জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদারে প্রায় ২৪০টি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) স্থাপন করা হলেও এসব ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো সিসিটিভি অপারেটর নেই। ফলে ক্যাম্পাসে চুরি, ছিনতাই, হামলা, যৌন হয়রানি কিংবা অন্যান্য অপরাধের ঘটনায় দ্রুত ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রশাসনিক ভবন, শহীদ মিনার, সকল অনুষদ, একাডেমিক ভবন, প্রবেশপথসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ধাপে ধাপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে প্রায় ২৪০টি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তবে এসব ক্যামেরা পরিচালনা, সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও ফুটেজ বিশ্লেষণের জন্য স্থায়ীভাবে নিয়োজিত কোনো দক্ষ অপারেটর বা পৃথক মনিটরিং সেল নেই।
ফলে কোনো ঘটনা ঘটলে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিয়ে কিংবা সীমিত জনবলের মাধ্যমে ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে জরুরি সময়ে দ্রুত ফুটেজ পর্যালোচনা ও অপরাধী শনাক্তকরণে বিলম্ব হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি ক্যাম্পাসে চুরি, মোবাইল ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনার পর সিসিটিভি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, কোনো ঘটনার পর ফুটেজ দেখতে গিয়ে যদি বাইরের কোনো অপারেটরের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় না।
ইংরেজি বিভাগের ৫১ ব্যাচের শিক্ষার্থী সজীব বলেন, “কয়েকদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ইভেন্ট পরিচালনা করেছি। ইভেন্টের পর কিছু সরঞ্জাম নতুন কলা ভবনের সামনে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে দেখি সরঞ্জামগুলো সেখানে নেই। এরপর প্রক্টর বরাবর অভিযোগ করে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে গেলে জানতে পারি, সিসিটিভি ফুটেজ পরিচালনায় দক্ষ ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই; বাইরে থেকে তাকে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, “এত বিশাল একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার জন্য এতগুলো সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। অথচ সেগুলো পরিচালনার জন্য একজনও নিজস্ব সিসিটিভি অপারেটর নেই—বিষয়টি অদ্ভুত। আবার নতুন কলাভবনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়নি। এগুলোও জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন।”
গণিত বিভাগের ৫৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী সাব্বির আহমেদ শোভন বলেন, “ক্যাম্পাসে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম, চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন ঘটনায় দেখেছি, সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে হলে বলা হয়—সিসিটিভি ক্যামেরা অপারেটর সাভার থেকে আসবেন, এরপর দেখা যাবে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ফুটেজ দেখে কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। প্রশাসনের উচিত নিজস্ব সিসিটিভি ফুটেজ অপারেটর দিয়ে ২৪ ঘণ্টা এগুলো পরিচালনা করা।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সিসিটিভি কেবল ক্যামেরা স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং, সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, দ্রুত ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের সার্বক্ষণিক মনিটরিং ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। কোনো ঘটনা ঘটলে তখন ফুটেজ বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে তদন্তে বিলম্ব হয়।”
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেন, “আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আরও আগে অবগত করেছি যে, সিসিটিভি অপারেটর যদি এ ধরনের চাকরিভিত্তিক হয় এবং ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে অপারেটর না থাকে, তাহলে সিসিটিভির কার্যকারিতা ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে না। এজন্য আমরা জনবল নিয়োগের কথা বলেছি।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বরাবরই জনবল নিয়োগের ব্যাপারে চরম উদাসীনতা রয়েছে। বিষয়টি এখানেও পরিলক্ষিত হয়েছে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে বারবার দাবি জানিয়ে আসছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবল সংকট দূর করার পাশাপাশি সিসিটিভি কার্যক্রমের জন্য স্থায়ীভাবে একাধিক অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হোক।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, “ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু আমাদের ক্যাম্পাসের নিজস্ব সিসিটিভি ফুটেজ অপারেটর না থাকা একধরনের সীমাবদ্ধতা। আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি, যেন পেশাদার ক্যামেরা অপারেটর দেওয়া হয়। তাহলে প্রক্টরিয়াল বডি এক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।”
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সিসিটিভি ফুটেজ অপারেটরসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য আমরা কয়েক দফা আলোচনা করেছি। আশা করছি, অতি শিগগিরই এগুলো সমাধান করা হয়ে যাবে।”
শিক্ষার্থীদের দাবি, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু নতুন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করলেই হবে না; বরং প্রশিক্ষিত ও স্থায়ী সিসিটিভি অপারেটর নিয়োগ, ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং ব্যবস্থা চালু এবং দ্রুত ফুটেজ বিশ্লেষণের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্থান এখনো ক্যামেরার আওতার বাইরে রয়েছে, সেসব স্থানকেও দ্রুত সিসিটিভির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। এতে অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত তদন্ত ও জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









