে দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন।’’ তাড়াহুড়ো করলে প্রতিকূল শর্তে চুক্তি হওয়ার ঝুঁকি থাকে—বলে সতর্ক করেন তিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘‘প্রস্তাবিত তিন বছরের স্থগিতাদেশ একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। এটি শিল্পকে স্থিতিশীলতা গড়তে, উদ্ভাবন বাড়াতে এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সুযোগ দেবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘সরকার, শিল্পখাত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ এলডিসি-পরবর্তী উত্তরণকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সংযুক্তির সুযোগে পরিণত করতে পারবে।’’
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সিডিপির কাছে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত করার আবেদন জানায়। পরে ৬ এপ্রিল ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ বিষয়ে ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, ১৮ ফেব্রুয়ারি ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর সই করা চিঠিটি সিডিপির কাছে পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, কোভিড-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাপ্ত প্রস্তুতিমূলক সময়কালটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা থাকলেও পরপর একাধিক বৈশ্বিক ধাক্কায় সেই লক্ষ্য পূরণ ব্যাহত হয়েছে। কোভিড ১৯ প্যানডেমিকের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী কড়াকড়ি মুদ্রানীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলে (সাপ্লাই চেইন) বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে।
এছাড়া অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও বিনিয়োগ হ্রাস, রাজস্ব প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় কাঠামোগত সংস্কারের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ও নীতিগত সমন্বয় সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









