যে নারী মাংস খেতে অস্বীকার করেছিলেন
কখনো কখনো একটি মানুষের জীবনে খুব ছোট একটি ঘটনা ঘটে, অথচ সেই ঘটনার অর্থ খুঁজতে গিয়ে আমরা তার পুরো জীবন, তার পরিবার, তার শহর, এমনকি আমাদের নিজেদের জীবনকেও নতুন করে দেখতে শুরু করি।
ইয়ং-হে-র ঘটনাটিও তেমন।
একদিন ভোরে তার স্বামী ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, তার স্ত্রী রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘরের ভেতর তখনও রাতের অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি। শুধু ফ্রিজের দরজা খোলা, তার সাদা আলো ইয়ং-হে-র মুখে পড়েছে। তিনি যেন কোনো স্বপ্নের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। স্বামী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে। ইয়ং-হে বললেন,‘আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি।’
এই একটি বাক্য থেকেই শুরু হয় হান কাংয়ের ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’।
কিন্তু উপন্যাসটি আসলে মাংস খাওয়া বা না-খাওয়ার গল্প নয়। বরং বলা যায়, মাংস না খাওয়ার সিদ্ধান্তটি এমন একটি দরজা, যেটি খুলে গেলে আমরা দেখতে পাই মানুষের শরীর, পরিবার, ভালোবাসা, পুরুষতন্ত্র, সহিংসতা এবং স্বাধীনতার এক অন্ধকার ঘর।
ঘরটি খুব পরিচিত। এই কারণেই সেটি এত ভয়ংকর।

ইয়ং-হে-র স্বামী নিজেকে খুব সাধারণ একজন মানুষ বলে মনে করেন। তিনি ঝুঁকি পছন্দ করেন না। তার জীবন যেন আগে থেকেই মেপে রাখা—সাধারণ শিক্ষা, সাধারণ চাকরি, সাধারণ সংসার। এমনকি স্ত্রী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তার যুক্তি ছিল খুব সহজ। তিনি এমন একজন নারী চেয়েছিলেন, যিনি তার জীবনকে জটিল করবেন না।
ইয়ং-হে ঠিক তেমনই ছিলেন। অন্তত তিনি তাই ভেবেছিলেন। তারপর একদিন ইয়ং-হে মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিলেন স্বামীর কাছে ব্যাপারটি প্রথমে বিরক্তিকর মনে হলো। তারপর অস্বাভাবিক। এরপর লজ্জার। কিন্তু ইয়ং-হে কেন মাংস খাচ্ছেন না, সেটি জানার চেষ্টা তিনি খুব একটা করলেন না।
গল্পে হান কাং আমাদের একটি অদ্ভুত আয়না দেখান। আমরা কি সত্যিই আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষদের চিনি? নাকি আমরা শুধু তাদের কাছ থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় আচরণটুকুই আশা করি? একজন স্ত্রীকে কি আমরা একজন মানুষ হিসেবে দেখি, নাকি একজন স্ত্রী হিসেবে? ইয়ং-হে চুপ করে থাকেন। তাঁর স্বামীও তাঁকে বোঝার চেষ্টা করেন না।
এই নীরবতার মধ্যেই প্রথম সহিংসতা জন্ম নেয়। কেউ কাউকে আঘাত করেনি। কোনো দরজা ভাঙেনি। কোনো রক্তপাত হয়নি। তবু সহিংসতা আছে। কারণ একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে তার নিজের মতো থাকার অধিকার দিতে রাজি নয়।
ইয়ং-হে-র মাংস না খাওয়ার পেছনে রয়েছে এক ভয়ংকর স্বপ্ন। রক্ত। মাংস। মৃতদেহ। হিংস্রতা। কিন্তু স্বপ্নটি কোথা থেকে এসেছে, তা আমরা কখনো পুরোপুরি জানতে পারি না। হান কাং এই জায়গায় খুব সতর্ক। তিনি আমাদের হাতে কোনো চাবি তুলে দেন না।
আমরা ভাবি, ইয়ং-হে-র অতীতের কোনো ঘটনা হয়তো এর উত্তর দেবে। তার বাবা? তার শৈশব? তার সংসার? তার স্বামী? তার শরীরের ভেতরে জমে থাকা কোনো পুরোনো ভয়? কিন্তু প্রতিবার আমরা যখন একটি উত্তর পাওয়ার কাছাকাছি যাই, গল্পটি একটু অন্য দিকে মোড় নেয়। তখন মনে হয়, হয়তো উত্তর খোঁজাটাই ভুল।
হয়তো ইয়ং-হে-কে বোঝার জন্য আমাদের তার ‘কেন’-এর উত্তর জানতে হবে না। হয়তো একজন মানুষকে বোঝার সবচেয়ে বড় ভুল হলো ধরে নেওয়া যে তার প্রতিটি আচরণের একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকতেই হবে।
ইয়ং-হে ধীরে ধীরে নিজের শরীরের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান। কিন্তু তার চারপাশের সবাই তার শরীর নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। বাবা চান তিনি পরিবারের নিয়ম মানুন। স্বামী চান তিনি একজন ‘স্বাভাবিক’ স্ত্রী হন। দুলাভাই তার শরীরকে নিজের কল্পনার বস্তুতে পরিণত করেন। চিকিৎসকেরা তাকে অসুস্থ শরীর হিসেবে দেখেন।সমাজ তাকে অস্বাভাবিক বলে চিহ্নিত করে। সবাই যেন জানে, ইয়ং-হে-র কী হওয়া উচিত।
শুধু ইয়ং-হে নিজে জানেন না—অথবা জানলেও কাউকে বলতে চান না।
‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’র সবচেয়ে গভীর প্রশ্নটি এখানেই জন্ম নেয়— একজন মানুষের শরীরের মালিক কে?
সমাজ? পরিবার? স্বামী? চিকিৎসাব্যবস্থা? নাকি সেই মানুষটি নিজেই? এই প্রশ্নটি ইয়ং-হে-র মাংস না খাওয়ার সিদ্ধান্তের চেয়ে অনেক বড়। কারণ আমরা যখন বলি, ‘সে স্বাভাবিক নয়’, তখন আসলে আমরা কী বোঝাই? সে কি সত্যিই অসুস্থ? নাকি সে শুধু আমাদের তৈরি স্বাভাবিকতার নিয়ম মানতে অস্বীকার করেছে?
উপন্যাসের দ্বিতীয় অংশে ইয়ং-হে যেন পৃথিবী থেকে আরও দূরে সরে যেতে থাকেন। মানুষের খাবার তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এবার যেন মানুষের জীবনকেও প্রত্যাখ্যান করতে চান। তিনি ফুলের প্রতি আকৃষ্ট হন। গাছের প্রতি আকৃষ্ট হন। রোদে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার মনে হতে থাকে, তিনি হয়তো গাছ হয়ে যেতে পারেন। এটি শুনতে অদ্ভুত। কিন্তু হান কাংয়ের পৃথিবীতে অদ্ভুত জিনিসগুলোই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
আমরা তখন ভাবতে শুরু করি—গাছ হতে চাওয়া কি সত্যিই এত অস্বাভাবিক? গাছ কাউকে হত্যা করে না। গাছ কাউকে নিজের মতো হতে বাধ্য করে না। গাছ অন্যের শরীরের ওপর অধিকার দাবি করে না। গাছ শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। আলো গ্রহণ করে। বৃষ্টি গ্রহণ করে। মাটির ভেতর শিকড় ছড়ায়। হয়তো ইয়ং-হে মানুষের পৃথিবীর বদলে এমন একটি পৃথিবী চাইছেন, যেখানে কাউকে কাউকে কিছু প্রমাণ করতে হবে না।
যেখানে শরীরের ওপর কারও অধিকার নেই। যেখানে বেঁচে থাকা মানে অন্যকে আঘাত করা নয়। কিন্তু মানুষ তাকে সেই পৃথিবীতেও যেতে দেয় না।
এই অন্ধকার গল্পে ইন-হে, ইয়ং-হে-র বোন, একসময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠেন। তিনি তার বোনকে পুরোপুরি বোঝেন না। সম্ভবত কেউই বোঝে না। তবু তিনি তার পাশে থাকেন। হাসপাতালে যান। খাবার নিয়ে যান। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। বোনের শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ইয়ং-হে কোনো উত্তর দেন না। কখনো কখনো মনে হয়, তিনি পৃথিবী থেকে এত দূরে চলে গেছেন যে মানুষের ভাষাও আর তার কাছে পৌঁছায় না। তবু ইন-হে তার কাছে ফিরে আসেন।
কেন? এই প্রশ্নেরও কোনো সহজ উত্তর নেই। সম্ভবত এটাই ভালোবাসা। ভালোবাসার কোনো যুক্তি নেই। আমরা জানি না কেন একজন মানুষ আরেকজনের পাশে থেকে যায়, যখন ফিরে পাওয়ার মতো কিছুই নেই। হয়তো মানুষের সবচেয়ে সুন্দর আচরণের একটি হলো এমন একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, যাকে আমরা বুঝতে পারি না।
‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ পড়তে পড়তে একসময় মনে হয়, ইয়ং-হে-র অসুস্থতার চেয়ে বড় প্রশ্নটি আসলে আমাদের সমাজকে নিয়ে।
আমরা কাকে সুস্থ বলি? কাকে স্বাভাবিক বলি? একজন নারী যদি সংসার করতে না চান, তাকে কি অসুস্থ বলা হবে? তিনি যদি নিজের শরীর সম্পর্কে নিজের সিদ্ধান্ত নেন, তাঁকে কি অস্বাভাবিক বলা হবে? তিনি যদি সমাজের নিয়ম মেনে চলতে না চান, তাঁকে কি ঠিক করে দিতে হবে? আমরা কি মানুষকে ভালোবাসি, নাকি তার কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশিত আচরণকে ভালোবাসি?
এই প্রশ্নগুলো ইয়ং-হে-র নীরব মুখের মতো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। উপন্যাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় সম্ভবত এই যে, ইয়ং-হে-কে আমরা নিজেরাও পুরোপুরি বুঝতে পারি না। আমরাও তার আচরণের ব্যাখ্যা চাই। আমরাও চাই, শেষ পর্যন্ত কেউ এসে বলুক—এই হলো কারণ, এই হলো তার অসুখ, এই হলো সমাধান। কিন্তু হান কাং আমাদের সেই স্বস্তি দেন না। তিনি শুধু বলেন না—দেখুন। একজন মানুষকে দেখুন। তারপর নিজের দিকে তাকান।
‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ তাই নিরামিষভোজনের উপন্যাস নয়।
মাংস এখানে একটি প্রতীক। মাংস মানে শরীর। শরীর মানে আকাঙ্ক্ষা। আকাঙ্ক্ষা মানে ক্ষমতা। আর ক্ষমতা মানে অন্যের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ইতিহাস। ইয়ং-হে সেই ইতিহাস থেকে বেরিয়ে যেতে চান।
তিনি হয়তো ভুল পথে যান। হয়তো তার সিদ্ধান্ত তাকে আরও গভীর অন্ধকারে নিয়ে যায়। হয়তো তার মানসিক ভাঙনকে কোনো রোমান্টিক স্বাধীনতা বলে দেখাও ঠিক নয়। কিন্তু তার প্রশ্নটি থেকে যায়।
‘আমার শরীর কি আমার?’ এই প্রশ্নের উত্তর আমরা খুব সহজেই ‘হ্যাঁ’ বলতে পারি। কিন্তু উপন্যাসটি পড়ার পর সেই ‘হ্যাঁ’ আর এত সহজ থাকে না। কারণ পরিবার আমাদের শরীর নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। সমাজ আমাদের শরীরের জন্য নিয়ম বানায়।প্রেম আমাদের শরীরকে দাবি করে। রাষ্ট্র আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে। চিকিৎসা আমাদের শরীরকে সংজ্ঞায়িত করে।
আর আমরা, অনেক সময়, নিজের শরীরের দিকে তাকিয়েও বুঝতে পারি না—এ শরীর সত্যিই কতটা আমার।
হান কাংয়ের গদ্য খুব বেশি কথা বলে না। তিনি চমকে দেওয়ার মতো ভাষা ব্যবহার করেন না। তার বাক্যগুলো অনেক সময় শান্ত, সরল, প্রায় ঠান্ডা। কিন্তু সেই শান্তির নিচে যেন বরফের নিচ দিয়ে পানি বয়ে যায়।
আমরা শুনতে পাই না। তবু বুঝতে পারি, সেখানে কিছু একটা চলছে। ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’-এর সৌন্দর্যও সেখানে। উপন্যাসটি আমাদের বলে না ইয়ং-হে কে।
আমাদের বলে না কেন তিনি এমন হলেন। আমাদের বলে না তিনি ঠিক না ভুল। বরং একজন নারীকে আমাদের সামনে রেখে প্রশ্ন করে—‘তুমি কি তাকে তার মতো থাকতে দেবে?’
আমরা উত্তর দিতে যাই। তারপর থেমে যাই। কারণ প্রশ্নটি শুধু ইয়ং-হে-কে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আমাদের প্রত্যেকের শরীর, আমাদের ভয়, আমাদের পরিবার, আমাদের ভালোবাসা এবং অন্যের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার অদৃশ্য অভ্যাস নিয়ে।
এই কারণে ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও শেষ হয় না। ইয়ং-হে হয়তো তখন আর কথা বলছেন না। কিন্তু তার নীরবতা আমাদের মধ্যে থেকে যায়। শীতের সকালে জানালার কাচে জমে থাকা কুয়াশার মতো। আমরা হাত দিয়ে সেটি মুছে ফেলতে পারি।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার কাচ ঝাপসা হয়ে আসে। আর সে আবছায়ার মধ্যে ওপারে আমরা দেখতে পাই সেই প্রশ্নটি—
‘একজন মানুষ শেষ পর্যন্ত কতটা নিজের হতে পারে?’

সাক্ষাৎকার
‘অন্ধকারেরও যে ছোট আলোটি জ্বলে, তাকে নিভতে দেওয়া যাবে না’
২০০৭ সালের আগে ইংরেজি ভাষার পাঠকদের কাছে হান কাং প্রায় অপরিচিত ছিলেন, যেন দূরের কোনো শহরের একটি জানালা, যার ভেতরে আলো জ্বলছে, কিন্তু বাইরে থেকে কেউ জানে না সেখানে কে বসে আছে এবং কী লিখছে। তারপর দ্য ভেজিটেরিয়ান প্রকাশিত হলো, আর সেই জানালাটি হঠাৎ খুলে গেল। একজন নারী মাংস খেতে অস্বীকার করছেন, পরিবার তাকে বুঝতে পারছে না, বরং তাকে বদলে দিতে চাইছে, আর সেই ছোট্ট পারিবারিক ঘটনাটির ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে দেখা গেল পুরুষতন্ত্রের নিষ্ঠুরতা, শরীরের ওপর মানুষের অধিকার এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার এক অসহায় সংগ্রাম।
তারপর হান কাংয়ের পৃথিবী আরও বড় হয়েছে।
গ্রিক লেসনস-এ এক নারী তার কণ্ঠ হারিয়েছেন, আর এক পুরুষ হারাচ্ছেন তার দৃষ্টিশক্তি। তারা একে অন্যের কাছে পৌঁছাতে চায়, অথচ তাদের মাঝখানে রয়েছে নীরবতা ও অন্ধকার। ‘দ্য হোয়াইট বুক’-এ তিনি শোকের দিকে তাকিয়েছেন। ‘হিউম্যান অ্যাক্টস’ এবং ‘উই ডু নট পার্ট’-এ তিনি ফিরে গেছেন ইতিহাসের এমন সব জায়গায়, যেখানে মৃতেরা মরে গেলেও তাদের স্মৃতি মরেনি, যেখানে একটি সমাজ কোনো কোনো নাম উচ্চারণ করতে এখনও ভয় পায়।
২০২৪ সালে যখন হান কাং সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন, তখন তার লেখার এই বিস্তৃত দৃষ্টিই হয়তো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। ব্যক্তিগত মানুষের শরীর থেকে তিনি পৌঁছেছেন একটি জাতির স্মৃতিতে, একটি জাতির স্মৃতি থেকে মানুষের দীর্ঘ ইতিহাসে।
তার প্রথম ইংরেজি নন-ফিকশন বই ‘লাইট অ্যান্ড থ্রেড’। নোবেল বক্তৃতার সঙ্গে এই বইয়ে রয়েছে কবিতা, প্রবন্ধ, ডায়েরির টুকরো। আছে লেখার ঘর, বাগান, আলো, অপেক্ষা এবং সেই অদৃশ্য জায়গা যেখানে একটি গল্প জন্ম নেওয়ার আগে অনেক দিন চুপ করে পড়ে থাকে।
এই বই এবং সাহিত্য, সহিংসতা, স্মৃতি ও আশার কথা নিয়ে হান কাংয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন নিক হিলডেন। কথপোকথনটি ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। দৈনিক এদিন এখানে হান কাংয়ের কথপোকথনটি বাংলাভাষী পাঠকের জন্য তুলে ধরল।
ভোগ
লাইট অ্যান্ড থ্রেড-এ আপনি বলেছেন, কবিতা এখনও লেখেন, কিন্তু উপন্যাস আপনাকে বিশেষভাবে টানে। কেন?
হান কাং
একটি উপন্যাস লেখার আগে এবং পরে আমি যেন একই মানুষ থাকি না।
আফটার পাবলিকেশন লিখতে গিয়ে প্রথমবার আমি খুব গভীরভাবে নিজের লেখার প্রক্রিয়ার দিকে তাকাতে পেরেছিলাম। একটি উপন্যাস লেখা শেষ করার পর আমি বুঝতে পারি, লেখার শুরুতে যে মানুষটি ছিলাম, শেষের মানুষটি সে নয়।
ভালো দিকটি হলো, শেষের মানুষটিকে আমার একটু ভালো মানুষ বলে মনে হয়। লেখার সময় আমার মনে হয়, আমি হাঁটছি। আমি জানি না কোথায় যাচ্ছি। অনেক সময় পথ হারিয়ে ফেলি। তবু লেখাটিকে শক্ত করে ধরে রাখি এবং হাঁটতে থাকি। তারপর কোনো কোনো মুহূর্তে হঠাৎ পথটি আবার দেখা যায়। সেই মুহূর্তে আনন্দ হয়।
আমার কাছে লেখা আসলে এই সবকিছুর যোগফল—হাঁটা, হারিয়ে যাওয়া, ভয় পাওয়া, আবার পথ খুঁজে পাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সামনে এগিয়ে যাওয়া।
ভোগ
লাইট অ্যান্ড থ্রেড-এর ‘স্মল টিকাপ’ অংশে দেখা যায়, সৃষ্টিশীল কাজের পেছনে ছোট ছোট দৈনন্দিন কাজও কত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার নিজের রুটিন কেমন?
হান কাং
সত্যি বলতে, এমন কঠোর রুটিন শুধু তখনই সম্ভব, যখন আমি একটি লেখা নিয়ে গভীরভাবে কাজ করছি। সেই সময়ে সুযোগ পেলেই আমি আমার টেবিলে ফিরে যাই। আবার ফিরে যাই। আবার বসি। কিন্তু যখন কোনো লেখা লিখছি না, তখন আমার জীবন অনেক অগোছালো হয়ে যায়। কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম থাকে না।
পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, জীবনের বেশির ভাগ সময়ই আমি আসলে সেই অনিয়মের মধ্যেই কাটিয়েছি।
ভোগ
বাগান করা আর লেখার মধ্যে কী কোনো সম্পর্ক আছে?
হান কাং
বইটি লেখার সময় আমার মনে হয়েছিল, পুরো বইটিকে যেন আলো দিয়ে ঘিরে রাখা যায়। তাই ডায়েরি থেকে বাগানের যত্ন নেওয়ার কিছু অংশ নিয়েছিলাম। আমার বাগান খুব ছোট। আবার সেটি উত্তরমুখী, তাই সেখানে যথেষ্ট সূর্যের আলো আসে না।
গাছগুলোর জন্য আমাকে আলোর উৎস সন্ধান করতে হয়। আমি মাটিতে আয়না রাখি। সূর্য যখন আকাশের এক দিক থেকে অন্য দিকে যায়, আমিও আয়নাগুলো সরিয়ে নিই। একটু আলো গাছগুলোর কাছে পৌঁছায়। আমি চেয়েছিলাম, এই ছবিটি ‘লাইট অ্যান্ড থ্রেড’-এর ভেতরের আলোর সঙ্গে মিশে থাকুক।
হয়তো লেখার ক্ষেত্রেও আমরা অনেক সময় এটাই করি। আলো আমাদের হাতে থাকে না। তবু আমরা তার জন্য আয়না সরাতে থাকি।

ভোগ
আপনার নোবেল বক্তৃতায় আপনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমরা কত গভীরভাবে সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারি?’ পৃথিবীতে এত সহিংসতার মধ্যে কি সত্যিই তাকে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব?
হান কাং
আমি সব সময় অবাক হই যে সবচেয়ে আশাহীন পরিস্থিতিতেও কিছু মানুষ সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন কখনো কখনো মনে হয়, সবকিছু শেষ। তারপর দেখি, কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। কেউ একজন না বলছে। কেউ একজন অন্য মানুষের জীবন রক্ষা করতে চাইছে। আমি মানুষের এই শক্তিকে মনে রাখতে চাই। কারণ হয়তো আমাদের কাছে এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কিছু নেই যে মানুষ পুরোপুরি অন্ধকারে হারিয়ে যায়নি।
ভোগ
সহিংসতার চক্র শেষ করতে পৃথিবীতে কী দেখতে চান?
হান কাং
আমার ‘উই ডু নট পার্ট’ উপন্যাসে কিছু মানুষ আছে, যারা মৃতদের বিদায় জানাতে চায় না। বিদায় দেওয়া অসম্ভব হয়ে গেলে তারা শোকের মধ্যেই থেকে যায়। তারা মৃতদের ভুলে যেতে চায় না। গভীর অন্ধকার রাতে তারা মোমবাতি জ্বালায়।
আমি এখনও সেই ছোট ছোট আলোতে বিশ্বাস রাখতে চাই। মানুষের ভেতরে যে আলো কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না, আমি সেটিকে শক্ত করে ধরে রাখতে চাই। হয়তো আলোটি খুব ছোট। হয়তো বাতাসে কাঁপছে। তবু সেটিকে ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
ভোগ
‘উই ডু নট পার্ট’ ১৯৪৮ সালের জেজু হত্যাযজ্ঞকে কেন্দ্র করে লেখা। সেই বইয়ের ভাবনা আপনার মধ্যে কীভাবে এসেছিল?
হান কাং
‘হিউম্যান অ্যাক্টস’ প্রকাশের পর আমি একটি স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমি দেখলাম, বরফে ঢাকা একটি মাঠের ওপর দিয়ে হাঁটছি। মাঠজুড়ে কালো গাছ। কিন্তু গাছগুলোর মাথা কেটে দেওয়া হয়েছে। তারপর বুঝতে পারলাম, সেগুলো আসলে গাছ নয়—কবরের চিহ্ন।
সেখানে হাজার হাজার কবর। তারপর মাঠের অন্য দিক থেকে সমুদ্র এগিয়ে এল। পানি ধীরে ধীরে মাঠে ঢুকল। আমার গোড়ালি পর্যন্ত পানি উঠে গেল। আমি ভাবছিলাম, কবরের ভেতরের হাড়গুলো কীভাবে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাব।
আমি জানতাম না কী করব। তাই পানির মধ্য দিয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম। তারপর ঘুম ভেঙে গেল। সেই স্বপ্নের কথাই ‘উই ডু নট পার্ট’-এর প্রথম দুই পৃষ্ঠা।
এর পরের গল্পটি কী হবে, আমি জানতাম না। আমি শুধু সেই দুই পৃষ্ঠার পর কী আসতে পারে, তা খুঁজতে খুঁজতে লিখতে শুরু করেছিলাম।
ভোগ
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অতীতের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা থেকে আমাদের কী শেখা উচিত?
হান কাং
ঘৃণা, কাউকে বাদ দেওয়া এবং কাউকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা—এসব আলাদা বিষয় নয়। এগুলো একে অন্যের সঙ্গে খুব গভীরভাবে যুক্ত। মানুষের ইতিহাসে এগুলো বারবার ফিরে এসেছে। এক জায়গায় শেষ হয়েছে, অন্য জায়গায় আবার শুরু হয়েছে। তাই আমাদের এসব ঘটনার দিকে ফিরে তাকাতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে। বিরোধিতা করতে হবে। কারণ এগুলো আবার ঘটতে পারে। ইতিহাস নিজে থেকে আমাদের রক্ষা করবে না। আমাদেরই তাকে মনে রাখতে হবে।
ভোগ
‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ এত পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছিল কেন বলে আপনার মনে হয়?
হান কাং
বইটিতে সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা আছে। আছে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার হতাশা। আছে নারীদের নীরব আর্তনাদ।কিন্তু এগুলো শুধু ইয়ং-হে-র গল্প নয়। আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, তার মধ্যেও এগুলো আছে। হয়তো পাঠকেরা নিজেদের কোনো অংশ সেখানে দেখতে পেয়েছেন।

ভোগ
২০১৯ সালে আপনি বলেছিলেন, হিউম্যান অ্যাক্টস আপনার সবচেয়ে প্রিয় বই। এখনও কি তাই মনে হয়?
হান কাং
‘হিউম্যান অ্যাক্টস’ লিখতে আমার প্রায় দেড় বছর লেগেছিল। সময়টা খুব দীর্ঘ নয়। কিন্তু সেই সময়ের ভেতর অনেক কিছু ঘটেছিল। লেখাটি আমাকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছিল। ‘হিউম্যান অ্যাক্টস’ এবং ‘উই ডু নট পার্ট’ একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। দুটি বই লেখার পুরো প্রক্রিয়াটি প্রায় নয় বছর ধরে চলেছে। সময়টি ছিল খুবই সংঘাতময়।
তবে আমার অন্য বইগুলোও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোন বইটিকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, সেটি বলা কঠিন হয়তো একজন মা যেমন তার সন্তানদের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে পারেন না, লেখকের কাছেও নিজের বইগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা তেমন।
ভোগ
এত কঠিন সময়ে একজন ঔপন্যাসিকের ভূমিকা কী? শিল্প ও সাহিত্যের মূল্য কোথায়?
হান কাং
সাহিত্য কল্পনা করে। কিন্তু শুধু কল্পনা করে না। খুব জীবন্তভাবে কল্পনা করে। আমার মনে হয়, এই জীবন্ত কল্পনাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ খুব গভীরভাবে অনুভব করা কষ্টের। কিছুই অনুভব না করার চেয়ে অনুভব করা অনেক বেশি যন্ত্রণার। তবু আমাদের সেই যন্ত্রণাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া যাবে না। তাকে কাছে রাখতে হবে। অনুভব করতে হবে। কল্পনা করতে হবে। সাহিত্য এবং শিল্প প্রতি মুহূর্তে এই কাজটি করে।
কেউ একটি বই পড়ে, কেউ একটি ছবি দেখে, কেউ একটি গান শোনে—তারপর তার ভেতরে পৃথিবীকে অনুভব করার ক্ষমতাটি একটু বদলে যায়। সে হয়তো অন্য একজন মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্টের মতো অনুভব করতে শুরু করে। আর তখন সে জীবনের পাশে দাঁড়ায়।
এই কারণেই সাহিত্য কোনো অতিরিক্ত জিনিস নয়। কোনো বিলাসিতা নয়। এটি প্রয়োজনীয়।
ভোগ
ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার সবচেয়ে বড় আশা এবং ভয় কী?
হান কাং
আমরা যতক্ষণ বেঁচে আছি, ততক্ষণ আমাদের আশা প্রয়োজন। কিন্তু আমি কোনো বড়, অস্পষ্ট আশাবাদে বিশ্বাস করি না।আমি এমন আশার কথা বলছি, যা হয়তো খুব ছোট। হয়তো খুব দুর্বল। হয়তো সামান্য বাতাসেই নিভে যেতে পারে। তবু সেটি সত্যি।
আমাদের সেই আশাকে যত্ন করতে হবে। নিভতে দেওয়া যাবে না। কারণ অন্ধকারের মধ্যে বড় আলো সব সময় পাওয়া যায় না। কখনো শুধু একটি ছোট আলো থাকে। একটি মোমবাতি। একটি জানালা। একটি মানুষের হাতে ধরা ক্ষীণ আলো।হয়তো সেটুকুই যথেষ্ট নয় পৃথিবীকে আলোকিত করার জন্য। কিন্তু সামনে এক পা এগোনোর জন্য কখনো কখনো সেটুকুই যথেষ্ট। আর যতক্ষণ আমরা সেই আলোটি ধরে এগিয়ে যেতে থাকবো, ততক্ষণ আমরা পুরোপুরি হতাশার কাছে হেরে যাবো না।
পরিচিতি
২০২৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান দক্ষিণ কোরিয়ার লেখক হান কাং। তিনি জন্মগ্রহণ করেন দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়াংজু শহরে। ১৯৯৪ সালে সিউল শিনমুন আয়োজিত স্প্রিং লিটারারি কনটেস্টে পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু হয়।
ইংরেজিতে অনূদিত তাঁর প্রথম উপন্যাস দ্য ভেজিটেরিয়ান তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। ২০১৬ সালে বইটি ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ লাভ করে। তাঁর পরের গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হিউম্যান অ্যাক্টস কোরিয়ার মানহে সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১৭ সালের ইতালির মালাপার্তে পুরস্কার পায়। দ্য হোয়াইট বুক ২০১৮ সালের ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল।
হান কাং ই স্যাং সাহিত্য পুরস্কার, টুডেজ ইয়াং আর্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড, কোরিয়ান নভেল অ্যাওয়ার্ড, হোয়াং সুন-ওন সাহিত্য পুরস্কার ও দংরি সাহিত্য পুরস্কারসহ আরও নানা সম্মান পেয়েছেন। তাঁর গ্রিক লেসনস বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হয়েছে। ইমপসিবল গুডবাইজ ২০২১ সালে কোরিয়ায় প্রকাশিত হয়ে দায়েসান ফাউন্ডেশন পুরস্কার ও ২০২৩ সালের প্রি মেদিসি এত্রঁজে লাভ করে।
২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি সিউল ইনস্টিটিউট অব দ্য আর্টসে ক্রিয়েটিভ রাইটিং পড়িয়েছেন। এখন তিনি পুরোপুরি লেখালেখিতে নিয়োজিত। তাঁর বই পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সিউলে বসবাস করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









