কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর একদিন পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেলেনি যশোরের একই পরিবারের চার সদস্যের। তারা হলেন মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি এবং তাদের দুই শিশুকন্যা রোবাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩)। অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশের পরও নিখোঁজ এই পরিবারের সদস্যদের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি স্বজনেরা। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তারা রয়েছেন কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। তবে এখন পর্যন্ত তাদের নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি প্রশাসন।
পরিবারের সদস্যদের খোঁজে চলছে স্বজনদের ছোটাছুটি, অন্যদিকে পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন নাহিদুরের কর্মস্থলের সহকর্মীরাও। হাসপাতাল, পুলিশ ও উদ্ধারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে যোগাযোগ করেও এখন পর্যন্ত তাদের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায়ও তাদের নাম পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ নাহিদুর রহমান ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে উঠেছিলেন। রিসোর্টের বুকিং নথি অনুযায়ী, গত ১৬ অক্টোবর থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দুই রাতের জন্য ২০২ নম্বর সুপার ডিলাক্স কক্ষটি বুক করেছিলেন তিনি। ১১ অক্টোবর ওই বুকিং দেওয়া হয়। রোববার দুপুর ১টায় তাদের রিসোর্ট ছাড়ার কথা ছিল।
শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়লে নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু নাহিদুর, তার স্ত্রী কিংবা দুই মেয়ের কারও মুঠোফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। ভাই ও তার পরিবারের সন্ধানে জাহিদুর রহমান নিজেও কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। স্বজনদের আশঙ্কা, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তাদের পরিবারের সদস্যরা থাকতে পারেন।
জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানান, তার ভাই শুক্রবার কক্সবাজার যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। শনিবার সকালে আগুনের খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভাই বা তার পরিবারের কারও কোনো খোঁজ পাননি। তিনি বলেন, তাদের পরিবারে দুই ভাই। অসুস্থ বাবা গ্রামের বাড়িতে থাকেন। নাহিদুর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন। ছুটি পেলে বা উৎসবের সময় গ্রামের বাড়িতে আসতেন। পরিবারের চার সদস্যের পরিণতি জানতে না পারায় সবাই চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
নাহিদুরের নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মণিরামপুরের মোহনপুরসহ আশপাশের এলাকায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ছবি প্রকাশ করে অনেকেই সন্ধান পাওয়ার আশা প্রকাশ করছেন। পরিচিতজন ও স্বজনেরা বিভিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। নাহিদুরের কর্মস্থল গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা রকিবুজ্জামানও তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন। তিনি বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন। নাহিদুরকে একজন ভালো কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি এ পরিস্থিতিতে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন।
নাহিদুর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও পরিচিতজনদের মধ্যেও তার পরিবারের নিখোঁজ হওয়ার খবর উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় তাদের সন্ধান পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজন ও সহকর্মীরা।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। এ ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু এবং ছয়জন আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আগুনের সূত্রপাত, ক্ষয়ক্ষতি ও দায় নির্ধারণে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









