একদিকে রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, অন্যদিকে ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ- এই দুইয়ের ফাঁকে সরকার যখন ব্যাংক খাতকে ঘাটতি অর্থায়নের প্রধান ভরসা বানায়, তখন তার খেসারত দিতে হয় পুরো অর্থনীতিকে। সরকারি কোষাগারের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে একের পর এক ঋণ নেওয়া আপাতত সরকারের অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু এর বিপরীতে বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল অর্থনীতির জন্য অর্থের সংকট আরো তীব্র হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নেওয়ার ঘটনা তাই নিছক সরকারি ঋণের পরিসংখ্যান নয়; এটি অর্থনীতির সম্পদের বণ্টন নিয়ে একটি বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে।
সরকার যখন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার করে, তখন ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহের ওপর চাপ পড়ে। বিশেষ করে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে তুলনামূলক নিরাপদ এবং আকর্ষণীয় মুনাফা পাওয়া গেলে ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। অর্থনীতিতে এ পরিস্থিতিই ক্রাউডিং-আউটের ঝুঁকি তৈরি করে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে দৃশ্যমান। জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে থাকলেও ডিসেম্বরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ।
অর্থাৎ উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি ও কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ঋণের সুদের হার যদি ১৪-১৫ শতাংশ বা তারও বেশি হয়, তাহলে নতুন কারখানা স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির সিদ্ধান্ত উদ্যোক্তাদের জন্য স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে পড়ে। বেসরকারি খাতের ঋণ সংকট শুধু ব্যবসার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। বিনিয়োগ কমলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হয়, শিল্পের সম্প্রসারণ থেমে যায় এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যয় কমাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে যেতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণের পেছনে অবশ্য বাস্তব কারণ রয়েছে। রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ, সরকারি বেতন-ভাতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের দায় সরকারকে নিয়মিত অর্থের সংস্থান করতে বাধ্য করছে। সঞ্চয়পত্র থেকে প্রত্যাশিত অর্থ না পাওয়া এবং বৈদেশিক বাজেট সহায়তার সীমাবদ্ধতাও পরিস্থিতিকে কঠিন করেছে। কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান হিসেবে ক্রমাগত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এ অবস্থায় প্রথম কাজ হওয়া উচিত রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার। এনবিআরের অটোমেশন, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং তথ্যভিত্তিক কর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অগ্রাধিকারহীন উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন, পরিচালন ব্যয়ে শৃঙ্খলা এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের অর্থায়নের উৎসও বহুমুখী করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ, উপযুক্ত বৈদেশিক বাজেট সহায়তা সংগ্রহ এবং ব্যাংক-বহির্ভূত বিনিয়োগকারীদের সরকারি সিকিউরিটিজে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি দায় পরিশোধের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি ঋণ নিজে কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা তৈরি হয় যখন ঋণ গ্রহণের গতি রাজস্ব সক্ষমতা ও অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্য হারায়। তাই এখন প্রয়োজন ব্যাংকনির্ভর ঘাটতি অর্থায়নের বদলে রাজস্ব সংস্কার, ব্যয়ে শৃঙ্খলা এবং উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করা। অর্থনীতির সুস্থ পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও বেসরকারি খাত- দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি-চ্যালেঞ্জ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









