‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’—কবির এই পঙ্ক্তির মতোই ইতিহাসের কাছে মানুষের শেখার শেষ নেই। শেকড়ের সন্ধানে মানুষ ফিরে যায় অতীতে, খুঁজে ফেরে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, ঐতিহ্য আর গৌরবের চিহ্ন। অথচ সেই শেকড়ের স্মৃতিই যখন অযত্নে হারিয়ে যেতে বসে, তখন ইতিহাসপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে জন্ম নেয় গভীর হাহাকার।
পাবনার চাটমোহর উপজেলার ঐতিহাসিক হরিপুর গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক নিবাস যেন তেমনই এক নীরব ইতিহাস। একসময় যে ভিটা ছিল একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের বসতভূমি, আজ তার অবশিষ্টাংশ বহন করছে সময়ের ক্ষয়, অবহেলা আর হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা। যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাংলা সাহিত্যের এই গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন ক্রমেই মলিন হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক ভিটা পরিদর্শনে গিয়ে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপলব্ধি করেন ইসাক আলী। জায়গাটি ঘুরে দেখার পর তিনি বলেন, ‘এখানে এসে মনে হলো, সময়ের প্রবাহে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও সভ্যতা ও ইতিহাসের কিছু স্মৃতিচিহ্ন এখনো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো শুধু পুরোনো স্থাপনা নয়, আমাদের অতীতের পরিচয়।’
তার এই উপলব্ধি শুধু একজন দর্শনার্থীর অনুভূতি নয়; বরং আমাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণে সামগ্রিক দায়িত্ববোধের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তিনি চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পৈতৃক ভিটাটি সংরক্ষণ, সংস্কার ও উন্নয়নের মাধ্যমে ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে উপজেলার প্রাচীন স্থাপনা, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও শতবর্ষী গাছসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
১৮৬৮ সালের ৭ আগস্ট যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন প্রমথ চৌধুরী। তার পিতা দুর্গাদাস চৌধুরী। তাদের আদি ও পৈতৃক নিবাস পাবনার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রামে। ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তার সাহিত্যকীর্তি আজও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জগতে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাংলা গদ্যে চলিত ভাষারীতির প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে প্রমথ চৌধুরীর অবদান অসামান্য। ‘বীরবল’ ছদ্মনামে সাহিত্যচর্চা করে তিনি বাংলা গদ্যকে সাধুভাষার প্রচলিত কাঠামো থেকে বের করে এনে সহজ, সাবলীল ও প্রাণবন্ত রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ পত্রিকা চলিত গদ্যরীতির প্রসারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
তার উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বীরবলের হালখাতা’, ‘তেল-নুন-লাকড়ি’, ‘নানাকথা’, ‘রায়তের কথা’ ও ‘আমাদের শিক্ষা’। গল্পগ্রন্থের মধ্যে ‘চার-ইয়ারী কথা’, ‘আহুতি’ ও ‘নীললোহিত’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ‘সনেট পঞ্চাশ’ ও ‘পদচারণ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।
এমন একজন সাহিত্যিকের শেকড় যেখানে প্রোথিত, সেই স্থানটি কেবল একটি পুরোনো বাড়ি কিংবা বসতভিটা নয়; এটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অমূল্য স্মারক।
পাবনা জেলা প্রশাসনের পর্যটনবিষয়ক তালিকাতেও প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক নিবাসের উল্লেখ রয়েছে। অতীতে তার স্মৃতি ধরে রাখতে সেখানে ‘প্রমথ চৌধুরী স্মৃতি পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা ও উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু একটি পাঠাগার কিংবা স্মৃতিফলক স্থাপনই ঐতিহ্য সংরক্ষণের পূর্ণতা দিতে পারে না। প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা, স্থাপনার যথাযথ সংস্কার, ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পৈতৃক ভিটার অবশিষ্ট স্থাপনা ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ করে এখানে প্রমথ চৌধুরীর জীবন, সাহিত্যকর্ম ও অবদান নিয়ে একটি স্মৃতি জাদুঘর, সমৃদ্ধ পাঠাগার এবং তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। পাশাপাশি স্থানটির ইতিহাস ও গুরুত্ব তুলে ধরে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে সাহিত্যপ্রেমী, গবেষক, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের আগমন বাড়বে। এতে স্থানীয় পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ইসাক আলীর কথায়, ‘আমরা শুধু বর্তমানকে নিয়ে বাঁচতে চাই না, অতীতের ইতিহাস থেকেও শিক্ষা নিতে চাই। আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, প্রাচীন স্থাপনা, ঐতিহ্যবাহী গাছপালা ও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। আজ আমরা যদি এগুলো রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের ইতিহাস তুলে ধরার মতো অনেক কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’
একটি জাতির পরিচয় শুধু তার বর্তমান অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়; তার অতীত, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যও সেই পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে জাতি নিজের শেকড়কে ভুলে যায়, সে জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মও একসময় হারিয়ে ফেলে আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক ভিটা তাই শুধু হরিপুর গ্রামের সম্পদ নয়, এটি পুরো দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। এই ভিটা সংরক্ষণ মানে কেবল কিছু পুরোনো স্থাপনা টিকিয়ে রাখা নয়, বরং বাংলা ভাষার এক মনীষীর স্মৃতি, তার সাহিত্যিক উত্তরাধিকার এবং আমাদের সাংস্কৃতিক শেকড়কে আগামী দিনের জন্য সুরক্ষিত রাখা।
সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আজ যে স্মৃতিচিহ্ন অবহেলায় পড়ে আছে, কাল হয়তো তা আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই সময় থাকতেই প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক নিবাস সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এগিয়ে আসবে। হরিপুরের এই ঐতিহাসিক ভিটা একদিন হয়ে উঠবে সাহিত্যপ্রেমীদের মিলনস্থল, গবেষকদের জ্ঞানচর্চার ঠিকানা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস জানার এক জীবন্ত পাঠশালা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









