জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে বড় পরিসরে সবুজ বিনিয়োগের সম্ভাবনা। ২০১৮ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত গ্রিন বিল্ডিং, পরিবহন, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১৭২ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বস্ত্র, ঔষধ, অবকাঠামো, এগ্রি-বিজনেস, তথ্যপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস ও ভোগ্যপণ্য খাতেও বাংলাদেশের বাজারে বড় সম্ভাবনা দেখছেন স্পেনের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা।
স্পেনের মাদ্রিদে ‘বাংলাদেশ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ইন দ্য গ্লোবাল ইকোনম’ শীর্ষক এক সেমিনারে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনার এই চিত্র তুলে ধরা হয়। মাদ্রিদ চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত সেমিনারে বাংলাদেশের সবুজ বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেলো আসেন্সিয়ো।
আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের হিসাব অনুযায়ী, সম্ভাব্য ১৭১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সুযোগের মধ্যে গ্রিন বিল্ডিং খাতে ১১৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, পরিবহন অবকাঠামোয় ২৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন, নগর পানি ও বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনায় ১৩ বিলিয়ন এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষিতে ৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৪ বিলিয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের সুযোগ রয়েছে।
সেমিনারে অ্যাঞ্জেলো আসেন্সিয়ো বলেন, ২০১৮ থেকে ২০৩০ মেয়াদে বাংলাদেশে গ্রিন বিল্ডিং, ট্রান্সপোর্ট, ক্লাইমেট-স্মার্ট এগ্রিকালচার, অবকাঠামো ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে প্রায় ১৭২ বিলিয়ন ডলারের গ্রিন ইনভেস্টমেন্টের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণকে বড় চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে এই ১৭২ বিলিয়ন ডলার নিশ্চিত বিনিয়োগের অঙ্ক নয়, বিভিন্ন খাতে সম্ভাব্য জলবায়ু-স্মার্ট বিনিয়োগের বাজারের হিসাব। এই সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, নীতির ধারাবাহিকতা, অবকাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা সহজ করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এখন শুধু জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত। পোশাক, চামড়া, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণের গুরুত্ব বাড়ায় সবুজ প্রযুক্তি ও অর্থায়নের প্রয়োজনও বাড়ছে। এ ধরনের বিনিয়োগ বাড়লে জ্বালানি সাশ্রয়, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, কর্মসংস্থান এবং বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সেমিনারে ইউরোপের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও বিনিয়োগের সুযোগ ও সম্ভাবনাও অনেক। বর্তমান সরকার বৈদেশিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের বিনামূল্যে জমি দেওয়ার মতো সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকার নির্দিষ্ট মূল্যে কিনতে পারবে। এ ছাড়া অবকাঠামো ও লজিস্টিকস খাতেও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
এ সময় মাদ্রিদ চেম্বার অব কমার্সের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান এফবিসিসিআই প্রশাসক। এর পরিপ্রেক্ষিতে চেম্বারের প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেলো আসেন্সিয়ো জানান, আগামী নভেম্বর নাগাদ একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনা রয়েছে।
মাদ্রিদ চেম্বারের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫ সালে দুই পক্ষের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো।
মাদ্রিদ চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত সেমিনারে স্পেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. মাসুদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ইউরোচ্যাম বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নুরিয়া লোপেজ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরামর্শক পাবলো আরাউজো, মলিন্স-এর এশিয়া ও আফ্রিকার নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক এলবা এবং রিকভার-এর সাস্টেইনেবিলিটি বিভাগের গ্লোবাল ডিরেক্টর আনা রোডেস।
ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য নাহিয়ান রহমান রোচি এবং বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ। পরে বাংলাদেশ ও স্পেনের ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিটুবি নেটওয়ার্কিং সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআইয়ের মহাসচিব মো. আলমগীরসহ স্পেনে সফররত এফবিসিসিআইয়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সদস্য, মাদ্রিদ চেম্বার অব কমার্স ও ইউরোচ্যাম বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানো, শিল্প-সংযোগ স্থাপন এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের লক্ষ্যে গত ২৩ সেপ্টেম্বর ১১ দিনের সফরে ইউরোপে যায় এফবিসিসিআইয়ের ২৬ সদস্যের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল। দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









