বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে লবণ শিল্প। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরবর্তী সময় পর্যন্ত কক্সবাজার, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া ও পেকুয়া অঞ্চল ছিল দেশের প্রধান লবণ উৎপাদন কেন্দ্র। একসময় দেশের প্রায় পুরো লবণের চাহিদা পূরণ হতো এসব এলাকার প্রান্তিক চাষিদের উৎপাদিত লবণ থেকেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লবণ চাষ ছিল উপকূলীয় মানুষের প্রধান জীবিকার মাধ্যম।
স্বাধীনতার পর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বিসিকের তত্ত্বাবধানে লবণ শিল্প একটি সংগঠিত রূপ পায়। আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকে লবণ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে এবং দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নীতি দুর্বলতা, বাজার ব্যবস্থাপনার অভাব এবং আমদানি নির্ভরতার কারণে এই শিল্প ধীরে ধীরে সংকটে পড়তে শুরু করে।
চলতি মৌসুমে মহেশখালীর লবণ মাঠ ঘুরে দেখা গেছে—বিস্তীর্ণ এলাকায় উৎপাদিত লবণ মাঠেই পড়ে আছে। চাষিরা জানান, উৎপাদন খরচ বিগত বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বাঁধ নির্মাণ, মাঠ প্রস্তুত, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহন ব্যয় মিলিয়ে প্রতি মণ লবণের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ বাজারে সেই লবণ বিক্রি হচ্ছে কম দামে, অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচেরও নিচে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব লবণ শিল্পকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। অনিয়মিত বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় অনেক সময় মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই চাষ বন্ধ করতে হয়। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রান্তিক চাষিরা।
এর মধ্যেই সরকারের সাম্প্রতিক গত ৮ জানুয়ারি লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয় বাজারে বিপুল পরিমাণ দেশীয় লবণ মজুত থাকা সত্ত্বেও শিল্পখাতের চাহিদার কথা উল্লেখ করে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। লবণচাষিদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত দেশীয় লবণের বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে এবং দাম আরও কমে যাবে।
চাষি আবু তাহের,আমিনুল করিম, মুবিন,ছৈয়দ আলম সহ অনন্যরা বলছেন, “মাঠে লবণ পড়ে আছে, আমরা বিক্রি করতে পারছি না। এই অবস্থায় বিদেশ থেকে লবণ এলে আমাদের লবণের আর দাম থাকবে না।” তাদের আশঙ্কা, এমন সিদ্ধান্ত অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে অনেক চাষি লবণ চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।
সংকট উত্তরণে লবণচাষিরা একাধিক দাবি তুলেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য,দেশীয় লবণ বাজারে থাকা অবস্থায় লবণ আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা লবণচাষিদের জন্য ন্যূনতম ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা চালু করা,উৎপাদন খরচ কমাতে প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান,দুর্যোগকালীন ক্ষতিপূরণ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ সহায়তা,লবণ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা
বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণ শিল্প কেবল একটি কৃষিভিত্তিক উৎপাদন খাত নয়; এটি উপকূলীয় অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার ভিত্তি। পরিকল্পিত নীতি, চাষিবান্ধব সিদ্ধান্ত এবং দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে চলে যেতে পারে।
লবণচাষিরা এখন তাকিয়ে আছেন সরকারের কার্যকর উদ্যোগের দিকে। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না এলে এক সময় ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিতে পারে দেশের প্রাচীন ও সম্ভাবনাময় লবণ শিল্প।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









