জীবনে আমি মূলত দুটি কাজ করেছি। প্রথমটি সফটওয়্যার তৈরি—মাইক্রোসফটে দীর্ঘ সময় কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে প্রযুক্তির শক্তি বুঝতে সাহায্য করেছে। দ্বিতীয়টি জনকল্যাণের কাজ। ২০০৮ সালের পর থেকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দারিদ্র্য ও বৈশ্বিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করাই আমার সময়ের বড় অংশ জুড়ে আছে।
এই দুই অভিজ্ঞতা থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে দেখছি। কম্পিউটারের সঙ্গে আমার পরিচয় যখন, তখন এর ক্ষমতা আজকের তুলনায় খুবই সীমিত ছিল। কিন্তু তখনই বোঝা গিয়েছিল, কম্পিউটার মানুষের কাজের ধরন বদলে দিতে পারে। এআই সেই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত এবং আরও গভীর করে তুলছে।
প্রশ্ন হলো, আমরা এর জন্য কতটা প্রস্তুত?
এআই মানুষের জীবনকে সহজ, স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনশীল করতে পারে। বিজ্ঞান, চিকিৎসা, কৃষি ও শিক্ষায় এটি এমন অগ্রগতি আনতে পারে, যা আগে কল্পনা করাও কঠিন ছিল। কিন্তু একই প্রযুক্তি বৈষম্য বাড়াতে পারে, বহু চাকরি বদলে দিতে পারে, ভুয়া তথ্য ছড়ানো সহজ করতে পারে এবং শিশুদের বিকাশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়। এটি সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তোলে। কাজের পৃথিবী বদলে যাবে এআইয়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত আসবে কর্মক্ষেত্রে। আগের প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলোও মানুষের কাজ বদলেছে। কিন্তু এআইয়ের বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু শারীরিক শ্রমের বিকল্প নয়। লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ, হিসাব, গবেষণা, কাস্টমার সার্ভিস, সফটওয়্যার তৈরি—এমন অনেক কাজেও এটি মানুষের জায়গা নিতে বা মানুষের কাজের ধরন পাল্টে দিতে পারে।
সব চাকরি যে হারিয়ে যাবে, তা বলা যায় না। বরং অনেক কাজের চরিত্র বদলাবে এবং নতুন কাজও তৈরি হবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের গতি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তরুণদের জন্য বিষয়টি বড়। কর্মজীবনের প্রথম দিকের চাকরি মানুষকে শুধু অর্থ দেয় না; অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দক্ষতাও তৈরি করে। এআই যদি সেই প্রাথমিক কাজগুলোর বড় অংশ করে ফেলে, তাহলে নতুন প্রজন্ম কীভাবে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে।
আর কাজ হারানোর বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়। চাকরি অনেক মানুষের কাছে মর্যাদা, পরিচয় ও নিজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করার একটি পথ। তাই এআইয়ের উৎপাদনশীলতার সুফল যদি সমাজের একাংশ পায়, কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, তাহলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নতুন সামাজিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে।

আরও শক্তিশালী হতে পারে অপব্যবহার
এআইয়ের দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি হলো এর অপব্যবহার। প্রতারণামূলক ফোনকল, ভুয়া ছবি, ভিডিও বা কণ্ঠস্বর তৈরি এখন আগের চেয়ে সহজ। ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্য মিথ্যা তৈরি করা আরও সহজ হতে পারে। এতে ব্যক্তিগত প্রতারণা থেকে শুরু করে জনপরিসরের তথ্যব্যবস্থা—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সাইবার হামলা, নজরদারি ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডেও এআই ব্যবহার করা সম্ভব। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র কিংবা জৈবিক ঝুঁকির ক্ষেত্রেও এর অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আরেকটি প্রশ্ন ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন। এআইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবস্থা যদি অল্প কয়েকটি কোম্পানি বা রাষ্ট্রের হাতে থাকে, তাহলে প্রযুক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতারও নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। এ কারণে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও মানুষের নিয়ন্ত্রণকে প্রযুক্তির পরবর্তী ধাপ হিসেবে নয়, শুরু থেকেই এর নকশার অংশ করতে হবে।
শিশুরা যে পৃথিবীতে বড় হবে
এআইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে শিশুদের জীবনে। একজন শিশু এখন এমন এআইয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারে, যা তার প্রশ্নের উত্তর দেয়, গল্প বলে, পরামর্শ দেয় এবং বন্ধুর মতো আচরণ করে। এর ভালো দিক আছে। কিন্তু মানুষের সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে এআই ব্যবহৃত হলে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
শিশু অন্য মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মতের অমিল সামলায়, অপেক্ষা করতে শেখে, ভুল করে, ক্ষমা চায় এবং অন্যের অনুভূতি বোঝে। এসব অভিজ্ঞতা তার সামাজিক ও মানসিক বিকাশের অংশ। একটি এআই যদি সব সময় শিশুর পছন্দমতো প্রতিক্রিয়া দেয়, তাহলে বাস্তব সম্পর্ক থেকে শেখার সুযোগ কমে যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করেছে। নতুন প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার আগে তার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে ভাবা দরকার। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য।
সম্ভাবনার দিকটিও বিশাল
ঝুঁকির কথা বলার পাশাপাশি এআইয়ের সম্ভাবনাকে ছোট করে দেখারও কারণ নেই।
বিজ্ঞান গবেষণায় এটি নতুন ওষুধ আবিষ্কার, রোগ শনাক্তকরণ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান খোঁয়ার কাজ দ্রুত করতে পারে। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে। স্বাস্থ্য খাতে এর সম্ভাবনা বিশেষভাবে বড়। বিশ্বের অনেক অঞ্চলে দক্ষ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। ছোট হাসপাতাল বা প্রত্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সব ধরনের বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায় না। এআই চিকিৎসকদের রিপোর্ট বিশ্লেষণ, রোগ শনাক্তকরণ কিংবা চিকিৎসার সিদ্ধান্তে সহায়তা করতে পারলে ভালো স্বাস্থ্যসেবা আরও মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
কৃষিতেও একই সম্ভাবনা আছে। স্থানীয় আবহাওয়া, মাটির অবস্থা, বীজ, রোগবালাই ও ফসলের তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই কৃষককে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি সেবার ক্ষেত্রেও এআই মানুষের জীবন সহজ করতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, খাদ্যসহায়তা বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা পেতে অনেক মানুষ জটিল নিয়ম ও কাগজপত্রের মুখোমুখি হন। এআই যদি সহজ ভাষায় জানাতে পারে—কোন সুবিধা পাওয়া যাবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে, কী নথি প্রয়োজন—তাহলে রাষ্ট্রীয় সেবা আরও সহজলভ্য হতে পারে।
শিক্ষায়ও এআই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একজন শিক্ষার্থী নিজের গতিতে শিখতে পারে, দুর্বল জায়গায় অতিরিক্ত ব্যাখ্যা পেতে পারে এবং ভালো করলে আরও কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। তবে এআই যেন শিক্ষার্থীর হয়ে সব কাজ না করে ফেলে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শেখার একটি অংশ হলো চেষ্টা করা, ভুল করা এবং আবার চেষ্টা করা। দ্রুত উত্তর পাওয়াই সব সময় শেখার সমান নয়।
সুফল নিশ্চিত করতে হবে
আমরা প্রায়ই ধরে নিই, ভালো প্রযুক্তি তৈরি হলেই তার সুবিধা সবার কাছে পৌঁছাবে। বাস্তবে তা হয় না।
যাদের অর্থ, অবকাঠামো ও দক্ষতা বেশি, তারা সাধারণত নতুন প্রযুক্তির সুবিধা আগে পায়। ফলে এআই সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও দাতব্য সংস্থাগুলোকে তাই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মানুষের জন্য স্থানীয় ভাষায় এআই তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষিতে এমন প্রযুক্তি দরকার, যা স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই।
এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রযুক্তি তৈরি করবে কোম্পানিগুলো, কিন্তু এর সামাজিক প্রভাব নির্ধারণ করবে পুরো সমাজ। শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, গবেষক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ—সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার নিয়েও ভাবতে হবে। প্রযুক্তির অগ্রগতি যেন পরিবেশগত ক্ষতির নতুন উৎস না হয়ে ওঠে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

কিছু কাজ মানুষের জন্যই থাকুক
এআই নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও করতে হবে: যে কাজ মেশিন করতে পারে, সেই কাজ কি সব সময় মেশিনকেই করতে হবে?
কিছু ক্ষেত্রে হয়তো নয়। আমার বাবার আলঝেইমার রোগের অভিজ্ঞতা আমাকে এ প্রশ্নটি ভাবিয়েছে। পরিচর্যার কাজ ভবিষ্যতে এআই অনেকটাই সহজ করতে পারে। কিন্তু মানুষের জীবনের কিছু মুহূর্তে প্রযুক্তিগত দক্ষতার চেয়ে মানবিক উপস্থিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকতা, পরিচর্যা, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কিংবা এমন কিছু কাজ, যেখানে সম্পর্কই মূল বিষয়—এসব ক্ষেত্রে আমরা হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের ভূমিকা ধরে রাখতে চাইব।
এ ধরনের ‘মানুষের জন্য সংরক্ষিত কাজ’-এর ধারণা চিরস্থায়ী কোনো তালিকা হতে হবে না। সময় ও সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে তা বদলাতে পারে। কিন্তু কোন কাজ আমরা মেশিনকে দেব আর কোন কাজ মানুষের হাতে রাখব—এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা এখনই শুরু করা দরকার।
করব্যবস্থাও নতুন করে ভাবতে হবে
আরেকটি প্রশ্ন অর্থনীতির।
বর্তমানে রাষ্ট্রের রাজস্বের বড় উৎস মানুষের শ্রমের ওপর কর। কিন্তু এআই ও রোবট যখন মানুষের শ্রমের বিকল্প হয়ে উঠবে, তখন করব্যবস্থাও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি একজন কর্মীর বদলে এআই ব্যবহার করে বিপুল অর্থ সাশ্রয় করে, তাহলে সেই পরিবর্তনের সামাজিক খরচ কে বহন করবে?
এ কারণে শ্রম ও পুঁজির ওপর করের ভারসাম্য নতুন করে ভাবা দরকার হতে পারে। এআইয়ের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য নয়, বরং এর উৎপাদনশীলতার সুফলের একটি অংশ যেন সমাজের বৃহত্তর মানুষের কাজে লাগে—সেই লক্ষ্যেই এমন ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। এই অর্থ দিয়ে পুনঃপ্রশিক্ষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করা সম্ভব।
সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই
এআইয়ের পরিবর্তন শুরু হয়ে যাওয়ার পর প্রস্তুতি নেওয়া সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে।
আমাদের এখনই ভাবতে হবে—চাকরি বদলালে মানুষ কীভাবে নতুন দক্ষতা অর্জন করবে, কোন ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা প্রয়োজন হবে, শিশুদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে এবং এআইয়ের সুবিধা কীভাবে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছেও পৌঁছানো যাবে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। নতুন মডেল তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; এগুলো কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথায় অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং কীভাবে মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যায়—এসব নিয়েও কাজ করতে হবে।
এআইয়ের যুগে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিগত নয়। প্রশ্নটি মানবিক। আমরা কি এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করব, যেখানে মেশিন মানুষের জায়গা নেবে? নাকি এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে মেশিন মানুষের সক্ষমতা বাড়াবে? এর উত্তর প্রযুক্তি একা দেবে না। উত্তর নির্ভর করবে আমাদের নীতি, প্রতিষ্ঠান এবং সিদ্ধান্তের ওপর।
এআইয়ের যুগ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তাই এখন আমাদের কাজ প্রযুক্তিকে থামানো নয়, আবার অন্ধভাবে তার ওপর নির্ভর করাও নয়। আমাদের কাজ হলো—এর শক্তিকে মানুষের কাজে লাগানো, ঝুঁকি কমানো এবং নিশ্চিত করা যে প্রযুক্তির সুফল কেবল কয়েকজনের হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে। এই প্রযুক্তি অভূতপূর্ব। তাই এর জন্য আমাদের সামাজিক প্রস্তুতিও হতে হবে অভূতপূর্ব।
ভবিষ্যৎ এখনও পুরোপুরি লেখা হয়নি। এআই সেই ভবিষ্যৎকে বদলাবে। কিন্তু কোন দিকে বদলাবে—সেই সিদ্ধান্তের বড় অংশ এখনও আমাদের হাতে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









