ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল যখন ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, তখন ফ্লাভিওর সম্ভাব্য জয়কে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে তেল আবিব।
সাও পাওলোতে নির্বাচনী প্রচারণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহুর ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়। সেখানে তিনি ফ্লাভিওকে ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করে ব্রাজিল ও ইসরায়েলের বন্ধুত্বের সমর্থক হিসেবে প্রশংসা করেন।
ফ্লাভিও ক্ষমতায় এলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ব্রাজিলের দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়া এবং ইসরায়েলকেন্দ্রিক ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’-এ যোগ দেওয়ার কথা বলেছেন। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলকে ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে যুক্ত করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও তার রাজনীতিতে রয়েছে।
সাও পাওলোর ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব উবেরল্যান্ডিয়ার অধ্যাপক ডেভিড ম্যাগালহায়েসের মতে, ফ্লাভিও জয়ী হলে নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবেন। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে ঘিরে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক চাপের সময়ে ব্রাজিলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সমর্থন ইসরায়েলের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে ব্রাজিলে ইসরায়েলের প্রভাব বলসোনারো পরিবারের সময় থেকে শুরু হয়নি। সামরিক বাহিনী, পুলিশ, প্রতিরক্ষা শিল্প ও ইভানজেলিক্যাল রাজনীতির সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কয়েক দশকের। ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে ইসরায়েলি অস্ত্র কোম্পানিগুলো ব্রাজিলের প্রতিরক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
গবেষকদের মতে, বলসোনারো সেই সম্পর্কের সূচনা করেননি; বরং আগের কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করেছেন। ফলে কোনো একটি সরকারের পক্ষে সামরিক ও প্রযুক্তিগত এই নির্ভরতা দ্রুত ছিন্ন করা কঠিন।
লুলা সরকার অবশ্য ইসরায়েলের ব্যাপারে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। তিনি গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে ‘গণহত্যা’ এবং ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা বলেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার করা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের মামলায় ব্রাজিলও যোগ দিয়েছে। ২০২৪ সালে ব্রাজিল তেল আবিব থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়।
তবু সামরিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি। ২০২৪ সালে ব্রাজিলের সামরিক বাহিনী ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এলবিটের সঙ্গে ২১ কোটি ডলারের অস্ত্রচুক্তি করলে লুলা তা স্থগিত করেন, বাতিল করেননি।
ইসরায়েলের সঙ্গে বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠতার আরেকটি দৃষ্টান্ত তার ছেলে এদুয়ার্দো বলসোনারো। ২০২৫ সালে ব্রাজিলে এক ইসরায়েলি সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু হলে এদুয়ার্দো ইসরায়েলি মন্ত্রী আমিচাই চিকলির সঙ্গে যোগাযোগ করে তদন্ত বন্ধের জন্য চাপ দেন। পরে তদন্ত বন্ধ হয়ে যায় বলে তিনি নিজেই দাবি করেন।
ব্রাজিলের পার্লামেন্টেও ইসরায়েলপন্থী শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে। সামরিকপন্থী ‘বুলেট’, কৃষি ও পশুপালন ব্যবসার ‘বিফ’ এবং ইভানজেলিক্যালদের ‘বাইবেল’—এই ‘থ্রি বি’ জোটের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন বিশেষভাবে দৃশ্যমান। দেশটিতে আনুমানিক চার কোটি ইভানজেলিক্যাল ভোটার রয়েছেন।

তবে নির্বাচনের প্রধান ইস্যু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নয়। সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেলিসিয়ানো দে সা গিমারায়েসের মতে, ব্রাজিলের ভোটারদের কাছে কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় ও জননিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আন্তর্জাতিক ইস্যু রাজনৈতিক আনুগত্যকে আরও দৃঢ় করতে পারে।
সাম্প্রতিক পিউ গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রাজিলের অর্ধেকের বেশি মানুষের ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে এবং ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ নেতানিয়াহুর ওপর আস্থা রাখেন না।
ফলে ব্রাজিলের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই নয়; দেশটির পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশেরও পরীক্ষা। লুলার সমালোচনামুখী অবস্থানের বিপরীতে ফ্লাভিও বলসোনারো প্রকাশ্যেই ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
এই কারণেই ব্রাজিলের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে ইসরায়েল। বলসোনারো পরিবারের কেউ আবার ক্ষমতায় ফিরলে, গাজা যুদ্ধের সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে চাপের মুখে থাকা ইসরায়েল একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র ফিরে পেতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









