সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী অ্যান কারসনের গদ্যের বই ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট: অ্যান এসে’ থেকে ‘লেটারস, লেটারস’ প্রবন্ধটি দৈনিক এদিন অনলাইন পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করল। আসুন পাঠক আমরা অক্ষর, চিঠি ও প্রেমের গোপন ত্রিভুজ নিয়ে অ্যান কারসনের কি বলছেন কাছে জেনে নেই।
গ্রিক গ্রাম্মাতা শব্দের দুটি অর্থ—বর্ণমালার অক্ষর এবং চিঠি। ইংরেজি লেটার্স শব্দেও এই দুই অর্থ আছে। উপন্যাসে দুই ধরনের অক্ষরই গুরুত্বপূর্ণ। তারা আমাদের প্রেমের এমন এক অন্ধ বিন্দুর দিকে নিয়ে যায়, যেখানে আকাঙ্ক্ষা নিজের রহস্য নিজেই বুঝতে পারে না।
প্রথমে অক্ষরের কথা ভাবা যাক। উপন্যাস তো অক্ষর দিয়েই তৈরি। একজন লেখক লেখেন, একজন পাঠক পড়েন, আর কয়েকটি চরিত্র সেই লেখার ভেতর বেঁচে থাকে। এই তিনের মধ্যে একটি অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়। লেখক থেকে পাঠক, পাঠক থেকে চরিত্র, চরিত্র থেকে আবার লেখকের দিকে—একটি ত্রিভুজ। তিনটি বিন্দু যখন পরস্পরকে স্পর্শ করে, তখন পাঠের মধ্যে একধরনের উত্তেজনা জন্ম নেয়। যেন কোথাও বিদ্যুৎ জমছে। এই আনন্দ সহজ নয়। এর মধ্যে আনন্দ আছে, অস্বস্তি আছে, আছে এমন এক বিরোধ, যার মীমাংসা হয় না বলেই তাকে এত তীব্র মনে হয়। চিঠির কাজও অনেকটা এই রকম। উপন্যাসের চরিত্রেরা যখন একে অন্যকে চিঠি লেখে, তখন চিঠি শুধু খবর পৌঁছে দেয় না; তাদের মাঝখানে তৃতীয় একটি উপস্থিতি তৈরি করে। প্রেমিক তার প্রিয়তমাকে সরাসরি কিছু না বলে অন্য কাউকে লিখতে পারে। একজনের সামনে আরেকজনের চিঠি পড়া হতে পারে। যে মানুষটি সেখানে নেই, তার লেখা হঠাৎ উপস্থিত দুজন মানুষের সম্পর্ক বদলে দিতে পারে। প্রেমের মধ্যে তখন তিনটি কোণ তৈরি হয়। প্রেমিক, প্রিয়তমা এবং একটি চিঠি।
চিঠিটি একই সঙ্গে কাছে আনে ও দূরে সরিয়ে রাখে। যার কথা লেখা হয়েছে, সে উপস্থিত নয়; অথচ তার অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। চিঠি পড়তে পড়তে প্রেমিক আনন্দিত হয়, আবার কষ্টও পায়। কারণ সে প্রিয়জনকে পেয়েছে—কিন্তু কেবল অক্ষরের মধ্যে। এই পাওয়ার মধ্যেই না-পাওয়া রয়ে গেছে। প্রেমের একটি নিজস্ব যুক্তি আছে। সেই যুক্তিতে অনুপস্থিতি কখনো কখনো উপস্থিতির চেয়ে শক্তিশালী। আকিলিস তাতিউসের প্রাচীন গ্রিক উপন্যাস ক্লিতোফোন ও লিউকিপ্পে-তে এমন একটি ঘটনা আছে। নায়ক ক্লিতোফোন বিশ্বাস করে, তার প্রিয়তমা লিউকিপ্পে মারা গেছে। সে অন্য এক নারীকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। ঠিক তখনই লিউকিপ্পের একটি চিঠি এসে পৌঁছায় তার হাতে। ক্লিতোফোন বিয়ে থামিয়ে চিঠিটি পড়ে। পড়তে পড়তে লিউকিপ্পে তার আত্মার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। তার গাল লজ্জায় লাল হয়ে যায়—যেন পরকীয়া করতে গিয়ে সে হাতেনাতে ধরা পড়েছে।
অথচ লিউকিপ্পে সেখানে নেই। আছে শুধু তার লেখা। ক্লিতোফোন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর লিখতে বসে। যেন প্রেমের দেবতা ইরোস নিজেই তার হাত চালাচ্ছেন। চিঠির শুরুতে সে লেখে—
‘শুভেচ্ছা, আমার প্রিয় লিউকিপ্পে। আনন্দের মধ্যেও আমি দুঃখী, কারণ তোমার চিঠিতে তোমাকে একই সঙ্গে উপস্থিত ও অনুপস্থিত দেখছি।’

এই বাক্যটির মধ্যে প্রেমের সমস্ত বিরোধ যেন এসে জমা হয়েছে। লিউকিপ্পে আছে, আবার নেই। ক্লিতোফোন তাকে দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু ছুঁতে পারছে না। সে আনন্দিত, অথচ সেই আনন্দই তার দুঃখের কারণ। চিঠির মাধ্যমে ক্লিতোফোন তার ভালোবাসার কথা জানায়। লিউকিপ্পেকে অনুরোধ করে, তাদের মিলনের সময় না আসা পর্যন্ত যেন সে তার আকাঙ্ক্ষা অটুট রাখে। এখানে চিঠি আর নিছক কাগজ নয়। সে যেন তৃতীয় একজন মানুষ—সাক্ষী, বিচারক ও দূত। প্রেমিকের অনুভূতি তার মধ্য দিয়ে চলাচল করে। সে দুজনকে যুক্ত করে, আবার তাদের বিচ্ছিন্নতাও মনে করিয়ে দেয়। চিঠি মধুর, কারণ সে প্রিয়জনের খবর আনে; বেদনাদায়ক, কারণ সে প্রিয়জন নিজে নয়। এইভাবেই চিঠি আকাঙ্ক্ষার জন্য একটি জায়গা তৈরি করে। সেই জায়গায় প্রেমিক নিজের অসহায়তার মুখোমুখি হয়। সে যা চায়, তা তার কাছে নেই। অথচ না-পাওয়ার মধ্যেই সেই চাওয়া আরও তীব্র হয়ে ওঠে। চিঠি বর্তমান বাস্তবতার পাশে আরেকটি সম্ভাব্য বাস্তবতা দাঁড় করায়। ক্লিতোফোনের সামনে এখন অন্য এক নারীকে বিয়ে করার প্রস্তুতি। কিন্তু লিউকিপ্পের চিঠি তাকে মনে করিয়ে দেয় সেই প্রেমের কথা, যা তার কাছে এখনো আদর্শ, এখনো কাঙ্ক্ষিত। বাস্তবের পর্দায় চিঠি সম্ভাবনার ছবি ফেলে। সেই ছবির ভেতর দিয়ে ইরোস কাজ করে।
হেলিওদোরোসের এইথিওপিকা উপন্যাসে এই কৌশল আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। এখানে চিঠি নেই, আছে একটি বস্ত্রবন্ধনী। কিন্তু তার কাজ চিঠির মতোই। উপন্যাসের নায়িকা ক্যারিক্লিয়া ইথিওপিয়ার কৃষ্ণাঙ্গ রানি পারসিনার কন্যা। কিন্তু তার গায়ের রং সাদা। স্বামী এই অস্বাভাবিকতার কারণ জানতে চাইবেন—এই ভয়ে রানি জন্মের পরই শিশুটিকে পরিত্যাগ করেন। শিশুটিকে একটি কাপড়ে জড়িয়ে রেখে যান। কাপড়টির ওপর তিনি লিখে দেন তার জন্মের ইতিহাস এবং সাদা গাত্রবর্ণের রহস্য। পুরোহিতেরা শিশুটিকে উদ্ধার করে ডেলফিতে বড় করেন। অনেক বছর কেটে যায়। উপন্যাসের চতুর্থ বইয়ে এসে লেখক আমাদের সেই কাপড়ের লেখা পড়তে দেন।
কেন এত দেরি?
কারণ লেখাটি পড়ার মুহূর্তটি প্রেমের এক সংকটের সঙ্গে জড়িত। ক্যারিক্লিয়া তখন থিয়াজেনিসের প্রেমে পড়ে মৃত্যুর মুখোমুখি। তাকে বাঁচানোর আশায় পুরোহিত কালাসিরিস কাপড়ের লেখাটি পড়েন। সেখানে অতীত থেকে কথা বলেন ক্যারিক্লিয়ার মা। রানি জানান, স্বামীর সঙ্গে মিলনের মুহূর্তে তিনি অ্যান্ড্রোমিডার একটি ছবির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ছবিতে অ্যান্ড্রোমিডা নগ্ন, আর পারসিয়ুস তাকে পাথরের বাঁধন থেকে মুক্ত করে নিজের করে নিচ্ছেন। রানির দাবি, সেই ছবির দিকে তাকিয়ে থাকার ফলেই তার গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশুর গায়ের রং সাদা হয়েছে।
একটি ছবি। একটি দৃষ্টি। একটি শরীরের রং। ঘটনাটিকে নিছক অদ্ভুত কাহিনি বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু তার মধ্যে আরও একটি প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। রানি যখন স্বামীর সঙ্গে মিলিত হচ্ছিলেন, তখন তার মন ছিল অন্য কোথাও। স্বামী ছিলেন বাস্তব; পারসিয়ুস ও অ্যান্ড্রোমিডা ছিলেন ছবির ভেতরের প্রেমিক-প্রেমিকা। বাস্তবের সঙ্গে মিলনের মুহূর্তে কল্পনার একটি তৃতীয় কোণ খুলে গিয়েছিল। রানির দৃষ্টি সরে গিয়েছিল বর্তমান থেকে সম্ভাবনার দিকে। এই বিচ্যুতির ফল ক্যারিক্লিয়া। এখানে প্রেমের ত্রিভুজ আর কেবল তিনজন মানুষের সম্পর্ক নয়। একজন মানুষ বাস্তবে উপস্থিত, কিন্তু তার মন অন্যত্র। সেই অনুপস্থিত মন আবার এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করে, যা তার নিজের শরীরের সীমা ছাড়িয়ে যায়। কৃষ্ণাঙ্গ মায়ের গর্ভে জন্ম নেয় সাদা মেয়ে। যেন কল্পনার একটি ছবি বাস্তবের শরীরে রং লাগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একটি ছবি কি সত্যিই শরীরের রং বদলাতে পারে? কল্পনা কি মাংসের ওপর নিজের ছাপ রেখে যেতে পারে? একটি রূপক কি বাস্তব হয়ে উঠতে পারে? হেলিওদোরোস আমাদের কোনো সহজ উত্তর দেন না। বরং উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা আরও গভীর বিরোধের মধ্যে পড়ি।
ক্যারিক্লিয়া নিজে থিয়াজেনিসের প্রতি বিশ্বস্ত। তার প্রেমে কোনো বিচ্যুতি নেই। তার সাদা গাত্রবর্ণকে পবিত্রতার প্রতীক বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু জন্মের ইতিহাস জানার পর সেই সাদার অর্থ বদলে যায়। তার শরীরে যেন জন্মের আগেই মায়ের কল্পনার একটি ক্ষণিক বিচ্যুতি রং মেখে দিয়েছিল। সাদা রং তখন আর সরল অর্থে পবিত্রতা নয়। তার মধ্যে ঢুকে পড়েছে এমন একটি স্মৃতি, যা ক্যারিক্লিয়ার নিজের নয়। মায়ের দৃষ্টি, মায়ের কল্পনা, মায়ের ক্ষণিকের অনুপস্থিতি—সব মিলিয়ে তার শরীর হয়ে উঠেছে একটি প্রশ্ন। শরীর কি কেবল শরীর? নাকি তার গায়ে এমন কিছু লেখা থাকে, যা সে নিজে কখনো লেখেনি? কাপড়ের লেখাটি খুলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সামনে একটি অসংগতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৃষ্ণাঙ্গ মায়ের শ্বেতাঙ্গ কন্যা। বিশ্বস্ত প্রেমিকার শরীরে জন্মের আগের এক মানসিক বিচ্যুতির চিহ্ন। পবিত্রতার মধ্যে অপবিত্রতা, বাস্তবের মধ্যে কল্পনা, শরীরের মধ্যে ছবির ছায়া। আমরা অর্থ খুঁজতে থাকি। কিন্তু অর্থ স্থির হয় না। যতবার তাকে ধরতে যাই, ততবার সে অন্য দিকে সরে যায়। মনে হয়, এবার বুঝি রহস্যটি সমাধান হবে। তারপর দেখা যায়, যে ব্যাখ্যাটি পেতে যাচ্ছিলাম, সেটিই আবার নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ক্যারিক্লিয়ার জন্মের রহস্য আমাদের আনন্দ দেয়। একই সঙ্গে অতৃপ্তও রাখে। আমরা বুঝতে চাই, কিন্তু বোঝার শেষ সীমায় পৌঁছাতে পারি না।
কাপড়ের লেখাটি পড়ে কালাসিরিসও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। দেবতাদের পরিকল্পনার বিস্ময়কর বিন্যাস দেখে তিনি একদিকে আনন্দিত, অন্যদিকে বেদনায় পূর্ণ। তিনি একই সঙ্গে কাঁদছিলেন ও আনন্দিত ছিলেন। এই দ্বৈত অনুভূতিই উপন্যাস পড়ার একটি গভীর অভিজ্ঞতা। আমরা গল্পের অর্থ বুঝতে চাই, কিন্তু অর্থ আমাদের এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে আনন্দ ও বেদনা আলাদা করা যায় না। ক্যারিক্লিয়া ও থিয়াজেনিসের প্রেমের মধ্যে কাপড়ের লেখাটি তৃতীয় একটি কোণ খুলে দেয়—ক্যারিক্লিয়ার জন্মের ইতিহাস। বর্তমান প্রেম হঠাৎ অতীতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। যে মেয়েটি এখন ভালোবাসায় মৃত্যুর মুখোমুখি, তার শরীরে লুকিয়ে আছে অন্য এক প্রেমের ছবির ইতিহাস।

লেখাটি পড়ার পর কালাসিরিস আর আগের মানুষটি থাকেন না। পাঠের অভিজ্ঞতা তার অনুভূতিকে বদলে দেয়। তিনিও সেই পাঠকের মতো হয়ে ওঠেন, যে কোনো কিছুর অর্থ বুঝতে চায়, বারবার তার কাছে যায়, বারবার ব্যর্থ হয়, তবু অনুসন্ধান থামাতে পারে না। আমরা ক্যারিক্লিয়ার সাদা ত্বকের অর্থ খুঁজি। অর্থ সরে যায়। আবার খুঁজি। তার পিছু নিতে নিতে একসময় বুঝতে পারি, অর্থকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর প্রিয়জনকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে হয়তো খুব বেশি পার্থক্য নেই। দুটিই আমাদের কাছে টানে। দুটিই নিজেদের সম্পূর্ণভাবে ধরা দিতে অস্বীকার করে। পঞ্চম বা ষষ্ঠ শতকের বেনামি লাতিন উপন্যাস হিস্ট্রি অব অ্যাপোলোনিয়াস অব টায়ার-এ আমরা আরেকটি প্রেমের গল্প পাই। এখানে নায়ক অ্যাপোলোনিয়াস প্রেমে পড়ে পেন্টাপোলিসের রাজার কন্যার। অ্যাপোলোনিয়াস রাজকন্যাকে জয় করতে তার শিক্ষক হয়ে ওঠে। বিদ্যা ও শিক্ষার আকর্ষণে রাজকন্যা তার প্রতি অনুরক্ত হয়। উপন্যাসের লেখক জানান, সে অ্যাপোলোনিয়াসের প্রেমে পড়েছে তার জ্ঞানের জন্য। অন্য পাত্রেরা যখন রাজকন্যার সঙ্গে দেখা করতে চায়, রাজা তাদের ফিরিয়ে দেন। তার মেয়ে নাকি পড়াশোনায় এতটাই মগ্ন যে বিদ্যার প্রেমে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। কিন্তু বিদ্যার প্রেম কি কেবল বিদ্যার প্রেম? রাজা অ্যান্টিওকাস এবার একটি অদ্ভুত ব্যবস্থা করেন। প্রতিটি পাত্রকে নিজের নাম ও যৌতুকের বিবরণ একটি ফলকে লিখতে হবে। তিনি সেই ফলক মেয়ের কাছে পাঠাবেন, যাতে সে নিজের পছন্দের পাত্র বেছে নিতে পারে। অ্যাপোলোনিয়াস ফলকটি রাজকন্যার কাছে নিয়ে যায়। রাজকন্যা তার সামনে দাঁড়িয়ে একে একে পাত্রদের নাম পড়ে। এই দৃশ্যে আবার সেই পরিচিত ত্রিভুজ তৈরি হয়—প্রেমিক, প্রেমিকা ও লিখিত নামগুলো। অ্যাপোলোনিয়াস উপস্থিত। কিন্তু তার সামনে লেখা নামগুলো অন্য পুরুষদেরও উপস্থিত করে তোলে। রাজকন্যার হাতে একটি তালিকা, আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষটি, যাকে সে সত্যিই চায়।
কিন্তু রাজকন্যা নিজেও লিখতে জানে। সে এই বিন্যাস মেনে নিতে চায় না। তাই ফলকের ওপর অ্যাপোলোনিয়াসের নাম লিখে সেটি সিলমোহর দিয়ে বাবার কাছে ফেরত পাঠায়। সাহিত্য-সমালোচকেরা এই ঘটনাকে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বলে মনে করেছেন। তাদের প্রশ্ন, কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য এমন লিখিত ব্যবস্থার দরকার কী? মুখে বললেই তো হতো। প্রশ্নটি যুক্তিসংগত। কিন্তু উপন্যাসের প্রেম সব সময় দৈনন্দিন জীবনের যুক্তি মেনে চলে না। এখানে লেখার কাজটি শুধু তথ্য আদান-প্রদান নয়। অক্ষর রাজকন্যার মনে প্রেমের আগুন জ্বালায়। আবার সেই অক্ষরই তার সামনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপস্থিত করে প্রেমকে জটিল করে তোলে। শেষ পর্যন্ত রাজকন্যা নিজের হাতে অক্ষরগুলো সাজিয়ে প্রেমের দৃশ্যটিকেই বদলে দেয়। প্রথমে লেখা তার আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে। তারপর লেখা সেই আকাঙ্ক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শেষে সে লেখার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে বাধাটি সরিয়ে দেয়।
রাজকন্যা জানেন, অক্ষর দিয়ে কী করা যায়। তিনি কেবল নিজের প্রিয়জনকে বেছে নেন না; নিজের প্রেমের গল্পটি কীভাবে লেখা হবে, সেটিও নির্ধারণ করেন। যে ফলকে অন্যরা নিজেদের নাম লিখেছে, রাজকন্যা সেটিকে নিজের আকাঙ্ক্ষার পক্ষে ব্যবহার করেন। একটি নাম আর নিছক নাম থাকে না। তার সঙ্গে যুক্ত হয় একটি সম্ভাব্য জীবন। আরেকটি নাম মানে অন্য একটি ভবিষ্যৎ। রাজকন্যা সেই ভবিষ্যৎগুলোর মধ্যে নিজের পছন্দটি লিখে দেন। এখানে তিনি চরিত্র হয়েও লেখকের মতো কাজ করেন। লেখক যে কাহিনি সাজিয়েছিলেন, তার মধ্যে ঢুকে তিনি কাহিনির গতিপথ বদলে দেন। যেন উপন্যাসের ভেতর থেকে তিনি উপন্যাসের লেখার অধিকারটুকু নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন। এই ছোট্ট লেখার মধ্যে কল্পনার একটি বড় উলম্ফন আছে। রাজকন্যার সামনে বাস্তবে রয়েছে বাবার বেছে দেওয়া পাত্রদের তালিকা। কিন্তু তার আকাঙ্ক্ষা অন্য একজনের দিকে। সে যা আছে, সেখান থেকে যা হতে পারে, তার দিকে এগিয়ে যায়। ফলকে অ্যাপোলোনিয়াসের নাম লিখে সে নিজের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দৃশ্যমান করে তোলে। লেখার এই দুঃসাহস আনন্দদায়ক। কারণ রাজকন্যা আর কেবল গল্পের একটি চরিত্র নন। তিনি গল্পের বিন্যাসে হস্তক্ষেপ করছেন। তিনি নিজের ইচ্ছাকে এমন একটি জায়গায় লিখে দিচ্ছেন, যেখানে আগে তার জন্য কোনো জায়গা ছিল না।
এখানে দুই ধরনের অক্ষর আছে—বর্ণমালার অক্ষর এবং চিঠির অক্ষর। প্রেমেরও দুটি রূপ: উপন্যাসের চরিত্রদের মধ্যে প্রেম, আর উপন্যাসের সঙ্গে পাঠকের প্রেমালাপ। একটি অন্যটির ভেতরে বাস করে। বর্ণমালার অক্ষর দিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার চিঠি তৈরি হয়। আবার সেই প্রেমের গল্প দিয়েই উপন্যাস পাঠককে আকর্ষণ করে। চরিত্রেরা একে অন্যের প্রেমে পড়ে, আর পাঠক পড়তে পড়তে তাদের গল্পের প্রেমে পড়েন। তিনি ভাবেন, অন্য দুজন মানুষের জীবন পড়ছেন। অথচ অক্ষরের বিন্যাস, উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির খেলা তাকেও সেই প্রেমের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। তারপর রাজকন্যা পাতাটির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। তিনি ফলকের অক্ষরগুলো নতুনভাবে সাজিয়ে নিজের পছন্দের প্রেমের গল্পটি তৈরি করেন। কাহিনির ভেতরে দাঁড়িয়ে কাহিনির জ্যামিতি বদলে দেন। যেন তিনি নিজেই লেখক। যেন অক্ষর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, প্রেমকে বোঝার একটি পদ্ধতি। এই পরিবর্তন ঘটে কল্পনার একটি উলম্ফনের মধ্য দিয়ে। রাজকন্যা যা আছে, সেখান থেকে যা হতে পারে, তার দিকে এগিয়ে যান। প্রচলিত বিন্যাসের মধ্যে নিজের আকাঙ্ক্ষার জন্য একটি নতুন পথ তৈরি করেন।
পাঠক হিসেবে আমরা চাইলে গোটা ঘটনাকে অস্বাভাবিক, অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল কিংবা খানিকটা হাস্যকরও বলতে পারি। এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের জন্য লিখিত ফলক কেন? মুখে বললেই তো হয়! কিন্তু তাতে অক্ষরের কাজটি বোঝা হবে না। লিখিত শব্দের শক্তি এখানেই যে, তা বাস্তবে নেই এমন একটি দূরত্ব তৈরি করতে পারে; আবার সেই দূরত্বের মধ্য দিয়েই এমন একটি উপস্থিতি নির্মাণ করতে পারে, যা আগে ছিল না। চিঠি প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝখানে দাঁড়ায়, অথচ সেই দাঁড়ানোই তাদের একে অন্যের দিকে ঠেলে দেয়। লেখা প্রেমকে বিলম্বিত করে, আবার প্রেমের সম্ভাবনাকেও দৃশ্যমান করে।

প্রেমের ত্রিভুজ তাই কেবল তিনজন মানুষের সম্পর্ক নয়। এটি বাস্তব, কল্পনা ও ভাষার মধ্যে চলাচলের একটি পদ্ধতি।একটি নাম আরেকটি নামকে সরিয়ে দেয়। একটি ছবি একটি শরীরের অর্থ বদলে দেয়। একটি চিঠি মৃত বলে ভাবা মানুষকে জীবিত করে তোলে। একটি বাক্য পাঠককে এমন আবেগের মধ্যে নিয়ে যায়, যার অস্তিত্ব সে পড়তে শুরু করার আগে হয়তো জানতই না। আমরা যখন পড়ি, তখন কেবল অন্যের প্রেমের গল্প পড়ি না। আমরাও সেই গল্পের ভেতর প্রবেশ করি। অক্ষর আমাদের সামনে এমন একজনের উপস্থিতি তৈরি করে, যাকে আমরা ছুঁতে পারি না। আমরা অর্থের দিকে এগিয়ে যাই, অর্থ সরে যায়। চরিত্রের মনের ভেতর ঢুকতে চাই, কিন্তু তার কল্পনা আমাদের কল্পনার সঙ্গে মিশে নতুন জটিলতা তৈরি করে। তবু আমরা পড়তে থাকি। কারণ অক্ষর যা আছে, তার কথা বলার পাশাপাশি যা নেই, তারও একটি অবয়ব তৈরি করে। তারা আমাদের বর্তমান থেকে সরিয়ে সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে প্রেমিকের মতোই একটি অস্থিরতা আছে—কাছে আসার, দূরে সরে যাওয়ার, আবার ফিরে আসার। রাজকন্যা যখন ফলকে অ্যাপোলোনিয়াসের নাম লেখেন, তখন তিনি শুধু নিজের প্রিয়জনকে বেছে নেন না। তিনি পাঠককেও তার কল্পনার মধ্যে টেনে নেন। তার লেখা নামটি উপন্যাসের ভেতরে একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।
তখন আমরা বুঝতে পারি, প্রেমের গল্প সব সময় ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ নয়। কখনো কখনো তা এমন একটি জীবনের আকাঙ্ক্ষা, যা এখনো ঘটেনি, কিন্তু ঘটতে পারত। অক্ষর সেই আকাঙ্ক্ষাকে দৃশ্যমান করে। আর আমরা, পাতার সামনে বসে থাকা পাঠকেরা, সেই দৃশ্যমানতার প্রেমে পড়ি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









