বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে ঘিরে বরিশাল নগরী সেজেছে বর্ণিল সাজে। উৎসবমুখর পরিবেশ, লোকজ ঐতিহ্যের বৈচিত্র্য আর সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উদযাপিত হচ্ছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩।
মঙ্গলবার ভোরের আলো ফুটতেই নতুন বছরকে বরণ করে নিতে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও বরিশাল নাটকের যৌথ উদ্যোগে নগরীর বিএম স্কুল মাঠে আয়োজন করা হয় প্রভাতী অনুষ্ঠান। সূর্য ওঠার আগেই পরিবার-পরিজন নিয়ে লাল-সাদা ও নানা রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে অনুষ্ঠানস্থলে জড়ো হন হাজারো মানুষ। শিশুদের কোলাহল, তরুণদের উচ্ছ্বাস আর প্রবীণদের আবেগ মিলিয়ে পুরো এলাকা রূপ নেয় এক আনন্দঘন মিলনমেলায়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ গানের মূর্ছনায় নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। এরপর একে একে সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনায় মঞ্চ প্রাণবন্ত করে তোলেন উদীচীর শিল্পীরা। অনুষ্ঠানে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়, যা উপস্থিত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক পর্ব সম্পন্ন হয়।
এরপর রাখি বন্ধন ও ঢাকের তালে শুরু হয় বৈশাখী শোভাযাত্রা। প্রভাতী অনুষ্ঠান শেষে চারুকলার উদ্যোগে বিএম স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে বের হয় এক বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা, যা নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ঐতিহ্যবাহী অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।
শোভাযাত্রায় বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের রঙিন প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, বৈচিত্র্যময় মুখোশ, রঙিন মুকুট, টোপর, তালপাখা, টিয়া পাখি, টাট্টু ঘোড়ার প্রতিকৃতি এবং লোকজ ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। এতে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবকে দেয় ভিন্নমাত্রা।
নববর্ষ উপলক্ষে বিএম স্কুল মাঠে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। মেলায় গ্রামীণ হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী পণ্য ও দেশীয় খাবারের স্টল ঘিরে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রভাতী অনুষ্ঠানে আগত দর্শনার্থীরা জানান, পুরনো বছরের সব গ্লানি ভুলে নতুন আশায় পথচলার প্রেরণাই নববর্ষের মূল বার্তা। তারা একটি মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এদিকে, সকাল ৯টায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আরও একটি আনন্দ শোভাযাত্রা বের হওয়ার কথা রয়েছে, যা নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করবে।
নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে নগরীজুড়ে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পোশাকধারী ও সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন, ফলে উৎসবের আমেজের পাশাপাশি বিরাজ করছে স্বস্তি ও নিরাপত্তা।
সব মিলিয়ে, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আনন্দের অপূর্ব সমন্বয়ে বরিশালে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন পেয়েছে এক অনন্য মাত্রা, যা বাঙালির শিকড় ও পরিচয়ের গৌরবকে আরও একবার উজ্জ্বল করে তুলেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









