হাওরে বৃষ্টির পানিতে জেলার সবকটি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বোরো ফসল তলিয়ে যায়। এতে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অসহায়ত্ব হয়ে সামনেই ফসল তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে হয়েছে। ডুবে থাকা ক্ষেত আর বাড়ির উঠানে স্তূপ করে রাখা পচা ধানের দুর্গন্ধে চারদিক যখন ভারি হয়ে উঠেছে, ঠিক সেই সময় টানা বৃষ্টির পর হাওরে রোদের ঝিলিক যেন নতুন করে বাঁচার লড়াইয়ে নামার সাহস জুগিয়েছে কৃষকের। জেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা শাল্লা। এই উপজেলাটি হাওরবেষ্টিত হওয়ায় জলবদ্ধতায় প্রায় ৬০ শতাংশ জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।
টানা বৃষ্টির পর রোদের ঝিলিক দেয়ায় হাওরাঞ্চলে কৃষকদের কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। জমে থাকা ধানগুলো শুকানো, পানির নিচ থেকে ডুবিয়ে ডুবিয়ে ধান কাটা, আবার কোথাও কোথাও উঁচু জমির ধান কেটে মাড়াই করা এ যেন এক প্রাণবন্ত অনুভূতি। সবকিছু মিলে হাওরে চলছে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধের খেলা।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, শনিবার পর্যন্ত হাওরে ১ লাখ ২১ হাজার ৮৬৪ হেক্টর এবং নন-হাওরে ১৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। গড়ে হাওরে ধান কাটা হয়েছে ৬২ শতাংশ। তবে এ হিসাব প্রত্যাখ্যান করেছে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা। তাদের দাবি, বাস্তবে অর্ধেক ধানও কাটা সম্ভব হয়নি, যা কাটা হয়েছে তার বড় অংশই পানিতে পচে নষ্ট হচ্ছে। তাদের মতে, ডুবে যাওয়া ও পচা ধান বাদ দিলে কৃষক এবার মাত্র ৩০ শতাংশ ধান ঘরে তুলতে পারবেন।
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে কৃষক যেমন ধান শুকাতে পারেননি, তেমনি হাওরে নেমে ধান কাটাও বন্ধ ছিল। তবে গতকাল (৩ মে) রোদের দেখা মিলতেই কৃষক আবার হাওরে নেমে পড়েছেন। কৃষাণীরাও ঘরে ও উঠানে ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
শাল্লা উপজেলার বাহারা গ্রামের কৃষক মৃনাল কান্তি দাস জানান, রোদ উঠতেই তিনি ডুবে যাওয়া ধান কাটার প্রস্তুতি নিয়েছেন; কিন্তু শ্রমিক সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক মণ ধান দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিজন শ্রমিককে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সরকার ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান কেনার ঘোষণা দিলেও গ্রামে কৃষক বাধ্য হয়ে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায় ধান বিক্রি করছেন। সরকারি গুদামে যে মানের ধান লাগে, এবার সে মানের ধান আমাদের কাছে নেই। তাই দালালদের কাছেই বিক্রি করতে হচ্ছে।’
কৃষাণী শিবানী রানি দাস জানান, এখনো তার সাত কেদার ধান পানির নিচে। ধান কাটার জন্য মানুষ পাচ্ছি না। ঘরে যে ধান আছে, সেটি শুকাতে আরো তিনদিন লাগবে। এভাবে রোদ থাকলে শুকানো শেষ করে পানির নিচের ধান কাটার চেষ্টা করব।
হাওরের পানিতে নেমে ধান কাটতে গিয়ে শ্রমিকদেরও পড়তে হচ্ছে নানা সমস্যায়। শ্রমিক ওসমান গণি বলেন, ‘ঠাণ্ডা পানি আর জোঁকের আক্রমণ, এই দুই সমস্যায় কাজ করতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’
এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকেই জেলায় বৃষ্টি শুরু হয়। উজান থেকে নেমে আসে পাহাড়ি ঢল। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে টানা চার দিন কৃষক হাওরে নামতেই পারেননি। এতে অনেক হাওরের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। একইসঙ্গে একের পর এক বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।
শাল্লা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিত রায় বলেন, ‘হাওরে রোদ ওঠা কৃষকসহ সবার জন্য স্বস্তির খবর। এভাবে আরো কয়েকদিন রোদ থাকলে কৃষক বাকি ধান ঘরে তুলতে পারবেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









