বক্ষ্যমাণ দিগন্তে যেখানে রোদের ঝিকিমিকিতে দোলে শস্যের শ্যামলিম প্রাচুর্য, ঠিক সেখানেই এখন চেপে বসেছে এক অমোঘ আতঙ্কের গূঢ় ঘনঘটা। ময়মনসিংহের বিস্তৃত কৃষিপ্রান্তরে প্রস্তাবিত ইকোপার্ক নির্মাণের মহাযজ্ঞ ঘিরে স্থানীয় ভুঁইফোড় উন্নয়ন ভাবনায় ঘোর প্রমাদ গুনছেন প্রান্তিক কৃষিজীবী সমাজ।
যে মৃত্তিকা বহুকাল ধরে জঠরজ্বালা নিবারণের একমাত্র অবলম্বন, সেই ভিটামাটি উচ্ছেদ আর আবাদি জমি হস্তান্তরের গুমোট আশঙ্কায় এখন দিশেহারা সহস্রাধিক চাষি পরিবার। ফুলবাড়িয়া সন্তোষপুর এলাকায় ৫৬৫ একর জমি নিয়ে এই ইকোপার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যার প্রায় ৫১৫ একর জমিই স্থানীয় কৃষকদের দখলে। সেখানে কৃষকরা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা, কলা গাছ, হলুদ, আনারস, আদা এবং বিভিন্ন ফলদ ও ঔষধি গাছ রোপণ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের অনেকেই সরকারের শেয়ার হিসেবে কাজ করেন। এর আগেও আকাশমনি গাছ কাটার সময় সরকার কৃষকদের ৪০ শতাংশ টাকা দিয়েছিল বলে জানান তারা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট কৃষি-বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আনোয়ার হোসেনের মতে, ‘‘উন্নয়নের নামে উর্বর কৃষিজমি অকৃষি খাতে রূপান্তর করা মারাত্মক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ময়মনসিংহের এই নির্দিষ্ট ভূখণ্ডটি এক প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য এবং ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণের প্রধান ক্ষেত্র। কৃত্রিম ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র বানাতে গিয়ে যদি হাজার হাজার বৃক্ষনিধন করা হয় এবং প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা জলাশয় ভরাট করা হয়, তবে তা স্থানীয় প্রতিবেশকে চরম ভারসাম্যহীনতার মুখে ঠেলে দেবে। কংক্রিটের গাঁথুনি মেরে কৃত্রিম বনায়ন কোনোদিন প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বাস্তুতন্ত্রের বিকল্প হতে পারে না। উপরন্তু, বাণিজ্যিক বিনোদন কেন্দ্র স্থাপন করলে পর্যটকদের বর্জ্য ও যান্ত্রিক দূষণে পার্শ্ববর্তী কৃষিভূমির স্বাভাবিক ক্ষয়পূরণ ক্ষমতা বিনষ্ট হয়ে যাবে।’’
ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী মুহাম্মদ নূরুল করিম বলেন, ‘‘কৃষক বা স্থানীয় অধিবাসীদের আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ইকোপার্ক প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো এলাকার বিলুপ্তপ্রায় প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা এবং ইকোট্যুরিজমের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করা। প্রকল্পের প্রাথমিক রূপরেখা তৈরির কাজ চলছে। কোনো উর্বর কৃষিভূমি বা কৃষকের বসতবাড়ি উচ্ছেদ করে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে না।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









