একটি জাতিকে দুর্বল করার জন্য সবসময় যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ কিংবা মহামারির প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি অদৃশ্য বিষই যথেষ্ট। যে বিষ চোখে দেখা যায় না, গন্ধে ধরা পড়ে না, অথচ ধীরে ধীরে শিশুর মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র ও বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশে সীসা দূষণের ভয়াবহ চিত্র এখন সেই অদৃশ্য বিপদেরই সংকেত দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো- শিশুর রক্তে যখন বিষ ঢুকছে, তখন আমরা আর কত দিন নীরব থাকব?
সাম্প্রতিক জাতীয় সমীক্ষার তথ্য বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের একটি বড় অংশের রক্তে অতিরিক্ত মাত্রায় সীসা রয়েছে। গর্ভবতী নারীরাও এই ঝুঁকির বাইরে নন। ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের হার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অর্থাৎ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দেশের জনস্বাস্থ্যের ওপর ধীরে ধীরে বিস্তৃত একটি সংকট। সীসার বিপদ আরো ভয়াবহ। কারণ, এর ক্ষতি অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না।
একটি শিশু হয়ত স্বাভাবিকভাবেই খেলছে, স্কুলে যাচ্ছে; কিন্তু তার শরীরে জমতে থাকা সীসা তার শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ, আচরণ ও স্নায়বিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। গর্ভাবস্থায় সীসার সংস্পর্শ মা ও অনাগত শিশুর জন্যও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ ক্ষতিটা শুধু আজকের নয়- এর ছায়া বিস্তৃত হতে পারে একটি শিশুর পুরো জীবনজুড়ে। সবচেয়ে বিব্রতকর বিষয়, এই বিষের অনেক উৎস আমাদের চোখের সামনেই। আবাসিক এলাকার পাশে অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং, নিম্নমানের রং, দূষিত মসলা, কিছু ভোগ্যপণ্য ও ই-বর্জ্য- বিভিন্ন পথেই সীসা মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। অথচ প্রশ্ন থেকেই যায়- এসব কার্যক্রম বছরের পর বছর কীভাবে মানুষের বসতবাড়ির পাশে চলতে পারে? বাজারে ক্ষতিকর পণ্য কীভাবে পৌঁছায়? নিয়মিত নজরদারি কোথায়?
আইন আছে, নিষেধাজ্ঞা আছে, নীতিমালাও আছে। কিন্তু আইনের কার্যকর প্রয়োগ না থাকলে কাগজের বিধিনিষেধ মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে না। অবৈধ ব্যাটারি কারখানা উচ্ছেদ করে আবার যদি একই জায়গায় নতুন কারখানা গড়ে ওঠে, তাহলে অভিযান কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যে ক্ষতিকর উপাদান নিষিদ্ধ থাকলেও বাজারে তার উপস্থিতি পাওয়া গেলে বুঝতে হবে নজরদারির কোথাও বড় ঘাটতি রয়েছে।
এখন প্রয়োজন দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। কোন এলাকায় সীসার ঝুঁকি বেশি, কোন শিল্প বা পণ্যে ঝুঁকি বেশি, কত শিশু আক্রান্ত- এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শিশু ও গর্ভবতী নারীদের স্ক্রিনিং বাড়াতে হবে। অবৈধ ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য, রং, খেলনা ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের মান পরীক্ষায় কঠোরতা আনতে হবে।
শুধু অভিযান নয়, অপরাধ পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, সীসা দূষণের ক্ষতি এমন এক ঋণ, যার বোঝা আজকের শিশুকে আগামীকাল বহন করতে হতে পারে। একটি শিশুর হারানো বিকাশ, শেখার ক্ষমতা বা সম্ভাবনাকে পরে কোনো ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুরোপুরি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব করা যায়; কিন্তু একটি শিশুর নষ্ট হয়ে যাওয়া সম্ভাবনার মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।
তাই সীসা দূষণকে আর ‘পরিবেশের সমস্যা’ বলে পাশে সরিয়ে রাখার সুযোগ নেই। এটি শিশু অধিকার, জনস্বাস্থ্য এবং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র তার শিশুদের রক্তে বিষ ঢোকার পথ বন্ধ করতে পারে না, তার উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই বড় হোক, সেই উন্নয়নের ভিত নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়- আমরা কি দূষণের উৎস বন্ধ করব, নাকি আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা গুনে গুনে ভবিষ্যতের ক্ষতির হিসাব করব? রাষ্ট্রের দায়িত্ব দ্বিতীয়টি নয়, প্রথমটি নিশ্চিত করা। শিশুর রক্ত পরীক্ষার আগে পরিবেশ পরীক্ষা করতে হবে; বিষক্রিয়ার চিকিৎসার আগে বিষের উৎস বন্ধ করতে হবে। কারণ, আগামী প্রজন্মকে বাঁচানোর সময় ‘একদিন’ নয়- সময় এখনই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









