আগামী ১৩ জুন কক্সবাজার সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দিনব্যাপী এই সফরে জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, রাজনৈতিক জনসভা এবং সুধী সমাবেশে অংশ নেবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। একই সঙ্গে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নানা দাবি ও প্রত্যাশাও তুলে ধরছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পাতলী খাল ঘিরে স্মৃতিচারণ ও নতুন প্রত্যাশা:
সরেজমিনে সদর উপজেলার পিএমখালীর ঐতিহাসিক পাতলী খাল এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। জানা যায়, ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কক্সবাজার সফরকালে এই খাল খনন কার্যক্রমের সূচনা করেছিলেন। স্থানীয়দের মতে, ওই উদ্যোগ এলাকার কৃষি, মৎস্য ও জনজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিল
সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাতলী খালের পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পর সেখানে একটি জনসভায় বক্তব্য দেওয়ারও কথা রয়েছে তার।
পিএমখালী ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি মো. শামশুল হক বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর এই সফর পিএমখালীবাসীর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তার পিতার স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় এসে পাতলী খাল পুনঃখননের উদ্বোধনের মাধ্যমে তিনি যেমন স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন, তেমনি নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নও করছেন। খালটি পুনঃখনন হলে অন্তত দুই লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।”
পিএমখালী এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, “ছোটবেলায় মা-বাবার সঙ্গে খালের কাজ দেখতে এসেছিলাম। তখন মানুষের মুখে মুখে ছিল জিয়াউর রহমানের নাম। সবাই বিশ্বাস করতেন, তার উদ্যোগেই এই খাল এলাকার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।”
স্থানীয় শমসের বাহাদুর বলেন, “পাতলী খাল পুনঃখননকে ঘিরে পুরো এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পিএমখালীতে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিও রয়েছে।”
এদিকে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে জিয়াউর রহমানের স্মৃতিকে সংরক্ষণের লক্ষ্যে পাতলী খাল এলাকায় ‘জিয়া স্মৃতি পার্ক’ নির্মাণের দাবিও জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে।
সফরসূচি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শন করবেন। পরে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন, যা একই সঙ্গে সারাদেশে শুরু হবে।
এরপর তিনি পেকুয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। একই সফরে নবগঠিত পেকুয়া পৌরসভা, মাতামুহুরী উপজেলা এবং মাতামুহুরী থানার উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।
বিকেলে চকরিয়া বাস টার্মিনাল এলাকায় রাজনৈতিক জনসভায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ ও সমুদ্রসৈকত পরিদর্শন করবেন। সন্ধ্যায় জেলার বিশিষ্টজনদের নিয়ে সুধী সমাবেশে অংশ নেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে স্থানীয়রা জেলার দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয় তুলে ধরছেন।
বাসটার্মিনাল এলাকার বাসিন্দা শামসুল আলম বলেন, “কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা এবং একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।”
কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ আকতার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি নানা সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বর্তমান অবস্থানে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে কলেজটি জাতীয়করণ হলে জেলার উচ্চশিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।”
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মীর মোশারফ হোসেন টিটু বলেন, “কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আরও পরিকল্পিত ও আধুনিক উদ্যোগ প্রয়োজন।”
কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর নাছিমা বকুল বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, মাদক পাচার ও সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সাধারণ সম্পাদক মো. আকতার নুর বলেন, “সুধী সমাবেশে কক্সবাজারের সার্বিক উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সমুদ্রসৈকতের নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হবে।”
সাবেক কাউন্সিলর আশরাফুল হুদা সিদ্দিকী জামশেদ বলেন, “পরিকল্পিত আধুনিক পর্যটন নগরী গঠন, পান-লবণ ও মৎস্য শিল্পের আধুনিকায়ন, ব্লু ইকোনমিভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার দাবি স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের।”
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবদূত মজুমদার বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জেলা প্রশাসন, সওজ, গণপূর্ত ও বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “সফরসূচিতে থাকা উদ্বোধন, পরিদর্শন ও মতবিনিময় কর্মসূচি সফল ও নিরাপদভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।”
সব মিলিয়ে উন্নয়ন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনআকাঙ্ক্ষা এবং ঐতিহাসিক স্মৃতির সমন্বয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কক্সবাজার সফরকে ঘিরে জেলায় বিশেষ গুরুত্ব ও আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের আশা, এই সফরের মাধ্যমে কক্সবাজারের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন দাবিগুলোর বাস্তবায়নে নতুন গতি সঞ্চার হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









