নদীর নিজস্ব এক গম্ভীর ভাষা আছে, যা কেবল তারাই বোঝে যারা জীবনের চার দশক তার ঢেউয়ের তালে বৈঠা চালিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স খেয়াঘাটের বৃদ্ধ মাঝি হোসেন আলীর কাছে শীতলক্ষ্যা কেবল একটি নদী নয়, বরং তার ফেলে আসা যৌবন এবং সংগ্রামের জীবন্ত মহাকাব্য।
প্রায় ৪০ বছর আগে যে স্বচ্ছ রুপালি স্রোতে তিনি নৌকার হাল ধরেছিলেন, আজ সেই নদীই শিল্পবর্জ্যে কালচে বর্ণ ধারণ করে বিষাক্ত নিশ্বাস ছাড়ছে। কিন্তু সময়ের এই নির্মম বিবর্তনেও তিনি অবিচল, যেন প্রবাহমান স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এক মূর্ত সংকল্প।
একসময় এই ঘাটের আয় দিয়েই তিনি সন্তানদের মানুষ করেছেন। এই খেয়া কেবল জীবিকা ছিল না, ছিল মুমূর্ষু মানুষের আস্থার শেষ আশ্রয়। গভীর রাতে হাসপাতালের জন্য আর্তনাদ করা রোগীদের নদী পার করে দিতে হোসেন আলী ছিলেন নিঃস্বার্থ অগ্রসেনানী।
এই ঘাটের নিয়মিত যাত্রী ফজুর বাড়ি এলাকার সফিউল্লাহ বলেন, হোসেন মাঝি শুধু একজন মাঝি নন, তিনি এই এলাকার মানুষের বিপদের বন্ধু। গভীর রাতেও অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে কখনো না করেননি। কত মানুষকে বিনা ভাড়ায় পার করে দিয়েছেন তার হিসাব নেই। এখন নদীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় তার মতো মানুষও কষ্টে আছেন।
আজ সেই চেনা ঘাটে বড় বড় ভেসেল আর বাণিজ্যিক জাহাজের দাপটে ছোট ডিঙিগুলো জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অনিরাপত্তা, দূষণ আর আয় কমে যাওয়ার কারণে তার সঙ্গী-সাথিরা একে একে এই পেশা ছেড়ে অন্য পথে পা বাড়ালেও হোসেন আলী পারেননি তার শেকড় ভুলতে।
মাঝি হোসেন আলী বলেন, ‘‘নদীটা এহন আর আগের মতো আমাগো চিনে না বাবা। এক সময় এই গাঙের পানি চোখে দিলে শরীর জুড়াইয়া যাইত, আর এহন পানিতে হাত দিলেই চুলকায়। বড় বড় জাহাজগুলা যখন সামনে দিয়া যায়, মনে হয় এই বুঝি আমাগো জ্যান্ত কবর দিয়া দিল। অনেকেই ডরে পলাইয়া গেছে, কিন্তু আমি যামু কই? এই নৌকাডারেই তো আমি পেটের ছেলের মতো জানি। এর কাঠে কাঠে আমার সারা জীবনের হাহাকার আর কত মানুষের দোয়া লাইগা আছে। মরলে এই গাঙেরই পাড়ে মরুম, কিন্তু এই নৌকাডারে আমি ছাড়তে পারুম না।’’
শীতলক্ষ্যার বদলে যাওয়া রূপ নিয়ে স্থানীয় প্রবিণ মৎস্যজীবী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘‘এক সময় শীতলক্ষ্যার পানি ছিল স্বচ্ছ, মাছও ছিল প্রচুর। এখন দূষণ আর বড় জাহাজের কারণে নদীর আগের রূপ আর নেই। হোসেন মাঝির মতো মানুষরা হারিয়ে গেলে নদীর ইতিহাসও হারিয়ে যাবে।’’
৭৫ বছরের এই বৃদ্ধ মাঝি বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর আর ক্ষীণ হতে থাকা দৃষ্টি নিয়ে আজও তার ডিঙি নৌকাটির পরম যত্ন নেন। রোদে পুড়ে পিঠ বাঁকিয়ে যখন নৌকার তলায় আলকাতরার প্রলেপ দেন, তখন মনে হয় তিনি কেবল কাঠ মেরামত করছেন না, বরং তার জীবনের জরাজীর্ণ স্মৃতিগুলোকেই নতুন করে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছেন। এই নৌকাটিই তার পরিচয়, তার শেষ অবলম্বন।
নদী ও নদীকেন্দ্রিক জীবিকার সংকট প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, ‘‘শীতলক্ষ্যা নদী আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। নদী দূষণ রোধ এবং নদীকেন্দ্রিক জীবিকার সঙ্গে জড়িত মানুষদের টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নদী রক্ষার পাশাপাশি এসব মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’’
চকমকে নগরায়ণ আর যান্ত্রিকতার এই রুক্ষ সময়ে মাঝি হোসেন আলী আমাদের শিখিয়ে দেন, জীবন যতই প্রতিকূল হোক, নিজের অস্তিত্ব আর জীবিকার প্রতি ভালোবাসা কখনো পুরোনো হয় না। তার গল্প নদীকেন্দ্রিক জনপদের বদলে যাওয়া বাস্তবতার এক জীবন্ত দলিল। এটি শুধু একজন মাঝির সংগ্রামের কাহিনি নয়, বরং শীতলক্ষ্যার বুক থেকে হারিয়ে যেতে বসা নদীসভ্যতার প্রতিচ্ছবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









