ইতালির কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও মডেল মনিকা বেলুচ্চি ৩০ সেপ্টেম্বর ৬০ বছরে পা দিয়েছেন। ২০২৪ সালের অক্টোবর সংখ্যার প্রচ্ছদকন্যা হিসেবে তাকে নিয়ে বিশেষ আয়োজন করেছে ‘ভোগ ইতালিয়া’। জন্মদিন উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন অভিনয়, শিল্প, ভালোবাসা, মাতৃত্ব, বয়স এবং জীবনের নতুন অধ্যায় নিয়ে।
তার ভাষায়, ‘‘সামনে যা-ই আসুক, তিনি তার জন্য প্রস্তুত।’’
মনিকার এই বিশেষ সংখ্যার ফটোশুট করেছেন তার তৎকালীন সঙ্গী ও বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা টিম বার্টন। আর বিশেষ কিছু অপ্রকাশিত ছবি তুলেছিলেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও খ্যাতিমান ফটোগ্রাফার পাওলো রোভেরসি।

পুরোনো ছবিতে ফিরে দেখা
কয়েক মাস আগে প্যারিসে রোভেরসির সঙ্গে দেখা হয়েছিল মনিকার। সেখানে তিনি তাকে ২০০০ সালের মে মাসে তোলা কিছু অপ্রকাশিত ছবি দেখান। সেই সময় স্টুডিও লুসে ডিয়ারডর্ফ ক্যামেরায় ছবিগুলো তোলা হয়েছিল।
ছবিতে দেখা যায়, তরুণ মনিকা তখন নিজের পরিচয় ও শিল্পীসত্তাকে গড়ে তুলছেন। রোভেরসি সেই দিনের কথা স্মরণ করে বলেন, স্টুডিওজুড়ে মনিকার সৌন্দর্যের এক বিশেষ আলো ছড়িয়ে পড়েছিল এবং পুরো দলই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল।
মনিকা বলেন, রোভেরসির চোখ দিয়ে তিনি নিজেকে বেড়ে উঠতে দেখেছেন—একজন তরুণী হিসেবে, একজন মা হিসেবে এবং পরে নিজের মেয়ে দেবার সঙ্গে কাজ করা একজন নারী হিসেবে। তার কাছে এটি একটি বিশেষ উপহার।
মেয়ে দেবা ক্যাসেলের কাজের প্রসঙ্গে মনিকা বলেন, মেয়ের মধ্যে শিল্পের প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই ছিল। সংগীত, ছবি আঁকা ও সিনেমা—সবকিছুর প্রতিই তার কৌতূহল রয়েছে। মেয়ের কৌতূহল ও কল্পনাশক্তি দেখে তিনি আনন্দিত।

মডেলিং থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র
মনিকা বেলুচ্চিকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ও প্রভাবশালী অভিনেত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেখা হয়। তার ক্যারিয়ার বিস্তৃত হয়েছে ফ্যাশন, সিনেমা ও থিয়েটার—তিন ক্ষেত্রেই।
রিচার্ড অ্যাভেডন, পিটার লিন্ডবার্গ ও হেলমুট নিউটনের মতো খ্যাতিমান ফটোগ্রাফারের ক্যামেরার সামনে কাজ করেছেন তিনি। ছিলেন ডলচে অ্যান্ড গাব্বানা ও কার্তিয়েরের মডেল এবং ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর।
চলচ্চিত্রে তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে জিউসেপ্পে তোরনাতোরের ‘মালেনা’, ‘ম্যাট্রিক্স’ এবং জেমস বন্ড সিরিজের ‘স্পেকট্রে’। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন দাভিদ দি দোনাতেল্লো, গোল্ডেন গ্লোব ও নাস্ত্রি দ’আরজেন্তোসহ বিভিন্ন পুরস্কার।
২০২৪ সালে টিম বার্টনের ‘বিটলজুস বিটলজুস’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন তিনি। ছবিতে তার চরিত্র মৃত্যুর জগত থেকে ফিরে এসে সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চায়।
নিজের চরিত্রটি নিয়ে মনিকা বলেন, এটি অনেকটা জীবনের রূপক। তার চরিত্র ডেলোরেসের শরীরে অনেক ক্ষতচিহ্ন থাকলেও সে লড়াই চালিয়ে যায়।
মনিকার ভাষায়, নারীরা আঘাত পেলেও সামনে এগিয়ে যেতে জানেন—এমনকি যেন মৃত্যুর পরও ফিরে আসতে পারেন।

টিম বার্টনের সঙ্গে শিল্প ও ভালোবাসা
মনিকার জন্মদিন উপলক্ষে ‘ভোগ ইতালিয়া’র প্রচ্ছদের ছবিগুলো তোলা হয়েছে ইতালির বোমারজোর বিখ্যাত ‘স্যাক্রেড উড’ বা পবিত্র বনে। প্রায় ৫০০ বছর আগে প্রিন্স ওরসিনি তার স্ত্রী জুলিয়া ফার্নেজের স্মৃতিতে এই জায়গাটি তৈরি করেছিলেন।
মনিকার কাছে জায়গাটি ছিল স্বপ্নের মতো। তিনি বলেন, শিল্প, ছবি ও সিনেমার প্রতি তার ভালোবাসার মধ্যে ৬০তম জন্মদিন এমন একটি জায়গায় উদ্যাপন করতে পারা তার জন্য বিশেষ আনন্দের।
টিম বার্টনের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে মনিকা বলেন, প্রিয় মানুষের সঙ্গে যখন সৃজনশীল সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন সেই সম্পর্ক থেকে নতুন শক্তি ও নতুন কাজের জন্ম নেয়।
তবে তার কাছে জীবনের গুরুত্ব শিল্পের চেয়েও বেশি। তিনি মনে করেন, শিল্পও আসলে জীবনেরই একটি রূপ—যেমন সন্তান, বন্ধু ও সত্যিকারের সম্পর্কের প্রতি ভালোবাসাও জীবনের অংশ।

ডলচে অ্যান্ড গাব্বানার সঙ্গে ৩০ বছরের সম্পর্ক
ফ্যাশন ব্র্যান্ড ডলচে অ্যান্ড গাব্বানার সঙ্গে মনিকার সম্পর্কও প্রায় তিন দশকের। এই দীর্ঘ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয়েছে ‘মনিকা’ নামে একটি বই।
মনিকা জানান, ডোমেনিকো ডলচে ও স্তেফানো গাব্বানার সঙ্গে তার প্রথম দিকের ফ্যাশন শোয়ের অভিজ্ঞতা ছিল। ১৯৯৪ সালে তোরনাতোরের পরিচালনায় ডলচে অ্যান্ড গাব্বানার একটি সুগন্ধির বিজ্ঞাপনে কাজ করার পরই অভিনয়ের দিকে তার পথ আরও দৃঢ় হয়।
ডলচে অ্যান্ড গাব্বানার পোশাক সম্পর্কে তিনি বলেন, এগুলো পরলে তার মনে হয় যেন নিজের ত্বকই পরেছেন। তাদের সম্পর্কের ভিত্তি গভীর ভালোবাসা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া।

‘দ্য ডিভাইন’ হয়েও মাটির কাছাকাছি
চেকোস্লোভাকিয়ার ‘ভোগ’ তাকে মাত্র দুটি শব্দে বর্ণনা করেছে—‘দ্য ডিভাইন’ বা ‘দেবী’। বহু বছর ধরে এই বিশেষণ তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
তবে মনিকা নিজেকে সবসময় মাটির কাছাকাছি রেখেছেন বলে জানান। তিনি বলেন, অভিনয় ও কল্পনার জগতে তিনি আনন্দ পান, কিন্তু এটাও জানেন যে সেটি একটি অভিনয়ের জগত।
কঠিন সময়ের কথাও উঠে আসে তার সাক্ষাৎকারে। মনিকা বলেন, কখনও কখনও কাজ তাকে বাস্তব জীবনের কঠিন সময় সামলাতেও সাহায্য করেছে। কিন্তু বাড়িতে ফিরলে তিনি আবার খুব সাধারণ একজন মানুষ—চুল বেঁধে নেন, ঘরের চপ্পল পরেন এবং হয়তো এক প্লেট পাস্তা রান্না করেন।

বয়সের সঙ্গে এসেছে আরও স্বাধীনতা
৬০ বছর বয়সকে মনিকা দেখছেন আরও বেশি স্বাধীনতার সময় হিসেবে। তার মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যের বিচার নিয়ে ভাবনা কমে যায়।
তিনি বলেন, এখন তিনি নিজের শরীর ও অভিনয়কে আরও মুক্তভাবে দেখতে পারেন। একজন অভিনেতার কাছে শরীর এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্দর কাজের উপকরণ।
মনিকার এই স্বাধীনতার শুরু অবশ্য অনেক আগে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে, ইতালির চিত্তা দি কাস্তেল্লোর প্লিনিও ইল জোভানে উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি মডেলিং শুরু করেন। একই সময়ে সাদা-কালো সিনেমার প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।
তিনি বিশেষভাবে মুগ্ধ ছিলেন ইতালীয় অভিনেত্রী জুলিয়েত্তা মাসিনা, আন্না মানিয়ানি ও সোফিয়া লোরেনের অভিনয়ে। তাদের প্রত্যেকের অভিনয়ের ধরন ছিল আলাদা, কিন্তু সবার মধ্যেই ছিল শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব। এই অভিনেত্রীরা তাকে স্বপ্ন দেখতে এবং নিজের পথ তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

সামনে কী চান মনিকা?
৬০ বছরে পৌঁছে ভবিষ্যৎ নিয়ে মনিকার প্রত্যাশা খুব সরল। তিনি নতুন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে চান—হতে পারে কোনো বৃদ্ধ জাদুকরীর চরিত্র, কিংবা ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ের একজন অপেরা গায়িকার চরিত্র।
তার ভাষায়, “আমি সবকিছুর জন্য প্রস্তুত।”
আগামী ১০ বছর সম্পর্কে তার সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো নিজের মতো থাকা এবং তার দুই মেয়ের পাশে থাকা। মেয়েরা এখন আর ছোট নেই, তবু মায়ের কাছে তারা এখনও তার সন্তান—যাদের পাশে থাকা এবং সুরক্ষা দেওয়া তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মনিকার ভাষায়, “আমি তাদের জন্য সেখানে থাকতে চাই। এটাই আমার স্বপ্ন।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









