শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, এবং পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম করে গড়ে তোলে।
রবিবার (১৭ মে) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এবং অক্সফোর্ড পলিসি ম্যানেজমেন্ট আয়োজিত এক কর্মশালায় এ তথ্য উঠে আসে।
বিআইজিডি এবং ওপিএম যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার সুযোগ তৈরি করা। পাশাপাশি প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ এবং সামাজিক সুরক্ষাকে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা, যাতে সমাজে গতিশীলতা বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি হয়। কর্মশালায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাগণ এবং উন্নয়ন সংস্থা, একাডেমিয়া, ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে কর্মশালার মূল বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হয়। বিআইজিডি উপস্থাপন করে সামাজিক গতিশীলতা বিষয়ক গবেষণা, আর ওপিএম তাদের দুটি কর্মসূচির আলোকে শৈশবকালীন বিকাশ ও দারিদ্র্য বিষয়ক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. আবদুর রাজ্জাক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল, বিআইডিএস মহাপরিচালক অধ্যাপক এনামুল হক, সানেম নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক (বেন) চেয়ার ড. মনজুর আহমেদ প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রথমত, নগদ আর্থিক সহায়তার সাথে অভিভাবকদের সহযোগিতা কার্যক্রমকে কীভাবে একত্রিত করা যায়, তা নিয়ে গবেষণালব্ধ ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
দ্বিতীয়ত, কার্যকরী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রভাব যে কেবল বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, পরবর্তী প্রজন্মেও তা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে সেবিষয়ে একটি বিশেষ কেস স্টাডি তুলে ধরা হয়।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের সাথে মিলে প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ নীতি ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ শিশুর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হচ্ছে।
আইসিডিডিআরবি’র ইমেরিটাস বিজ্ঞানী ড. জেনা হামাদানি বলেন, “শৈশবের শুরু থেকেই শিশুর বিকাশে মনোযোগ দিলে ভবিষ্যতে একটি দক্ষ ও যোগ্য কর্মশক্তি গড়ে ওঠে। এই দক্ষ মানুষেরা জীবনের নানা সুযোগ কাজে লাগাতে পারে এবং দেশের অর্থনীতিকে সচল, কার্যকরী ও সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
তিনি আরও বলেন, “শিশুর প্রাথমিক বিকাশ কার্যক্রম সমাজে এক গভীর পরিবর্তন আনতে সক্ষম। এটি একদিকে যেমন প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনমান উন্নত করে, তেমনি সমাজে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করে যারা দারিদ্র্য ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরবর্তী সময়ে করা যেকোনো ইন্টারভেনশনের তুলনায় শৈশবকালীন বিনিয়োগ অনেক বেশি ফলপ্রসূ এবং দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত লাভজনক।”
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষা ছিল সমতার চালিকাশক্তি, কিন্তু এখন শিক্ষা বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।”
তিনি দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের মুখোমুখি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি তৈরি হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। এটি তার মতে সামাজিক গতিশীলতার অভাবের একটি উদ্বেগজনক সূচক।
ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের অধ্যাপক অ্যান্ডি ম্যাকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে সামাজিক গতিশীলতার গুরুত্ব এবং প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ ও মানব পুঁজির সাথে এর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। ২০২৫ সালে তানজানিয়ার আরুশায় অনুষ্ঠিত ডিইইপি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণার ভিত্তিতে তিনি আলোচনা করেন সামাজিক গতিশীলতা বলতে কী বোঝায়, এটি কীভাবে পরিমাপ করা যায় এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ। তার গবেষণাপত্রে দুই ধরনের গতিশীলতা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়: একটি হলো আন্তঃপ্রজন্মীয় গতিশীলতা (প্রজন্মের মধ্যে আর্থসামাজিক মর্যাদার পার্থক্য), অন্যটি হলো অন্তঃপ্রজন্মীয় গতিশীলতা (একজন ব্যক্তির জীবদ্দশায় ঘটা পরিবর্তন)। পাশাপাশি ডিইইপি গবেষণা প্রকল্পের মূল ধারণা যেমন—দারিদ্র্য কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে, মানুষ কীভাবে দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে যায় এবং কোন কোন দুর্বলতা বা ভঙ্গুর পরিস্থিতি মানুষকে আরও পিছিয়ে দেয় এই বিষয়গুলো নিয়েও তিনি আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর পারস্পরিক সমঝোতা বা বিকল্প বাছাইয়ের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন। একইসাথে তিনি আরও বলেন, আমাদের শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ করা হলো মূলত আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য একটি দূরদর্শী এবং অর্থবহ বিনিয়োগ।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম সচিব ও প্রকল্প পরিচালক (অ.দা.) ড. দিপঙ্কর রায় ডেটা ও এভিড্যান্স বিষয়ক অধিবেশনে প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি গবেষণা ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মধ্যে সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যৎ গবেষণার স্বার্থে তথ্যকে আরও সহজলভ্য করার আহ্বান জানান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









