পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ (পিসিএনপি)। একই সঙ্গে সংগঠনটি জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টকে (কেএনএফ) রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুরে রাঙামাটি শহরের কাঁঠালতলীর মৃধা ভবনে পিসিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নীতি নির্ধারণ ও জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকার গঠিত তিনটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটিকে স্বাগত জানানো হয়। পিসিএনপি নেতারা বলেন, পাহাড়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পাহাড়ি-বাঙালির পারস্পরিক সম্প্রীতি জোরদারে এসব কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পিসিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মজিবর রহমান। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন পিসিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও রাঙামাটি জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য হাবীব আজম।
লিখিত বক্তব্যে পিসিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি, চাঁদাবাজি ও সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাদের দাবি, চুক্তির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তব পরিস্থিতিতে তার অনেকটাই পূরণ হয়নি। এ কারণে বর্তমান বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় পার্বত্য চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
পিসিএনপির নেতারা অভিযোগ করেন, পাহাড়ে সশস্ত্র তৎপরতা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন ধরনের সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারা জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জেএসএসের সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যেরও প্রতিবাদ জানানো হয়। পিসিএনপি নেতাদের দাবি, অস্ত্র ও সশস্ত্র তৎপরতা নিয়ে অভিযোগ থাকা অবস্থায় শান্তিচুক্তির বিষয়টি সামনে রেখে জেএসএসের বিভিন্ন বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়নি।
সম্প্রতি শিশির চাকমার দেওয়া একটি সংবাদ সম্মেলনেরও সমালোচনা করেন পিসিএনপি নেতারা। তারা বলেন, শিশির চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বসাধারণের প্রতিনিধি নন। তাঁর বক্তব্যকে পিসিএনপি পাহাড়ের সাধারণ মানুষের মতামত হিসেবে বিবেচনা করে না বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলালকে স্বপদে বহাল রাখার দাবিও জানায় পিসিএনপি। সংগঠনটির নেতারা বলেন, পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের স্বার্থে তাঁর কার্যক্রম অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে পাহাড়ে সংঘটিত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে ‘লিগ্যাল টাস্কফোর্স’ গঠনের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে ন্যস্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম পুনরায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া বিদ্যমান ১ শতাংশ উপজাতীয় কোটার পরিবর্তে পিছিয়ে পড়া সব জনগোষ্ঠীর জন্য ‘অনগ্রসর কোটা’ চালু করার দাবি জানানো হয়। পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদে জনসংখ্যার অনুপাতে সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথাও তুলে ধরা হয়।
বিদেশি এনজিওগুলোর কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তদারকির দাবিও জানায় সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে পিসিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মজিবর রহমান ছাড়াও রাঙামাটি জেলা সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক, সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম, সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ইব্রাহিম, মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মোরশেদা আক্তার, যুব পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুর হোসেন, পিসিসিপি রাঙামাটি জেলা সভাপতি তাজুল ইসলাম তাজ, সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনসহ পিসিএনপি, পিসিসিপি, পিসিজেপি ও পিসিএমপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে পিসিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সরকার গঠিত তিনটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটির যেকোনো গঠনমূলক উদ্যোগে সংগঠনটি সহযোগিতা করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









