ইট-পাথরের একটি পুরোনো মন্দির। দেয়ালে সময়ের ক্ষতচিহ্ন, ছাদের কোণে জমে থাকা ইতিহাসের নীরবতা। তবুও সেখানে গেলে আজও যেন শোনা যায় স্বদেশপ্রেমের গান, প্রতিবাদের উচ্চারণ আর স্বাধীনতার আহ্বান। বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকার সেই ঐতিহাসিক কালীমন্দিরটি এখনও স্মরণ করিয়ে দেয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি চারণকবি মুকুন্দ দাসের অমর সংগ্রামের কথা।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাব, দীর্ঘদিনের অবহেলা আর সময়ের নির্মম ক্ষয়ের মধ্যেও স্থানীয় সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতায় টিকে আছে কবির স্মৃতিবিজড়িত এই স্থাপনাটি। স্থানীয়দের দেওয়া চাঁদা, শ্রম ও সহযোগিতাতেই চলছে মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ, পূজা-অর্চনা এবং চারণকবির স্মৃতি ধরে রাখার নীরব সংগ্রাম।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই মন্দির পরিদর্শন করেছিলেন এবং সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য অনুদান প্রদান করেন। কিন্তু এরপর আর কোনো বড় সরকারি উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ধীরে ধীরে জীর্ণ হয়েছে ভবনটি, মলিন হয়েছে ইতিহাসের চিহ্নগুলো। তবুও হাল ছাড়েননি স্থানীয় মানুষ। নিজেদের সীমিত সামর্থ্য দিয়েই তারা আগলে রেখেছেন বাংলার বিপ্লবী ইতিহাসের এক অনন্য স্মারক।
১৮৭৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার বানারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুকুন্দ দাস। তাঁর আসল নাম ছিল যজ্ঞেশ্বর দে। পিতা গুরুদয়াল দে ও মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবীর স্নেহে বেড়ে ওঠা এই শিশুই একসময় হয়ে ওঠেন বাংলার গণমানুষের কণ্ঠস্বর। পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে পরিবারসহ চলে আসেন বরিশালে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর স্বদেশচেতনায় উজ্জীবিত সংগ্রামী জীবনের পথচলা।
বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। দেশপ্রেমিক শিক্ষাবিদ অশ্বিনী কুমার দত্ত-এর সংস্পর্শে এসে তাঁর মধ্যে জন্ম নেয় স্বদেশপ্রেমের আগুন। পরে বৈষ্ণব সাধক রামানন্দ অবধূতের দীক্ষায় ‘যজ্ঞেশ্বর দে’ হয়ে ওঠেন ‘মুকুন্দ দাস’ বাংলার চারণকবি।
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ‘সাধন সঙ্গীত’ নামে শতাধিক পালাগান সমৃদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। এরপর গান, যাত্রাপালা ও পালাগানের মাধ্যমে গ্রাম থেকে শহর, সবখানে ছড়িয়ে দেন স্বাধীনতা, প্রতিবাদ ও জাগরণের বার্তা।
‘ভয় কি মরণে’, ‘রাখিতে সন্তানে’ কিংবা ‘বান এসেছে মরা গাঙে খুলতে হবে নাও’ এসব গান শুধু সুর নয়, ছিল শোষণ আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক জাগ্রত বিদ্রোহ।
তাঁর কণ্ঠের সেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। হাটে-বাজারে, গ্রামগঞ্জে, মেলায় কিংবা শহরের মঞ্চে দল নিয়ে গান গেয়ে তিনি মানুষকে জাগিয়ে তুলতেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। ফলে বারবার ব্রিটিশ শাসকদের রোষানলেও পড়তে হয়েছে তাঁকে। নির্যাতন, হয়রানি আর নজরদারির মধ্যেই আন্দোলনের কার্যক্রম গোপন রাখতে নথুল্লাবাদ এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন এই কালীমন্দির। লোকচক্ষুর আড়ালে এখানেই বসে রচিত হতো তাঁর স্বদেশী গান, পালাগান ও বিপ্লবী যাত্রাপালা।
আজও সেই মন্দিরে গেলে অনুভব করা যায় ইতিহাসের এক গভীর আবেগ। সময়ের ভারে নুয়ে পড়লেও এখনও দাঁড়িয়ে আছে কবির হাতে গড়া সেই স্থাপনাটি। স্থানীয়দের উদ্যোগে কিছু সংস্কার করা হলেও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনের বিভিন্ন অংশে ক্ষয়ের চিহ্ন স্পষ্ট।
মন্দিরটিতে বংশপরম্পরায় একজন পুরোহিত বিনা পারিশ্রমিকে পূজা-অর্চনা করে আসছেন। মন্দিরের পাশেই রয়েছে ‘চারণকবি মুকুন্দ দাস ছাত্রাবাস’। স্থানীয় বাসিন্দারাই নিজেদের উদ্যোগে এর দেখভাল করছেন। ইতিহাসের এই স্মৃতি ধরে রাখতে তাদের নিরলস প্রচেষ্টা যেন এক নীরব দেশপ্রেমের গল্প।
প্রতি বছর কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী এবং কালীপূজার পরদিন ছোট পরিসরে আয়োজন করা হয় স্মরণানুষ্ঠান। তবে আয়োজন সীমিত হওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকেই আজ মুকুন্দ দাস সম্পর্কে খুব বেশি জানে না, এমন আক্ষেপ স্থানীয়দের।
বরিশালের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. গোকুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, মুকুন্দ দাস শুধু একজন কবি নন, তিনি ছিলেন গণজাগরণের কণ্ঠস্বর। তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে গবেষণা ও চর্চা বাড়ানো জরুরি। তাঁর নামে ফেলোশিপ চালু করা উচিত।
সমাজসেবী মানিক মুখার্জী বলেন, এই কালীমন্দিরটাই তাঁর রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় স্মৃতি। স্থানীয়রা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এটি দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা কঠিন। এখানে একটি মুরাল ও স্মৃতি জাদুঘর স্থাপন করা প্রয়োজন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গান দিয়েও বিপ্লব করা যায়। আর সেই ইতিহাসের উজ্জ্বল নাম মুকুন্দ দাস। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলার এই মহান চারণকবির স্মৃতি আজও পড়ে আছে অবহেলায়। সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ঐতিহাসিক এই কালীমন্দির সংরক্ষণ, গবেষণা কার্যক্রম চালু এবং মুকুন্দ দাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। নইলে একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গৌরবময় অধ্যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









