একদিকে উত্তাল মেঘনা, অন্যদিকে নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় দিন কাটানো হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস। বছরের পর বছর নদীভাঙনের নির্মম আঘাতে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও কবরস্থান হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বরিশালের হিজলা উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। মেঘনার ভয়াল ভাঙন থেকে জনপদ রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে হিজলা উপজেলার গৌরবদী ইউনিয়নের মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় আয়োজিত এ মানববন্ধনে অংশ নেন নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গৌরবদী ইউনিয়নের শাওড়া এলাকা থেকে ধূলখোলা ইউনিয়নের মাটিয়ালা গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত নদী তীরবর্তী অন্তত আটটি গ্রাম বছরের পর বছর মেঘনার ভাঙনের কবলে পড়ে আসছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমে নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। অসংখ্য পরিবার তাদের শেষ সম্বল বসতভিটা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ফসলি জমি, ফলদ বৃক্ষ, রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা এমনকি পূর্বপুরুষদের কবরও রক্ষা করা যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন চললেও স্থায়ী প্রতিরোধমূলক কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়নি। মাঝে মধ্যে অস্থায়ী কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা নদীর প্রবল স্রোতের কাছে টিকতে পারেনি। ফলে প্রতিবছরই নতুন করে ভাঙনের শিকার হচ্ছেন হাজারো মানুষ।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এলাকাবাসী বলেন, আমাদের চোখের সামনে একের পর এক ঘরবাড়ি নদীতে চলে যাচ্ছে। কেউ জমি হারাচ্ছে, কেউ হারাচ্ছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই পুরো এলাকা মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।
বক্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে গৌরবদী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা মেঘনার গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। এতে শুধু বসতভিটা নয়, স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, বাজার, সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও সামাজিক স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়বে।
মানববন্ধন থেকে এলাকাবাসী দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তারা অবিলম্বে নদীভাঙন রোধে একটি স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণের জোর দাবি জানান।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন হিজলা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট দেওয়ান মো. মনির হোসেন, গৌরবদী ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ ফরিদ উদ্দিন বেপারী, উপজেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মতিন তালুকদার, সদস্য সচিব আমির বাঘা, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মহসিন সিকদার, কৃষকদলের আহ্বায়ক সম ফারুক, সদস্য সচিব ফয়েজ হাওলাদার, বড়জালিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক সম হুমায়ন, গৌরবদী ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলম শরীফ সিকদার, হুমায়ন তালুকদার, জসিম সিকদার, বিএনপি নেতা ফারুক ফরাজী, আলাউদ্দিন বাবুর্চি, যুবদল নেতা মোস্তফা সিকদার, আলতাফ জমাদারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, সরকার পরিবর্তন হয়েছে বহুবার, কিন্তু মেঘনা ভাঙনের স্থায়ী সমাধান আজও হয়নি। প্রতি বছর মানুষ ঘর হারায়, জমি হারায়, জীবন-জীবিকা হারায়। অথচ এই জনপদের মানুষের কান্না যেন কেউ শুনছে না। এখন আর আশ্বাস নয়, আমরা স্থায়ী সমাধান চাই।
তারা আরও বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের নদীভাঙন কবলিত এই জনপদকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে নদীশাসন ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে এবং রাষ্ট্রকে আরও বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
মানববন্ধন শেষে এলাকাবাসী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে নদীভাঙন রোধের দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। একইসঙ্গে তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









