শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

বৈশাখের বর্জ্যে ঢেকে গেল ঐতিহ্যের শহর

শাহারুল ইসলাম ফারদিন

প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

বৈশাখের বর্জ্যে ঢেকে গেল ঐতিহ্যের শহর

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক মহামিলন। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় যশোরকে ধরা হয় এ উৎসবের অন্যতম সূতিকাগার হিসেবে, যেখানে বৈশাখ উদযাপন কেবল একটি দিন নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক। 

সেই যশোরেই এবারের পহেলা বৈশাখ উদযাপন হয়েছে বর্ণাঢ্য আয়োজন, মানুষের ঢল ও উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে। তবে এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের আড়ালে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা শুধু হতাশাজনকই নয় বরং ভবিষ্যতের জন্য এক সতর্কবার্তাও বটে। শোভাযাত্রায় বিশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব এবং উৎসব শেষে শহরজুড়ে বর্জ্যের স্তূপ দুইদিন পার হলেও তা অপসারণ করা হয়নি, সব মিলিয়ে এক প্রশ্নবিদ্ধ আয়োজনের সাক্ষী হয়েছে যশোরবাসী।

পহেলা বৈশাখের দিন মঙ্গলবার সকাল থেকেই যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র পৌরপার্কে মানুষের ঢল নামে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পান্তা-ইলিশ, বৈশাখী পোশাক, মুখোশ, ঢাকের বাদ্য আর সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় দিনভর উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে শহরের সর্বত্র। শুধু পৌরপার্ক নয়, ভৈরব পার্ক, টাউনহল মাঠ, আব্দুর রাজ্জাক মাঠ, নবকিশোলয় স্কুল মাঠ, লালদিঘীর পাড়সহ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একই চিত্র দেখা যায়। রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত মানুষের উপস্থিতি কমেনি, বরং উৎসবের আমেজ যেন ক্রমেই বেড়েছে।

কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের মাঝেই বৈশাখী শোভাযাত্রা ঘিরে তৈরি হয় চরম বিশৃঙ্খলা। অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভাষায়, এমন বিশৃঙ্খল শোভাযাত্রা যশোরে আগে কখনো দেখা যায়নি। শোভাযাত্রার নির্ধারিত রুট নিয়ে বিভ্রান্তি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব, যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সব মিলিয়ে পুরো আয়োজনেই দেখা যায় সমন্বয়ের ঘাটতি।

যশোর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান বিপ্লব বলেন, “আমরা প্রতিবছর শৃঙ্খলার মধ্যে শোভাযাত্রা করি। কিন্তু এবার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল না। হঠাৎ করেই যানবাহন ঢুকে পড়ছে, কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এটা অত্যন্ত হতাশাজনক।”

বিবর্তন যশোরের সভাপতি নওরোজ আলম খান চপল বলেন, “পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা প্রতিবছরই জেলা প্রশাসকের ব্যানারে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং এ আয়োজনকে ঘিরে আগেভাগেই একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টাউনহল মাঠে সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন একত্রিত হওয়ার পর পশ্চিম গেট দিয়ে শোভাযাত্রা বের হওয়ার কথা ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন সংগঠন, বিশেষ করে চারুপীঠ যশোর ও এসএম সুলতান ফাইন আর্টস কলেজসহ বিভিন্ন সংগঠনের তৈরি বড় বড় মোটিফ টাউনহল মাঠে প্রবেশ করানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু গেটের সীমাবদ্ধতার কারণে সেসব বৃহৎ মোটিফ মাঠে প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে সেগুলো পশ্চিম গেটের বাইরে রাখা হয়।”

তিনি অভিযোগ করে বলেন, “এমন পরিস্থিতির মধ্যেই প্রশাসন হঠাৎ করে পূর্ব পাশের গেট দিয়ে শোভাযাত্রা বের করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা পুরো আয়োজনের ছন্দ নষ্ট করে দেয়। দীর্ঘ দুই মাস ধরে শিল্পী ও সংগঠনগুলোর যে শ্রম, সৃজনশীলতা ও পরিকল্পনা ছিল, তা মুহূর্তেই ভেস্তে যায়।”

তিনি জানান, এবারের বৈশাখে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শোভাযাত্রা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার অভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গের সমন্বিত উদ্যোগ কামনা করেন।

দিনভর উৎসব শেষে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত যখন শহর আনন্দে মুখর ছিল, তখন কেউ হয়তো কল্পনাও করেনি যে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যাবে। কিন্তু দুইদিন পর বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় সেই একই অবস্থা। শহরের পৌরপার্ক ও আশপাশ এলাকা পরিণত হয়েছে এক বিশাল খোলা ডাস্টবিনে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ব্যবহৃত টিস্যু, প্লাস্টিকের বোতল, থালা-বাসন, গ্লাস, খাবারের প্যাকেটসহ নানা ধরনের বর্জ্য। কোথাও কোথাও জমে থাকা খাবারের উচ্ছিষ্ট থেকে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। চৈত্রের দাবদাহে সেই দুর্গন্ধ আরও অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

চারুপীঠ যশোরের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ পৌর পার্কের বেহাল অবস্থার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “পৌর পার্ক কোনো বাণিজ্যিক এলাকা নয়; এটি এই ইট-পাথরের শহরের মাঝে মানুষের জন্য এক টুকরো স্বস্তির জায়গা। কিন্তু এখন সেখানে পচা দুর্গন্ধে মানুষ বসতেই পারছেন না। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা পুরো পরিবেশকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে।”

তিনি সরাসরি পৌরসভার উদাসীনতাকে দায়ী করে বলেন, “যদি পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন করা হতো, অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হতো এবং মানুষকে সচেতন করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। এটি স্পষ্টভাবে পৌরসভার পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।”

স্থানীয় বাসিন্দা জুয়েল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সকালে হাঁটতে এসে মনে হয়েছে যেন কোনো ডাস্টবিনে ঢুকেছি। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উৎসবের নামে শহরকে নোংরা করে ফেলা হয়েছে।”

কামাল হোসেন নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, “আমরা প্রতিদিন এখানে হাঁটতে আসি। কিন্তু আজকের পরিবেশে দাঁড়ানোই কঠিন। বাচ্চাদের নিয়ে আসা তো দূরের কথা। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।”

জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, “এ ধরনের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ শুধু দৃষ্টিকটু নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। পচনশীল বর্জ্য থেকে ছড়াতে পারে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ। বিশেষ করে গরমের সময় এই ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।”

যশোর পৌরপার্ক, যা প্রতিদিন মানুষের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তির জায়গা হিসেবে পরিচিত, সেই স্থানটিই পরিণত হয়েছে দুর্গন্ধ ও বর্জ্যের স্তূপে। যেখানে মানুষ ভোরে নির্মল বাতাস নিতে আসে, সন্ধ্যায় হাঁটে, পরিবার নিয়ে সময় কাটায় সেই জায়গার বর্তমান অবস্থা যেন পুরো শহরের ব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, এ বছর পৌরপার্কে ৭০টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ছোট স্টলের ভাড়া ৫০০ টাকা এবং বড় স্টলের ভাড়া ১০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। 

প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুন্ডু জানান, বাস্তবে ৫৫ থেকে ৬০টি স্টল ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং সঠিক হিসাব জানতে একাউন্ট শাখায় যোগাযোগ করতে হবে।

তিনি বলেন, “পৌরপার্কের ময়লা অপসারণের কাজ চলছে। তবে শহরের অন্যান্য জায়গার দায়িত্ব জেলা প্রশাসন বা জেলা পরিষদের।”

অন্যদিকে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জায়েদ হোসেন বলেন, “স্টল ভাড়া থেকে যে অর্থ আসে, তার চেয়ে বেশি খরচ হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায়। প্রতিবছরের মতো এবারও আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।”

সাংস্কৃতিক কর্মীরা বলেন, “যদি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা সঠিক হতো, তাহলে কেন উৎসব শেষে এমন ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হলো? স্টল থেকে আয় হওয়া অর্থ কোথায় ব্যয় হলো? কেন পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও তদারকি ব্যবস্থা রাখা হয়নি?”

সাংস্কৃতিক কর্মী মুমিনুর রহমান তাজ বলেন, “উৎসব আয়োজন মানে শুধু মঞ্চ আর গান নয়। এর সাথে জড়িত থাকে পুরো ব্যবস্থাপনা। এখানে সেই জায়গাটাতেই বড় ধরনের ব্যর্থতা হয়েছে।”

একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের অসচেতনতাকেও দায়ী করা হচ্ছে। অনেকে যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলে রেখে গেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।

আজিজুর রহমান বলেন, “আমরা নিজেরা সচেতন না হলে শুধু প্রশাসনকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সবাই যদি নিজের দায়িত্ব বুঝত, তাহলে শহর এমন হতো না।”

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আশেক হাসানের সাথে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

ফারদিন/যশোর/অই

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.