বর্ষা এলেই শরীয়তপুরের বুড়িরহাটে বদলে যায় চিরচেনা দৃশ্য। ভোরের আলো ফোটার আগেই বিদ্যালয়ের মাঠে সারি সারি কাঠের নৌকা এসে ভিড় করে। ক্রেতারা ঘুরে ঘুরে নৌকার আকার, কাঠ ও দাম যাচাই করেন। কেউ পুরোনো নৌকা বিক্রি করে নতুনটি কিনে নেন, আবার কেউ বর্ষার চলাচল ও কৃষিকাজের জন্য পছন্দের নৌকা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে এভাবেই টিকে আছে শরীয়তপুর সদর উপজেলার বুড়িরহাটের ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার শেষ প্রান্তে ভেদরগঞ্জ ও ডামুড্যা উপজেলার সীমানার কাছাকাছি বুড়িরহাট বাজার। শরীয়তপুর–চাঁদপুর–চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশের এ বাজারে বর্ষা মৌসুমে প্রতি মঙ্গলবার বসে নৌকার বিশেষ হাট। ভোর পাঁচটা থেকে শুরু হয়ে বেচাকেনা চলে প্রায় বেলা দুইটা পর্যন্ত। প্রতি হাটে বিভিন্ন আকৃতির ৪০ থেকে ৫০টি কাঠের নৌকা বিক্রি হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিশ শতকের শুরুর দিকে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাবেচার জন্য বুড়িরহাটে বাজার গড়ে ওঠে। পরে প্রতি মঙ্গলবার সাপ্তাহিক হাট বসার প্রচলন শুরু হয়। একপর্যায়ে বর্ষা মৌসুমে স্থানীয় কাঠমিস্ত্রিরা নিজেদের তৈরি কাঠের নৌকা এনে এই হাটে বিক্রি শুরু করেন। পাশাপাশি পুরোনো নৌকাও কেনাবেচা হতে থাকে। সময়ের সঙ্গে নৌকার বেচাকেনা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে বুড়িরহাট পরিচিতি পায় ‘নৌকার হাট’ হিসেবে।
বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সম্ভুনাথ পোদ্দার জানান, ১৯৪৬ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয়ের মাঠে নৌকার হাট বসছে। তবে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্তত ৪০ বছর আগে থেকেই এখানে নৌকার হাটের প্রচলন ছিল। নৌকার ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে বিদ্যালয় কোনো খাজনা আদায় করে না।
প্রতিবছর মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নৌকা বিক্রির মৌসুম চলে। নতুন নৌকার দাম পড়ে ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। আর পুরোনো নৌকা বিক্রি হয় ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকায়। নৌকার আকার, কাঠের মান ও বয়সের ওপর নির্ভর করে দাম কমবেশি হয়।
বুড়িরহাটের এই নৌকার জোগান আসে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। সদর উপজেলার পাটানিগাঁও, চন্দনকর ও রুদ্রকর; ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও, সাজানপুর ও পাপরাইল এবং ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর ও ধানকাঠি এলাকার কাঠমিস্ত্রিরা নৌকা তৈরি করে হাটে নিয়ে আসেন।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল কাদের হাওলাদার বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এই হাটে আসতাম। তখন চারদিকে এত রাস্তা-ঘাট ছিল না, বর্ষায় মানুষের চলাচলের প্রধান ভরসাই ছিল নৌকা। সেই সময়ের নৌকার হাট এখনো চোখের সামনে দেখতে পাই—এটা আমাদের কাছে শুধু বাজার নয়, আমাদের শৈশব আর গ্রামের জীবনের একটা অংশ। এখন বয়স হয়েছে, তবু বর্ষা এলে হাটে এসে নৌকার সারি দেখলে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে যায়। এই ঐতিহ্যটা যেন হারিয়ে না যায়।’
স্থানীয় কাঠমিস্ত্রিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন মিস্ত্রি সপ্তাহে ছোট আকারের দুটি নৌকা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি নৌকা বিক্রি করে তাঁদের লাভ থাকে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার টাকা। বর্ষা মৌসুমে কাঠমিস্ত্রির অন্যান্য কাজ কমে যাওয়ায় অনেকে বাড়িতে বসেই নৌকা তৈরি করেন। তবে আগের তুলনায় লাভ কমে যাওয়ায় অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন।
সদর উপজেলার ৭০ বছর বয়সী অনিল মণ্ডল ১৫ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে কাঠমিস্ত্রির কাজ শেখেন। বাবার কাছ থেকেই শেখেন নৌকা তৈরির কারিগরি। ৫৫ বছর ধরে তিনি বুড়িরহাটে নৌকা বিক্রি করছেন। মঙ্গলবারের হাটে বিক্রির জন্য তিনি নিয়ে এসেছেন দুটি নৌকা।
অনিল মণ্ডল বলেন, ‘আমার বাবা ও দাদারাও এই হাটে নৌকা বিক্রি করতেন। সেই আয়েই তাঁদের সংসার চলত। তাঁদের পথ ধরেই আমিও এই কাজ করছি। এপ্রিল থেকে নৌকা তৈরি শুরু করি, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ চলে। গোয়ারা ও উড়িয়া জাতের আমগাছের কাঠ দিয়ে নৌকা বানাই। বছরের অন্য সময়ে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাই।’
নৌকার চাহিদার কারণও এ অঞ্চলের জলাভূমি ও নদীনির্ভর জীবন। ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর এলাকার ৮০ বছর বয়সী কৃষক আয়ুব আলী পুরোনো নৌকা বিক্রি করে নতুন নৌকা কিনতে এসেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, চারদিকে নদী ও বর্ষায় কৃষিজমি পানিতে ডুবে যায়। তখন নৌকা ছাড়া মানুষের চলাচল যেমন কঠিন, তেমনি কৃষিকাজও ব্যাহত হয়।
রহিম মিয়া বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে এই হাটে নৌকা কিনতে আসতাম। এখনো নৌকা কিনতে আসি। একটি নতুন নৌকা সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় বছর ব্যবহার করা যায়। পুরোনো নৌকা মেরামত করেও অনেক দিন চালানো যায়।’
বর্তমানে বুড়িরহাট বাজারে দুই শতাধিক স্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাজার ঘিরে রয়েছে একটি উচ্চবিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পুলিশ ফাঁড়ি, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কলেজ, মসজিদ ও মন্দির। তবে বর্ষা এলেই এসব স্থাপনার ভিড়ে আলাদা আকর্ষণ হয়ে ওঠে কাঠের নৌকায় সাজানো বিদ্যালয়ের মাঠ।
শত বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই নৌকার হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এ অঞ্চলের নদী-নির্ভর জীবনযাত্রা ও গ্রামীণ অর্থনীতিরও এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা বাড়লেও বর্ষায় বুড়িরহাটের নৌকার হাটে মানুষের ভিড় প্রমাণ করে জলমগ্ন জনপদের জীবনে কাঠের নৌকার প্রয়োজন এখনো ফুরিয়ে যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









