একটি ছোট্ট ঘনক। ছয়টি মুখ, ছয় রং। হাতে নিলে মনে হয়, এটি বুঝি নিছক একটি খেলনা। কিন্তু একটু ঘোরালেই রংগুলো নিজেদের জায়গা হারায়। তখন শুরু হয় পথ খোঁজা—কোন দিকে ঘোরালে আবার সবকিছু আগের মতো হবে?
চীনের ছয় বছর বয়সী লিয়ান ইউনঝি সেই পথটি খুঁজে নিতে পারেন মাত্র চার সেকেন্ডের কিছু বেশি সময়ে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শিশু চলতি মাসে দুবার নারীদের ৩×৩ রুবিকস কিউব ‘অ্যাভারেজ’ বিশ্ব রেকর্ড ভেঙেছে। উহান ও গুয়াংজৌয়ে ওয়ার্ল্ড কিউব অ্যাসোসিয়েশন অনুমোদিত দুটি প্রতিযোগিতায় পাঁচবার করে কিউব সমাধান করে তার গড় সময় ছিল ৪ দশমিক ৫২ এবং ৪ দশমিক ২৭ সেকেন্ড। দ্বিতীয় সময়টিই তাকে সাড়ে চার সেকেন্ডের নিচে গড় করা প্রথম নারী ‘স্পিডকিউবার’ করেছে বলে জানিয়েছে সিসিটিভি।
চার সেকেন্ড—একটি পাখির ডানা ঝাপটানোর মতো ক্ষণস্থায়ী। একটি দীর্ঘশ্বাসের চেয়েও হয়তো কম। অথচ এই সময়ের মধ্যে লিয়ানের হাত জানে কোন দিকে যেতে হবে।
প্রতিযোগিতার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাথায় লাল-সাদা চেকের ফিতা, হাতে রুবিকস কিউব। তার আঙুল দ্রুত ঘুরছে। এক মুখ, তারপর আরেক মুখ। যেন ছোট্ট একটি মাঠের ওপর দিয়ে কেউ খুব পরিচিত পথে হেঁটে যাচ্ছে। শেষ ঘূর্ণনের পর কিউবটি টেবিলে রাখা হয়। লিয়ান হাততালি দেয়, আনন্দে মুষ্টি উঁচু করে।
তার আনন্দটি সরল। কিন্তু তার কাজটি সরল নয়।
চেংদুর এই শিশুটিকে পরিবারে ডাকা হয় ‘ঝিঝি’ নামে। তার মা লিন ইয়াংসি জানিয়েছেন, নাচ, গানসহ আরও কয়েকটি সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি মেয়েকে রুবিকস কিউব শেখার একটি ক্লাসে ভর্তি করানো হয়েছিল। পরে তিনি বুঝতে পারেন, কিউব সমাধানের অনুশীলন শিশুর মনোযোগ, স্মৃতি, যুক্তিবোধ এবং স্থানিক ধারণা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তখন ধীরে ধীরে মেয়ের অনুশীলনের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়।
এখন লিয়ানের আয়ত্তে রুবিকস কিউব সমাধানের ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি অ্যালগরিদম। প্রতিদিন সে দুই থেকে তিন ঘণ্টা অনুশীলন করে।
সংখ্যাটি শুনলে বিস্ময় জাগে। ছয় বছরের একটি শিশুর দিনও তো আমাদের দিনের মতোই—সকাল আসে, দুপুর যায়, সন্ধ্যায় আলো বদলায়। তারও হয়তো খেলতে ইচ্ছে করে, ক্লান্ত লাগে, জানালার বাইরে তাকাতে ভালো লাগে। সেই একই দিনের ভেতর সে দুই-তিন ঘণ্টা কাটায় একটি ছোট ঘনকের সঙ্গে।

আর সেই ঘনক তাকে শেখায়—সব পথ এক নয়।
একটি ভুল ঘূর্ণন রংগুলোকে আরও দূরে সরিয়ে দিতে পারে। আবার ঠিক একটি ঘূর্ণন, সঠিক সময়ে, তাকে সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ যেন জীবনেরই ছোট্ট অনুশীলন: আমরা সব সময় জানি না কোন পথটি সঠিক, কিন্তু হাঁটতে হাঁটতেই কখনো পথ চিনে ফেলি।
লিয়ানের মা মনে করেন, রুবিকস কিউব সমাধান শুধু সূত্র মুখস্থ করার ব্যাপার নয়। যুক্তি দিয়ে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান খুঁজে নেওয়াই আসল। এতে মনোযোগ ও স্মৃতির পাশাপাশি জয়-পরাজয়কে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার অভ্যাসও তৈরি হয়।
বাড়ির একটি তাকে রাখা লিয়ানের ট্রফিগুলো যেন সেই দীর্ঘ অনুশীলনের নীরব সাক্ষী। প্রতিটি ট্রফির সঙ্গে আছে বহুবার ব্যর্থ হওয়া, আবার শুরু করা, একই ঘূর্ণন বারবার অনুশীলন করা। আমরা সাধারণত রেকর্ডের সময়টি দেখি; কিন্তু রেকর্ডের পেছনে যে অসংখ্য সাধারণ দিন থাকে, সেগুলো চোখে পড়ে না।
হয়তো সেখানেই এই শিশুটির গল্পের আসল সৌন্দর্য।
কারণ রেকর্ড স্থায়ী নয়। আজ ৪ দশমিক ২৭ সেকেন্ড, কাল হয়তো তার চেয়েও কম সময় কেউ কিউবটি সমাধান করবে। একটি রেকর্ডের জন্মের মধ্যেই তার ভবিষ্যৎ ভাঙনের সম্ভাবনা থাকে।
তবু পথটি থেকে যায়।
একটি ছোট ঘনক, ছয়টি রং, অসংখ্য ভুল ও সঠিক ঘূর্ণন। তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছয় বছরের একটি শিশু ধীরে ধীরে শিখছে—অগোছালো জিনিসের মধ্যেও একটি বিন্যাস থাকে, আর সেই বিন্যাসে পৌঁছানোর জন্য কখনো কখনো শুধু ধৈর্য ধরে আরও একবার চেষ্টা করতে হয়।
হয়তো এ কারণেই রুবিকস কিউবের দিকে তাকালে খেলনার চেয়ে একটু বেশি কিছু দেখা যায়। দেখা যায় একটি ছোট পৃথিবী, যেখানে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যেতে পারে, কিন্তু হাল ছেড়ে না দিলে আবার রংগুলো নিজেদের জায়গায় ফিরে আসে।
লিয়ান সেই ছোট পৃথিবীর পথ চিনে ফেলেছে। এখন তার সময়—চার সেকেন্ডের একটু বেশি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









