নতুন উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) তীব্র উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে।
রবিবার (১৭ মে) সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, প্রশাসনিক ভবন এলাকা ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
একপর্যায়ে পুরো ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুর জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দিনভর থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। সংঘর্ষের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ডুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনকে নিয়োগ দেয় সরকার। তিনি পূর্বে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলনে নামে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এর প্রশাসনিক ও একাডেমিক বাস্তবতা অন্যান্য সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কাউকে নয় বরং ডুয়েটের অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অবগত কাউকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত ছিল।
প্রতিবাদের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার রাতেই শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও সড়ক অবরোধ শুরু করে। গত কয়েকদিন ধরে চলতে থাকা এই আন্দোলনের জেরে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছিল।
রবিবার সকাল ১০টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ডুয়েটের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন শুরু করেন। এ সময় ভিসির সমর্থক হিসেবে পরিচিত কিছু বহিরাগত ব্যক্তি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষ চলাকালে দুই পক্ষ একে অপরকে ধাওয়া দেয় এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ক্যাম্পাসজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য হল ও বিভাগীয় ভবনে আশ্রয় নেন। সংঘর্ষের সময় কয়েকটি মোটরসাইকেল ও যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষার জন্য আন্দোলন করছেন। তাদের দাবি, ডুয়েটের শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে অভ্যন্তরীণ শিক্ষকরা বেশি অবগত। তাই বহিরাগত কাউকে এনে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়াকে তারা যৌক্তিক মনে করছেন না।
তারা অভিযোগ করেন, তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভণ্ডুল করতে বহিরাগতদের এনে হামলা চালানো হয়েছে। হামলার সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়িত বলেও অভিযোগ করেন তারা।
ঘটনার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের পক্ষে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, ডুয়েটে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে।
বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ডুয়েটের “ছাত্রশিবির সংশ্লিষ্ট” কিছু শিক্ষার্থী নতুন ভিসির নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির করে রেখেছে। তারা অভিযোগ করেন, বিদায়ী প্রশাসনের কিছু অংশ এবং “গুপ্ত সংগঠন ছাত্রশিবির” রাজনৈতিক উদ্দেশে একত্রে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
ছাত্রদলের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে উপাচার্য নিয়োগ একটি প্রচলিত বিষয়। কিন্তু ডুয়েটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।
বিবৃতিতে আজকের সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এক যৌথ বিবৃতিতে দাবি করেছে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপিপন্থি শিক্ষক-কর্মকর্তা ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়েছে।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম এবং সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, নিজস্ব শিক্ষকদের মধ্য থেকে যোগ্য ও দলীয় লেজুড়বৃত্তিমুক্ত উপাচার্য নিয়োগের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিলেন। এ সময় ছাত্রদল, যুবদল ও বহিরাগতরা দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়।
তাদের দাবি, হামলায় অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা দেওয়া, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়।
বিবৃতিতে ছাত্রশিবির আরও অভিযোগ করে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ধারাবাহিকভাবে সহিংসতা ও দখলদারিত্বের রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। তারা তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ, রুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ তুলে ধরে।
একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করে, দলীয় বিবেচনায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে এবং এসব সিদ্ধান্ত শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
ঘটনার পর ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক উত্তেজনাও বৃদ্ধি পায়। ছাত্রদল অভিযোগ করে, ছাত্রশিবির নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে। অন্যদিকে ছাত্রশিবির দাবি করে, ছাত্রদল হামলার দায় এড়াতে পরিকল্পিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, “গত বৃহস্পতিবার নতুন উপাচার্য নিয়োগের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আন্দোলন করে আসছিল। রবিবার সকালে পুনরায় আন্দোলন শুরু হলে কিছু বহিরাগত ব্যক্তি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।”
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিন বলেন, “গত দুইদিন ধরেই ডুয়েটে নতুন উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে উত্তেজনা চলছিল। আজ সকালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









