প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। প্রাণঘাতী অথচ প্রতিরোধযোগ্য এই রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাণীর টিকাদান জোরদার করা এবং আক্রান্ত বা ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করাই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Stronger Together’। এর মূল বার্তা হলো- জলাতঙ্ক প্রতিরোধ ও নির্মূলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, চিকিৎসাব্যবস্থা, প্রাণিসম্পদ খাত ও প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
জলাতঙ্ক শুধু একটি রোগের নাম নয়; এটি মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং সামাজিক সচেতনতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই এর প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্বশীল প্রাণী পালন এবং মানুষের আচরণগত সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস ২০২৬ : গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী- প্রতি বছর প্রায় ৪৪,২০৩ জন মানুষ জলাতঙ্কে মারা যান- এটি ২০২১ সালের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য-অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি হিসাব। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। কারণ, অনেক দেশে জলাতঙ্কের মৃত্যু যথাযথভাবে শনাক্ত বা নথিভুক্ত হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অন্য একটি বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, জলাতঙ্কে বছরে প্রায় ৫৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে; এর প্রায় ৯৫ শতাংশই এশিয়া ও আফ্রিকায় ঘটে। মানুষের জলাতঙ্ক সংক্রমণের ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কুকুরের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আক্রান্তদের প্রায় ৪০ শতাংশই ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু।
জলাতঙ্ক ১৫০টিরও বেশি দেশে বিদ্যমান এবং প্রধানত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব বেশি। প্রতিবছর বিশ্বে ২ কোটি ৯০ লাখের বেশি মানুষ জলাতঙ্কের মানব টিকা গ্রহণ করেন। জলাতঙ্কের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে আনুমানিক ৮৬০ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়। কুকুরের টেকসই টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ৭০ শতাংশ কভারেজ বজায় রাখা গেলে কুকুরবাহিত জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পাওয়া যায়। ২০২৬ সালে ভুটান কুকুরবাহিত মানব জলাতঙ্ককে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশটিতে জুন ২০২৩ থেকে কুকুরবাহিত জলাতঙ্কে কোনো মানবমৃত্যু হয়নি। ভুটান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রথম দেশ এবং বিশ্বে তৃতীয় দেশ হিসেবে এই স্বীকৃতি পেয়েছে।
জলাতঙ্ক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
জলাতঙ্ক একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর লালা কামড়, আঁচড় বা ক্ষতস্থানের সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। কুকুর মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রধান উৎস।
রোগটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- উপসর্গ প্রকাশের পর এটি অত্যন্ত মারাত্মক হয়ে ওঠে। তাই উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে সম্ভাব্য সংক্রমণের পরপরই প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হতে পারে জীবন রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কামড় বা আঁচড়কে ছোট করে দেখা যাবে না
অনেকেই মনে করেন, প্রাণীর কামড় সামান্য হলে চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। এই ধারণা ঝুঁকিপূর্ণ। ক্ষত ছোট হলেও সংক্রমণের সম্ভাবনা বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কামড় বা আঁচড়ের পর প্রথম কাজ হলো ক্ষতস্থান দ্রুত সাবান ও প্রবাহিত পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করা। এরপর দেরি না করে চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে।
চিকিৎসক ঝুঁকি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নির্ধারণ করবেন। প্রাণীটি পোষা কিনা, টিকা দেওয়া হয়েছে কিনা কিংবা আগে কখনো এমন আচরণ করেছে কি না- এসব তথ্য চিকিৎসককে জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষতস্থানে ভুল কিছু প্রয়োগ নয়
প্রাণীর কামড়ের পর অনেক সময় মানুষ বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার পরিবর্তে বিভিন্ন ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করেন। ক্ষতস্থানে অজানা পদার্থ, রাসায়নিক দ্রব্য, গাছগাছড়ার উপাদান বা অন্য কোনো বস্তু লাগানো উচিত নয়। এতে ক্ষত আরো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং চিকিৎসা গ্রহণে দেরি হতে পারে।
কুসংস্কার ও ভুল চিকিৎসা জলাতঙ্ক প্রতিরোধের অন্যতম বড় বাধা। তাই পরিবার ও সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে চিকিৎসক, শিক্ষক, গণমাধ্যম ও স্থানীয় নেতৃত্বকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিশুদের নিরাপত্তায় বাড়তি নজর
শিশুরা প্রাণীর প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়। অনেক শিশু না বুঝেই কুকুর, বিড়াল বা অন্য প্রাণীকে আদর করতে কিংবা খেলতে যায়। এ কারণেই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রাণীর সঙ্গে নিরাপদ আচরণের শিক্ষা দেওয়া জরুরি। শিশুকে শেখাতে হবে- অপরিচিত প্রাণীর কাছে যাওয়া যাবে না, প্রাণী খাওয়ার সময় বিরক্ত করা যাবে না, ঘুমন্ত প্রাণীকে ধরতে যাওয়া উচিত নয় এবং কোনো প্রাণী তাড়া করলে আতঙ্কিত হয়ে তাকে উত্তেজিত করার মতো আচরণ করা ঠিক নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো প্রাণী কামড়ালে বা আঁচড় দিলে শিশুকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবককে জানাতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
পোষা প্রাণী পালনে দায়িত্বশীলতা
পোষা প্রাণী রাখার মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি দায়িত্বও রয়েছে। কুকুর বা বিড়াল পালনের ক্ষেত্রে নিয়মিত টিকাদান, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। পোষা প্রাণীকে অবহেলায় ছেড়ে দেওয়া কিংবা টিকাদানের বিষয়টি গুরুত্ব না দেওয়া শুধু প্রাণীটির জন্য নয়, পরিবারের সদস্য ও আশপাশের মানুষের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রাণী পালনকে শখের পাশাপাশি দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে হবে।
চিকিৎসা সহজলভ্য করা জরুরি
জলাতঙ্ক প্রতিরোধে মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার সহজপ্রাপ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ অনেক সময় দূরের চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে গিয়ে সময় হারান। আবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কোথায় পাওয়া যাবে, সে সম্পর্কেও অনেকের স্পষ্ট ধারণা থাকে না। তাই উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রাণীর কামড়ের পর করণীয় বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা, দ্রুত পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা দরকার। স্বাস্থ্যকর্মীদেরও প্রাণীর কামড়ের ঘটনাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে হবে।
বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা
জলাতঙ্ক প্রতিরোধের শিক্ষা শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রাণীর সঙ্গে নিরাপদ আচরণ এবং কামড় বা আঁচড়ের পর করণীয় সম্পর্কে সহজ ভাষায় শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা এই তথ্য পরিবারেও পৌঁছে দিতে পারে। ফলে একটি ছোট সচেতনতামূলক উদ্যোগ পরিবার থেকে সমাজে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি করে।
পরিবার থেকেই শুরু হোক সচেতনতা
জলাতঙ্ক প্রতিরোধে বড় কোনো উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবারের ছোট ছোট অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যদের জানা থাকা উচিত- প্রাণীর কামড় বা আঁচড় দিলে বিষয়টি গোপন করা যাবে না, ক্ষত দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পোষা প্রাণীর টিকাদানের তথ্য সংরক্ষণ, শিশুদের প্রাণীর সঙ্গে নিরাপদ আচরণ শেখানো এবং অপরিচিত প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার অভ্যাস গড়ে তোলা পরিবার থেকেই শুরু করা সম্ভব।
আমাদের করণীয়
জলাতঙ্ক প্রতিরোধে আমাদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে-
* পোষা প্রাণীর নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা।
* অপরিচিত বা সন্দেহজনক প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা।
* শিশুদের প্রাণীর সঙ্গে নিরাপদ আচরণ শেখানো।
* প্রাণীর কামড় বা আঁচড়কে অবহেলা না করা।
* কামড়ের পর দ্রুত ক্ষতস্থান সাবান ও প্রবাহিত পানি দিয়ে পরিষ্কার করা।
* দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
* ক্ষতস্থানে অনিরাপদ বা অজানা পদার্থ ব্যবহার না করা।
* চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা সম্পন্ন করা।
* পথকুকুর ব্যবস্থাপনায় মানবিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা।
* স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা ও নজরদারি বাড়ানো।
* স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা।
* জলাতঙ্ক সম্পর্কে কুসংস্কার ও ভুল ধারণা দূর করা।
সম্মিলিত উদ্যোগেই সম্ভব প্রতিরোধ
জলাতঙ্ককে শুধু প্রাণীর রোগ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি মানুষের জীবন, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। রোগটি প্রতিরোধে চিকিৎসার পাশাপাশি সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, প্রাণীর টিকাদান, নিরাপদ আচরণ এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস ২০২৬-এর ‘Stronger Together’ প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়- একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব নয়। পরিবার সচেতন হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সচেতনতা বাড়াবে, প্রাণিসম্পদ বিভাগ প্রাণীর টিকাদান ও ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখবে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে এবং প্রশাসন সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় করবে- তবেই কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব।
জলাতঙ্ক প্রতিরোধে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন জ্ঞান ও দায়িত্বশীলতা। একটি প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের ঘটনাকে অবহেলা না করা, সময়মতো ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া- এই সহজ সচেতনতাই অনেক ক্ষেত্রে জীবন রক্ষার পথ তৈরি করতে পারে। তাই বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস ২০২৬ হোক শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং পরিবার থেকে সমাজ, চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে প্রশাসন এবং মানুষ থেকে প্রাণী- সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের নতুন অঙ্গীকার। সচেতনতা, দায়িত্বশীল প্রাণী পালন, সময়মতো চিকিৎসা এবং সমন্বিত জনস্বাস্থ্য উদ্যোগের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে জলাতঙ্কমুক্ত নিরাপদ সমাজ।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









