একটি দেশ কি তার নিজের স্মৃতি থেকে পালাতে পারে?
প্রশ্নটি শুনতে সরল। কিন্তু এর উত্তর সরল নয়। কোনো দেশের ইতিহাস যদি একটি বই হয়, তবে তার কিছু পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলা যায়, কিছু পৃষ্ঠা পুড়িয়ে দেওয়া যায়, কিছু নাম মুছে দেওয়া যায়। তবু হয়তো গল্পটি শেষ হয় না। কারণ ইতিহাস শুধু নথিতে থাকে না। সে থাকে মানুষের মুখে, একটি শহরের দেয়ালে, একটি পরিত্যক্ত মাঠে, কোনো বৃদ্ধার অপেক্ষায়, কিংবা বহু বছর আগে ধারণ করা একটি চলচ্চিত্রের ফ্রেমে।
পাত্রিসিও গুজমানের পুরো জীবন যেন এই অসমাপ্ত প্রশ্নের অনুসরণ।
২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্যারিসে ৮৫ বছর বয়সে তার মৃত্যু হলো। চিলির জাতীয় সিনেমাথেক তাকে দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা হিসেবে স্মরণ করেছে এবং জানিয়েছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার কাজ সংরক্ষণ ও পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তারা বহন করবে। চিলির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির এক ‘মৌলিক ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে স্মরণ করেছে। আর তার সহযাত্রী প্রজন্মের চলচ্চিত্রকার মিগেল লিতিন লিখেছেন, গুজমান চিলি ও তার বেদনার মুখ ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন।
এই কথাগুলো হয়তো প্রশংসা। কিন্তু এর মধ্যে একটি গভীর সত্যও আছে। গুজমান আসলে একটি দেশের স্মৃতির চিত্রগ্রাহক ছিলেন।
১৯৪১ সালে সান্তিয়াগোতে জন্ম তার। বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার ও মানবিক বিদ্যার সঙ্গে পরিচয়ের পর চলচ্চিত্রের দিকে এগিয়ে যান। মাদ্রিদে চলচ্চিত্রশিক্ষা নেন, দেশে ফিরে বিজ্ঞাপনচিত্রসহ নানা কাজ করেন। কিন্তু তার প্রকৃত বিষয় ছিল চিলি—তার রাজনীতি, মানুষ, ভূগোল এবং সবচেয়ে বেশি তার স্মৃতি। ২০২৩ সালে তিনি চিলির জাতীয় পারফর্মিং ও অডিওভিজুয়াল আর্টস পুরস্কারে সম্মানিত হন।
১৯৭০ সালে সালভাদর আয়েন্দে ক্ষমতায় এলেন। চিলি তখন এক রাজনৈতিক পরীক্ষাগারের মতো। রাষ্ট্রের ভেতরে সমাজ বদলের স্বপ্ন, রাস্তায় শ্রমিকের আন্দোলন, বিরোধীদের প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক চাপ—সব মিলিয়ে বাস্তবতা যেন প্রতিদিন নিজের নতুন সংস্করণ লিখছিল।
গুজমান সেই সময় ক্যামেরা হাতে নিলেন। প্রথমে তিনি নির্মাণ করলেন ‘এল প্রিমের আনিও’—আয়েন্দে সরকারের প্রথম বছরের দলিল। কিন্তু তার আসল চলচ্চিত্র তখনও সামনে। তার নাম ‘দ্য ব্যাটল অব চিলি’।
এই চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে মনে হয়, আমরা একটি দেশের ইতিহাস দেখছি। কিন্তু আরও মন দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, আমরা একই সঙ্গে একটি দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখছি।
এটাই ‘দ্য ব্যাটল অব চিলি’র রহস্য।
চলচ্চিত্রটির ধারণকৃত সময় ১৯৭২-৭৩। তিন পর্বে নির্মিত এই বিশাল তথ্যচিত্রে উঠে আসে আয়েন্দে সরকারের শেষ সময়, রাজনৈতিক সংঘাত, শ্রমিক আন্দোলন, ধর্মঘট, শ্রেণিবিভাজন এবং ১৯৭৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের দিকে এগিয়ে যাওয়া চিলি। ১৯৭৩ সালের অভ্যুত্থানের পর গুজমান গ্রেপ্তার হন এবং জাতীয় স্টেডিয়ামে আটক ছিলেন। পরে নির্বাসনে চলে যান। তার ধারণ করা ফুটেজ চিলির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কিউবায় চলচ্চিত্রটির সম্পাদনা সম্পন্ন হয়। ত্রয়ীটি ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয়।
এখানে একটি অদ্ভুত সময়ের খেলা আছে। দর্শক জানে ভবিষ্যৎ। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো জানে না। আমরা জানি, আয়েন্দের সরকার শেষ পর্যন্ত পতন হবে। জানি ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩-এ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটবে। জানি লা মোনেদা আক্রান্ত হবে। জানি চিলির ইতিহাস একটি দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। কিন্তু চলচ্চিত্রের মানুষগুলো তখন ভবিষ্যৎ জানে না। তারা বর্তমান নিয়ে কথা বলছে। কেউ আশা করছে, কেউ ভয় পাচ্ছে, কেউ প্রতিবাদ করছে, কেউ ক্ষমতা ধরে রাখার কথা বলছে। তাদের কাছে ভবিষ্যৎ এখনো একটি বন্ধ দরজা। আমাদের কাছে দরজাটি খোলা।

এই দ্বৈত সময় ‘দ্য ব্যাটল অব চিলি’–কে সাধারণ রাজনৈতিক তথ্যচিত্রের চেয়ে বেশি কিছু করে তোলে। এটি যেন একটি আয়না, যেখানে অতীত নিজেকে ভবিষ্যতের চোখে দেখছে।গুজমান পরে তার চলচ্চিত্রকে কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে দেখতে চাননি। তিনি নিজেই বলেছিলেন, তিনি সমাজবিজ্ঞানী নন, রাজনীতিবিদও নন; তিনি বাস্তবতাকে নিজের ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে, রূপক ও কাব্যিকতার মধ্য দিয়ে দেখেন।
এই বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ‘দ্য ব্যাটল অব চিলি’–এর শক্তি শুধু তার রাজনৈতিক বিষয়বস্তুতে নয়। শক্তি তার দেখার পদ্ধতিতে। ক্যামেরা যেন কোনো আদালতের বিচারক নয়। সে মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে রায় ঘোষণা করে না। সে অপেক্ষা করে। মানুষকে কথা বলতে দেয়। শ্রমিক কথা বলে, রাজনৈতিক কর্মী কথা বলে, বিরোধী কথা বলে, সাধারণ নাগরিক কথা বলে। আর তাদের কথার ফাঁক দিয়ে একটি সমাজের অস্থিরতা দৃশ্যমান হয়।
এই পদ্ধতিতে ইতিহাস কখনো একক কণ্ঠের থাকে না। ইতিহাস হয়ে ওঠে বহু কণ্ঠের এক অসমাপ্ত বাক্য। এ কারণেই চলচ্চিত্রটির রাজনৈতিক মূল্য তার সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। চিলির জাতীয় সিনেমাথেকের ভাষ্যেও ‘দ্য ব্যাটল অব চিলি’ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে এবং রাজনৈতিক তথ্যচিত্রের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
গুজমানের নিজের জীবনও এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন নয়। অভ্যুত্থানের পর তিনি নির্বাসিত। কিউবা, স্পেন, পরে ফ্রান্স—দেশ বদলেছে, কিন্তু তার চলচ্চিত্রের বিষয় বদলায়নি। তিনি দূরে থেকেও বারবার চিলিতে ফিরে গেছেন। যেন নির্বাসন তার জন্য ভূগোলের পরিবর্তন, স্মৃতির নয়। এই জায়গায় তার চলচ্চিত্রের সঙ্গে বোর্হেসীয় একটি ধারণার মিল খুঁজে পাওয়া যায়— গোলকধাঁধা।
গোলকধাঁধায় প্রবেশ করার পর মানুষ ভাবে, সে সামনে এগোচ্ছে। পরে বুঝতে পারে, সে হয়তো একই জায়গায় ফিরে এসেছে। ইতিহাসও কখনো এমন। একটি দেশ ভাবে তার অতীত শেষ হয়ে গেছে। তারপর কোনো নতুন আন্দোলন, কোনো পুরোনো ক্ষত, কোনো ভুলে যাওয়া নাম আবার সেই অতীতকে বর্তমানের দরজায় এনে দাঁড় করায়।
গুজমানের চলচ্চিত্রজীবন ছিল সেই ফিরে আসার ধারাবাহিকতা। ১৯৯৭ সালে চিলে, ‘লা মেমোরিয়া অবস্তিনাদা’–তে তিনি ‘দ্য ব্যাটল অব চিলি’–এর পুরোনো মানুষদের কাছে ফিরে গেলেন। অতীতের ফুটেজ তাঁদের সামনে দেখালেন। এক অর্থে এটি ছিল একটি চলচ্চিত্রের নিজের দর্শকদের কাছে ফিরে যাওয়া।
যে মুখ একসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছিল, বহু বছর পরে সেই মুখ নিজের তরুণ বয়সকে পর্দায় দেখতে পেল। এখানে সিনেমা শুধু স্মৃতি ধারণ করছে না। সিনেমা নিজেই স্মৃতির একটি চরিত্র হয়ে উঠছে।
তারপর এল ‘নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট’।
আতাকামা মরুভূমি—একদিকে পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক স্থান, অন্যদিকে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের জন্য অসাধারণ একটি জানালা। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সেখানে দূর নক্ষত্রের অতীত খুঁজছেন। আর সেই একই মরুভূমিতে কিছু নারী খুঁজছেন সামরিক শাসনের সময়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া স্বজনদের দেহাবশেষ।
আকাশে অতীত। মাটির নিচেও অতীত। একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোটি কোটি বছর আগের আলো খুঁজছেন; একজন মা কয়েক দশক আগের সন্তানের হাড় খুঁজছেন। সময়ের দুই প্রান্ত এসে একই মরুভূমিতে মিলিত হচ্ছে। এখানেই গুজমানের চলচ্চিত্র রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে আরও গভীর এক প্রশ্নের দিকে চলে যায়: মানুষ অতীতকে কোথায় রাখে?
জাদুঘরে? বইয়ে? রাষ্ট্রের নথিতে? নাকি মানুষের শরীর ও ভূদৃশ্যে?
চলচ্চিত্র-ইতিহাসবিদ মাইকেল চানান গুজমানের কাজকে রাজনৈতিক সাক্ষ্য, ব্যক্তিগত স্মৃতি ও মহাজাগতিক চিন্তার এক সংমিশ্রণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, গুজমানের চলচ্চিত্রে ইতিহাস ও ক্ষতির প্রশ্ন ক্রমে একটি বৃহত্তর ধ্যানের রূপ নিয়েছিল।
এই বিবর্তনটি লক্ষ করার মতো। যে মানুষটি একসময় একটি সামরিক অভ্যুত্থানকে ক্যামেরায় ধরেছিলেন, পরে তিনি মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে নক্ষত্রের দিকে তাকালেন। কিন্তু বিষয় বদলায়নি। তিনি তখনও অতীত খুঁজছিলেন।
‘দ্য পার্ল বাটন’–এ জল হয়ে ওঠে স্মৃতির বাহক। ‘দ্য কর্দিলিয়েরা অব ড্রিমস’–এ আন্দিজ পর্বতমালা হয়ে ওঠে নীরব সাক্ষী। যেন চিলির ভূগোল নিজেই একটি আর্কাইভ, যেখানে মানুষের ইতিহাস লেখা আছে। তার শেষ চলচ্চিত্র ‘মাই ইম্যাজিনারি কান্ট্রি’ তাকে আবার রাস্তায় ফিরিয়ে নেয়। ২০১৯ সালের চিলির গণআন্দোলন সেখানে একটি নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে পুরোনো প্রশ্নগুলোকে ফিরিয়ে আনে। কয়েক দশক পর একই দেশের মানুষ আবার রাস্তায়। ক্যামেরাও আবার তাদের সঙ্গে।
এ যেন বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়া। কিন্তু ইতিহাসের বৃত্ত কখনো পুরোপুরি সম্পূর্ণ হয় না। গুজমানের মৃত্যুর পর তার সহকর্মী মিগেল লিতিন লিখেছেন, তার চলচ্চিত্রগুলো কবিতা ও ঐতিহাসিক সত্যে পূর্ণ এবং তিনি যেন চিলির নিজের চামড়া ও চোখে পরিণত হয়েছিলেন। চিলির বিশ্ববিদ্যালয়ও তাকে এমন একজন পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণ করেছে, যার কাজ প্রজন্মের পর প্রজন্মের চলচ্চিত্রচর্চাকে প্রভাবিত করেছে। এই স্মরণবক্তব্যগুলোর মধ্যে একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে—স্মৃতি।
কিন্তু স্মৃতি কি কেবল অতীতকে ধরে রাখে? গুজমানের চলচ্চিত্র দেখে মনে হয়, না। স্মৃতি ভবিষ্যৎকেও তৈরি করে।
একটি সমাজ কী মনে রাখবে, আর কী ভুলে যাবে—তার ওপর নির্ভর করে সে নিজের আগামীকে কীভাবে বুঝবে। কোনো অপরাধ যদি কেবল নথির একটি পৃষ্ঠায় থাকে, একদিন তা ভুলে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু যদি সেই অপরাধ মানুষের মুখে, চলচ্চিত্রের ফ্রেমে, মাটির নিচে, মরুভূমির বাতাসে থেকে যায়, তখন তাকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য করা কঠিন।
এই কারণেই গুজমানের একটি বহুল উদ্ধৃত কথা এত অর্থবহ: তথ্যচিত্রহীন একটি দেশ যেন পারিবারিক অ্যালবামহীন একটি পরিবারের মতো।
অ্যালবাম আসলে কী করে? সে মৃতদের ফিরিয়ে আনে না। হারানো সময়ও ফিরিয়ে আনে না। সে শুধু প্রমাণ করে—তারা একদিন এখানে ছিল। সম্ভবত গুজমানের সিনেমার সবচেয়ে গভীর কাজটিও এটাই। ‘দ্য ব্যাটল অব চিলি’ আমাদের বলে না শুধু কী ঘটেছিল। সে দেখায়, ঘটনার আগে মানুষ কীভাবে বেঁচে ছিল, কী আশা করেছিল, কী নিয়ে তর্ক করেছিল, কী ভয় পেয়েছিল। ইতিহাসের বই যেখানে বলে ‘অভ্যুত্থান ঘটল’, গুজমান সেখানে আমাদের সেই মুহূর্তের মানুষের মুখ দেখান।
একটি রাষ্ট্রের ইতিহাস আর একটি মানুষের স্মৃতি—এই দুটির মধ্যে যে দূরত্ব, তার ক্যামেরা সেখানে একটি সেতু তৈরি করেছে।
তাই তার মৃত্যু কেবল একজন চলচ্চিত্রকারের মৃত্যু নয়। এটি এমন একজন মানুষের বিদায়, যিনি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি দেশের স্মৃতির পাহারায় ছিলেন। তার চলচ্চিত্রে চিলি কখনো শুধু একটি ভূখণ্ড নয়; সে একটি প্রশ্ন, একটি ক্ষত, একটি স্বপ্ন, একটি গোলকধাঁধা।
আর ‘দ্য ব্যাটল অব চিলি’? হয়তো সেটি সেই গোলকধাঁধার মানচিত্র—অসম্পূর্ণ, বহু কণ্ঠে আঁকা, কিন্তু আশ্চর্যভাবে টিকে থাকা। ক্যামেরা একদিন থেমে যায়। মানুষও থেমে যায়। কিন্তু একটি ধারণ করা দৃশ্যের নিজস্ব জীবন আছে।
১৯৭৩ সালের কোনো এক মুহূর্তে একজন মানুষ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি জানতেন না, তার কথাটি পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পরে কোনো অচেনা দেশের দর্শক শুনবে। জানতেন না, তার মুখ একটি ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে।
তিনি শুধু কথা বলেছিলেন। ক্যামেরা শুধু দেখেছিল। তারপর সময়—যে মহান সম্পাদককে কোনো সেন্সরশিপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না—বাকি কাজটি করেছে।
পাত্রিসিও গুজমান চলে গেছেন। কিন্তু তার চলচ্চিত্রের ভেতরে চিলি এখনো হাঁটছে—রাস্তায়, মরুভূমিতে, পাহাড়ের ছায়ায়, পুরোনো ফুটেজের আলো-অন্ধকারে। সম্ভবত এটাই একজন তথ্যচিত্র নির্মাতার সবচেয়ে দীর্ঘ জীবন— তিনি নিজে অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ার পরও তার ক্যামেরা আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
আর আমরা, দর্শক, হঠাৎ বুঝতে পারি—আমরা শুধু একটি পুরোনো চলচ্চিত্র দেখছি না। আমরাই হয়তো সেই চলচ্চিত্রের আরেকটি দৃশ্য। সময়ের অন্য প্রান্ত থেকে।

পরিচিতি
পাত্রিসিও গুসমান চিলির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা। তাঁর চলচ্চিত্রে ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনা নয়; তা মানুষের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, ভূদৃশ্য এবং একটি জাতির নীরব ক্ষত হয়ে ফিরে আসে। ১৯৭৩ সালে জেনারেল অগুস্তো পিনোশের সামরিক অভ্যুত্থানের পর গুসমানকে চিলি ছেড়ে নির্বাসনে যেতে হয়। কিন্তু দেশ থেকে দূরে থাকলেও তাঁর ক্যামেরা চিলিকে কখনো ছেড়ে যায়নি।
তাঁর সবচেয়ে পরিচিত কাজ দ্য ব্যাটল অব চিলি—তিন পর্বের এক ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র, যেখানে সালভাদর আয়েন্দের সরকারের শেষ দিনগুলো এবং ১৯৭৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থান নথিবদ্ধ হয়েছে। চলচ্চিত্রটির নির্মাণে ফরাসি নির্মাতা ক্রিস মার্কারের সহযোগিতাও ছিল। ১৯৭৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি প্রদর্শিত হয়।
পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতে গুসমান ইতিহাসের আরও গভীরে গেছেন। দ্য পিনোশে কেস (২০০১), সালভাদর আয়েন্দে (২০০৪), নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট (২০১০), দ্য পার্ল বাটন এবং দ্য কর্ডিলেরা অব ড্রিমস—সবখানেই স্মৃতি ও ইতিহাস তাঁর প্রধান অনুসন্ধানের বিষয়। বিশেষ করে নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট-এ আতাকামা মরুভূমির নক্ষত্রপানে তাকানো জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে নিখোঁজ রাজনৈতিক বন্দীদের পরিবারের অনুসন্ধানকে পাশাপাশি স্থাপন করেছেন।
গুসমানের কাছে ক্যামেরা যেন শুধু দৃশ্য ধারণের যন্ত্র নয়—এটি বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির এক দীর্ঘ সাক্ষ্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









