পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সক্রিয়ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং একই সঙ্গে রাশিয়ার কথিত হুমকির মিথ ছড়িয়ে দিচ্ছে। আজ অধিকাংশ পশ্চিমা দেশের শাসকগোষ্ঠী রাশিয়ার কাছ থেকে আসা হুমকির মিথ ছড়িয়ে দিতে চাইছে। একই সঙ্গে তারা রাশিয়ার দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় মূল্যবোধ ধ্বংসের অভিযোগও করছে। কিন্তু এসব মূল্যবোধ আসলে কী, তা রাশিয়ার মানুষ দেখতে পাচ্ছে। কথিত ইউরোপীয় মূল্যবোধ-এর অর্থ একটাই-ইউরোপ আবারও নাৎসিবাদকে সমর্থন করতে প্রস্তুত। তবে নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও নাগরিকদের কল্যাণের ক্ষেত্রে রাশিয়ার সামনে যেসব বহিরাগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলোর যথাযথ জবাব দেওয়ার পথ মস্কো অবশ্যই খুঁজে নেবে।
যারা এসব কর্মকাণ্ডের উদ্যোগ নিচ্ছে, তারা অবশ্যই দায়িত্বহীন রুশবিরোধী পদক্ষেপের পরিণতির জন্য দায়ী থাকবে। যদিও ইউক্রেনে যুদ্ধের অবসানের কোনো কার্যকর পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না। শীত সামনে রেখে রাশিয়া বেসামরিক মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা আরো জোরদার করছে। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন পরাজয় স্বীকার করার চেয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকেই বেশি পছন্দ করছেন। ইউক্রেন এখন এমন এক শীতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে রুশ বিমান হামলা দেশটির বেসামরিক জনগণ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আরো ভয়াবহ চাপ তৈরি করতে পারে।
বিদ্যুৎ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোয় হামলার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। রাশিয়ার এই ধারাবাহিক হামলা শুধু সামরিক অভিযান নয়; ইউক্রেনের প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে দেওয়ার জন্য ভয় ও দুর্ভোগকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার জন্য ক্ষয়ক্ষতি ও চাপ বাড়লেও পুতিন নিজের পরাজয় মেনে নেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং ইউক্রেনের প্রতিরোধকে দুর্বল করে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে সংঘাত একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। এ অবস্থায় পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান ও অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ইউক্রেনকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি পূরণ করতে পুরোপুরি সক্ষম হয়নি। ফলে রুশ হামলার মুখে ইউক্রেনের সামরিক ও প্রতিরক্ষাগত সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইউক্রেনের মানুষ শান্তি চান; কিন্তু সেই শান্তির বিনিময়ে তারা নিজেদের ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে রাজি নন। যুদ্ধ বন্ধের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও টেকসই শান্তির জন্য এমন কোনো সমাধান প্রয়োজন, যা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে উপেক্ষা করবে না। ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে গাজা ও ইরানের সংঘাতে সহিংসতা দীর্ঘায়িত হওয়ার একটি কারণ হলো কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য শান্তি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক বাধ্যবাধকতার প্রতি দায়বদ্ধতার ঘাটতি এবং জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতিও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে ন্যাটো ও পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর আরো দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতার বিরুদ্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি, যাতে মস্কোর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ কমানো যায়। কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থেকে যুদ্ধের অবসান ঘটানো কঠিন হতে পারে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ সংঘাত আরো বাড়িয়ে দিতে পারে কিনা, সে ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা দেশগুলো যদি দ্বিধাগ্রস্ত থাকে এবং রাশিয়ার ওপর কার্যকর চাপ তৈরি করতে না পারে, তাহলে ইউক্রেনে যুদ্ধ আরো দীর্ঘ হতে পারে এবং বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ বাড়তে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধকে অনির্দিষ্টকাল চলতে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। পুতিনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সংকল্পের বিপরীতে পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলোর আরো ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন। ন্যাটোকে এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যা একদিকে ইউক্রেনের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াবে এবং অন্যদিকে রাশিয়াকে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার মূল্য সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দেবে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরো তীব্র করার এবং ইউরোপে কিয়েভের মিত্র দেশগুলোর ওপর হাইব্রিড হামলা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমনটাই দাবি পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের। তাঁরা মনে করছেন, এই সপ্তাহান্তে রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর দেশটি একটি ‘গোপন সেনা সমাবেশ’ শুরু করার ভিত্তি তৈরি করছে। এই নির্বাচনের পর হাজার হাজার রুশ নাগরিককে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হতে পারে। পশ্চিমা একটি দেশের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘আমরা যা দেখছি, তা হলো এমন প্রশাসনিক প্রস্তুতি, যাতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এটি করা সম্ভব হয়।’
এদিকে ইউরোপের নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিমের বিরুদ্ধে ক্রেমলিনের হাইব্রিড যুদ্ধ আরো তীব্র হতে পারে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, পুতিন এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে এসেছে। সূত্রগুলোর দাবি ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর ১৫ লাখ সদস্য হতাহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৫ লাখ নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। তবে এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পুতিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় অর্থবহ শান্তি আলোচনায় যাওয়ার পরিবর্তে যুদ্ধ আরো বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে বড়সংখ্যক সেনা প্রত্যাহারের কথা বিবেচনা করছে বলে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়ে যায়।
ধারণা করা হচ্ছে, পেন্টাগন ইউরোপ থেকে ২৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেনা সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সামরিক বিমান, জাহাজ ও অস্ত্রও মহাদেশটি থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র এসব খবর অস্বীকার করেছে। তবে সামরিক জোট ন্যাটোর সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মার্কিন সেনা মোতায়েনের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছে সামরিক জোটটি। ইউরোপের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে বলছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ন্যাটোর ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে আরো সমন্বিত এবং ক্রমশ প্রকাশ্য হয়ে ওঠা অভিযানের পূর্বাভাস হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
এই ধরনের অভিযান নির্বাচন শেষ হওয়ার পর শুরু হতে পারে। পুতিন যদি সেনা সমাবেশের নির্দেশ দেন, তাহলে এর উদ্দেশ্য শুধু ইউক্রেনে সেনা পাঠানো নাও হতে পারে। ইউরোপকেও এর লক্ষ্য করা হতে পারে। এর মাধ্যমে রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্তে ন্যাটোর সঙ্গে সংলগ্ন এলাকায় নতুন ঘাঁটিতে সেনা মোতায়েনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা শিল্পকে সম্ভাব্য নাশকতা থেকে রক্ষার জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড তুস্ক সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনকে সমর্থনকারী দেশগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিকল্পনা করছে।
তার দাবি, মস্কো এসব ঘটনাকে দুর্ঘটনাজনিত বলে বর্ণনা করার পরিকল্পনা করছে, যাতে ন্যাটো জোটকে পরীক্ষা করা যায়। রাশিয়ার কারণে ইউরোপের জন্য বাড়তে থাকা হুমকি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মাখোঁ বলেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউরোপীয়দের এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হাইব্রিড হুমকি আরো তীব্র হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো আমাদের ভয় দেখানো এবং ইউক্রেনকে সমর্থনের প্রচেষ্টা ভেঙে দেওয়া। এর ফল হবে ঠিক উল্টো। এদিকে মস্কো সতর্ক করে বলেছে, ইউক্রেনে ব্রিটিশ কোনো স্থাপনা যদি রাশিয়ার বিরুদ্ধে দূরপাল্লার হামলায় সহায়তা করার কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পুতিনের চার বছর আগে শুরু করা হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধে ইউক্রেনকে ব্রিটেনের সমর্থনের বিষয়ে অভিযোগ জানাতে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মস্কোতে ব্রিটেনের ডেপুটি হেড অব মিশন ডানাই ঢোলাকিয়াকে তলব করে। ব্রিটিশ এই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিককে সতর্ক করে বলা হয়, ব্রিটেনের বিরুদ্ধে রাশিয়া ‘প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা’ নিতে পারে। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এর আগে দেওয়া একই ধরনের হুমকির সঙ্গে এই সতর্কবার্তার মিল রয়েছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র এই তলবকে ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার বর্বর পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া এবং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাজ্যকে হেয় করার আরেকটি চেষ্টা’ বলে বর্ণনা করেছেন। চলতি মাসে ব্রিটেন ঘোষণা করেছে, এই শীতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে তারা ১০ কোটি পাউন্ড দেবে। এর মধ্যে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংকশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব-২০২৬-এ স্বাক্ষর করেন। বিলটির নাম রাখা হয়েছে, দক্ষিণ ক্যারোলিনার প্রয়াত সিনেটর এবং রাশিয়াবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত লিন্ডসে গ্রাহামের নামে, যিনি জুলাইয়ে মারা যান। এই আইনের মাধ্যমে মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে বিদ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও বাড়ানো হয়েছে। ইউক্রেন ইউরোপীয় মূল্যবোধ রক্ষা করছে- এ কথা পশ্চিমা দেশগুলো যে গর্বের সঙ্গে বলছে, সেটি পশ্চিমের জন্য লজ্জাজনক। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত থাকলেও দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে এর এখন পর্যন্ত কোনো বাস্তব প্রভাব পড়েনি এবং অদূর ভবিষ্যতেও তেমন কোনো প্রভাব প্রত্যাশিত নয়। আসন্ন স্টেট ডুমা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা প্রচারণার বড় ধরনের ঢেউ চলছে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমানে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক ও আগ্রাসী অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত আঞ্চলিক অখণ্ডতার নীতিকে পশ্চিমারা একমাত্র নীতি হিসেবে সমর্থন করে।
কিন্তু সনদে আরো অনেক বিষয় রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। জাতিসংঘ সনদের প্রথম অনুচ্ছেদেই এমন নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে, যা সনদে স্বাক্ষরকারী সব সদস্য রাষ্ট্রকে দিতে হবে- জাতি, লিঙ্গ, ভাষা ও ধর্ম নির্বিশেষে মানবাধিকারের প্রতি সম্মান। আর তবেই হয়ত পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা যেতে পারে।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









