মৌসুমের শুরু থেকে টানা নবম জয় তুলে নিল হান্সি ফ্লিকের দল। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে আবারও ম্যাচের কেন্দ্রে লামিনে ইয়ামাল। উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন বার্সেলোনার মার্ক বার্নাল; দশজনের বেতিস শেষ পর্যন্ত আর পেরে ওঠেনি।
লা কার্তুহা যেন বেতিসের জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক। এই মাঠে তাদের সাম্প্রতিক সাফল্য আর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক বিশেষ আবহ। কিন্তু বার্সেলোনার কাছে শেষ পর্যন্ত সেই আবহও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারল না। হান্সি ফ্লিকের দল এখানে এসে তুলে নিল মৌসুমের শুরু থেকে টানা নবম জয়। ৫-২ গোলের ব্যবধান শুধু বার্সেলোনার আক্রমণাত্মক শক্তির পরিচয় নয়, লামিনে ইয়ামাল নামের এক অসাধারণ প্রতিভার ওপর দলটির নির্ভরতাও সামনে এনে দিল।
এই মুহূর্তে বার্সেলোনার খেলা দেখলে মনে হয়, দলটির ছন্দ নষ্ট করা কঠিন। আক্রমণে গতি, বলের দখলে আত্মবিশ্বাস, আর সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে ফ্লিকের দল যেন একটি নির্দিষ্ট ছন্দে এগিয়ে চলেছে। অন্যদিকে, ১৯৩৪-৩৫ মৌসুমে লিগ শিরোপা জয়ের পর বেতিসের এবারের দলকেও অন্যতম শক্তিশালী হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্প্যানিশ লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ—দুই প্রতিযোগিতাতেই তারা খেলছে সমান উদ্যমে। ফলে ম্যাচটি যে সহজ হবে না, তা শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল।
কিন্তু লামিনে ইয়ামালকে আটকানো যে কত কঠিন, ম্যাচের শুরুতেই তা বুঝিয়ে দিল বার্সেলোনা।
বক্সের বাইরে বল পেয়ে একের পর এক নিয়ন্ত্রণ, ভান, থামা, ঘুরে দাঁড়ানো ও ড্রিবলিংয়ের পর বাঁ পায়ের শটে বল জালে পাঠালেন তিনি। বেতিসের গোলরক্ষক ভায়েসের পক্ষে কিছুই করার ছিল না। বলটি বাঁক নিয়ে ঢুকে গেল গোলের ওপরের ডান কোণে। দেখে মনে হলো, কোনো সেট পিস থেকে নেওয়া নিখুঁত ফ্রি-কিক। অথচ পুরো কাজটি করলেন চলন্ত অবস্থায়, নিজের দক্ষতা আর মুহূর্ত বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে।

লামিনের এই গোলের বর্ণনা দিতে গেলে শুধু গতি বা নিখুঁত শটের কথা বললে চলে না। তার খেলায় এমন এক স্বাভাবিকতা আছে, যা কঠিন কাজকেও সহজ বলে মনে করায়। প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে কখন থামতে হবে, কখন গতি বাড়াতে হবে, কখন জায়গা তৈরি করতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত তিনি নেন চোখের পলকে। তাঁর প্রতিটি স্পর্শে যেন পরের চালটির আভাস লুকিয়ে থাকে। এ কারণেই তার খেলা দেখতে দেখতে মনে হয়, মাঠে যা ঘটছে, তার বাইরেও তিনি কিছু একটা বুঝতে পারছেন।
বার্সেলোনার একাদশে পরিবর্তন ছিল যথেষ্ট। এরিক ও গর্ডন শুরু থেকে খেলেননি; গ্যাব্রিয়েল জেসুস ছিলেন আক্রমণের কেন্দ্রে। কিন্তু লামিনে যখন দলে থাকেন, তখন অন্যদের অনুপস্থিতি নিয়ে আলোচনা অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। কারণ তিনি শুধু গোল করেন না, দলের আক্রমণের গতিপথও নির্ধারণ করেন।
তবে শুরুতে গোল খেয়েও বেতিস ভেঙে পড়েনি। বুধবার পোর্তোর বিপক্ষে জেতা দলটির একাদশে ছিল সাতটি পরিবর্তন। তবু তাদের আক্রমণে গতি ও সাহসের অভাব দেখা যায়নি। বার্সেলোনা বলের দখল ধরে রাখছিল, কিন্তু বেতিস বারবার পাল্টা আক্রমণে তাদের রক্ষণকে চাপে ফেলছিল। বাঁ প্রান্ত দিয়ে আবদের দৌড়, ফাঁকা জায়গায় ঢুকে পড়ার ক্ষমতা এবং দ্রুত আক্রমণ গড়ে তোলার দক্ষতা বার্সেলোনার জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর কর্নার থেকে সমতায় ফিরল বেতিস। যোগ করা সময়ে সেন্টার-ব্যাক ভ্যালেন্তিন গোমেসের হেডে স্কোর হলো ১-১। বার্সেলোনার পুরোনো সমস্যাটিও আবার সামনে এল: সেট পিস সামলাতে গিয়ে তাদের রক্ষণ প্রায়ই দিশা হারায়। শুধু বলের দখল ধরে রাখলেই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; প্রতিপক্ষ যখন দ্রুত আক্রমণে ওঠে, তখন মাঝমাঠ ও রক্ষণকে মুহূর্তের মধ্যে নিজেদের অবস্থানও ঠিক করতে হয়।
রদ্রি ও পেদ্রির মতো বল নিয়ন্ত্রণে দক্ষ দুই খেলোয়াড় একসঙ্গে থাকলেও সেই ঘাটতি পুরোপুরি ঢাকা পড়েনি। তাদের ছোট ছোট পাস বার্সেলোনাকে খেলার ছন্দ ধরে রাখতে সাহায্য করেছে, কিন্তু আক্রমণের শেষ মুহূর্তে সেই নিয়ন্ত্রণ সব সময় গোলে রূপ নেয়নি। লামিনের তৈরি করা সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি গ্যাব্রিয়েল জেসুস ও আদেয়েমি। অন্যদিকে, বার্সেলোনার রক্ষণে ফাঁক পেলেই আবদে বিপজ্জনক হয়ে উঠছিলেন।
জোয়ান গার্সিয়া একবার বেলেরিনের নিশ্চিত গোলের সম্ভাবনা নষ্ট করেন। পরে ফেরমিনের কর্নার থেকে হেড করে গোল করেন রদ্রি। দুই বক্সেই উচ্চতার সুবিধা কাজে লাগানোর গুরুত্ব তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বার্সেলোনা এগিয়ে গেলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতে আসেনি। খেলা চলছিল দ্রুত পাল্টা আক্রমণ, সুযোগ ও গোলের সম্ভাবনার মধ্যে দিয়ে।
বার্সেলোনার সমস্যা হলো, তারা এখনো নিখুঁত দল হয়ে উঠতে পারেনি। আক্রমণে তাদের দক্ষতা অসাধারণ, কিন্তু রক্ষণে ভুলের সুযোগও কম নয়। লো সেলসোর গোল সেই দুর্বলতারই আরেকটি উদাহরণ। পরে কুচোর করা একটি গোল ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআরের হস্তক্ষেপে বাতিল হয়। গোলটির আগে তার হাতে বল লেগেছিল বলে সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। বেতিসের সমর্থকেরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। তাদের চোখে, মাঠের লড়াইয়ে তারা বার্সেলোনার চেয়ে পিছিয়ে ছিল না।
ম্যাচের উত্তেজনা তাই থামেনি। বিরতির পরও দুই দল পাল্টাপাল্টি আক্রমণে গোলের সুযোগ তৈরি করেছে। স্কোরলাইন ১-২ থেকে ২-৩ হওয়ার মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছিল, কোনো দলই সহজে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। কিন্তু বার্সেলোনার পাল্টা আক্রমণে ফেরমিন ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ খুঁজে পান। এরপর লামিনের সঙ্গে তার বোঝাপড়া আরও কার্যকর হয়ে ওঠে। লামিনের পাস থেকেই গ্যাব্রিয়েল জেসুস গোল করে ব্যবধান বাড়ান—৩-১।
বেতিস অবশ্য আবারও ফিরে আসে। বার্সেলোনার রক্ষণভাগের পেছনে জায়গা পেয়ে আবদে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে গোল করেন। স্কোর ৩-২। গোলটির পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে মাটিতে পড়ে যান লামিনে। পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে রেফারি মার্ক বার্নালকে লাল কার্ড দেখান। অভিযোগ ছিল, তিনি মাথা দিয়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত করেছেন।
সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে লা কার্তুহার গ্যালারি। বেতিসের সমর্থকদের কাছে মনে হয়েছিল, রেফারির সিদ্ধান্ত তাদের দলের সম্ভাবনাকে অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। লামিনেও ঘটনাটিতে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তবে মাঠের বাস্তবতা বদলে গেল দ্রুত। একজন খেলোয়াড় কম নিয়ে বাকি সময় খেলা চালানো বেতিসের জন্য কঠিন হয়ে পড়ল। যে দল কিছুক্ষণ আগেও বার্সেলোনাকে চাপে রেখেছিল, তাদের পক্ষে আর আগের মতো আক্রমণে ওঠা সম্ভব হলো না।

বার্সেলোনা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে দেরি করেনি। লামিনের নেওয়া বল থেকে সেট পিসের পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাউ কুবারসি গোলরক্ষক ভায়েসকে পেছনে ফেলে লাফিয়ে বলের নাগাল পাওয়ার পর এরিক গোল করেন। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-২। এরপর দানি ওলমোর গোলে নিশ্চিত হয় ৫-২ ব্যবধানের জয়।
শেষ পর্যন্ত ব্যবধান বড় হলেও ম্যাচটি মোটেও একতরফা ছিল না। বেতিসের গতি ও আক্রমণাত্মক মানসিকতা বারবার বার্সেলোনার রক্ষণকে পরীক্ষায় ফেলেছে। তাদের সমর্থকেরা দীর্ঘ সময় বিশ্বাস করার কারণ পেয়েছেন যে, এই ম্যাচে ফল অন্য রকমও হতে পারত। কিন্তু বার্সেলোনার হাতে ছিল লামিনে ইয়ামাল—যিনি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তার উপস্থিতি শুধু গোলের সম্ভাবনা বাড়ায় না; প্রতিপক্ষের রক্ষণকে সব সময় সতর্ক থাকতে বাধ্য করে, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করে এবং দলের আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করে।
লামিনে মাঠজুড়ে ঘুরে বেড়ান, কখনো আক্রমণের ডান প্রান্তে, কখনো মাঝখানে এসে। দলের প্রয়োজন বুঝে তিনি নিজের অবস্থান বদলান। তার কাজ শুধু বল নিয়ে দৌড়ানো নয়; কোথায় দাঁড়ালে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙবে, কখন সতীর্থকে পাস দিতে হবে আর কখন নিজেই গোলের চেষ্টা করতে হবে—সেই সিদ্ধান্তগুলোও তাকে আলাদা করে দেয়।
বার্সেলোনার জয় তাই শুধু টানা নবম জয়ের পরিসংখ্যান নয়। এটি এমন এক দলের গল্প, যারা আক্রমণে ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে, যদিও রক্ষণে এখনো কিছু প্রশ্নের উত্তর বাকি। আর এই দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ লামিনে—যার প্রতিভা প্রতিটি ম্যাচে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
রোববার ক্যাম্প ন্যুতে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচ সামনে রেখে শেষ দিকে তাকে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগও পেয়েছে বার্সেলোনা। ততক্ষণে ফল প্রায় নিশ্চিত। লা কার্তুহার গ্যালারি দেখেছে, বেতিস লড়াই করেছে, গোল করেছে, ফিরে আসার চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যাচের গল্প লিখেছেন সেই দশ নম্বর—লামিনে ইয়ামাল।
বার্সেলোনা এখনো নিখুঁত নয়। কিন্তু লামিনে যখন এমন খেলেন, তখন তাদের অসম্পূর্ণতাগুলোও অনেক সময় জয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









