কিছু সিনেমা শুধু গল্প বলে না, জীবনের একটা সময়কে ধরে রাখে। বন্ধুত্ব, ভ্রমণ, ভয়, ভালোবাসা আর নিজের মুখোমুখি হওয়ার গল্প নিয়ে ১৫ বছর আগে তেমনই এক সিনেমা এসেছিল—‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’। সময় পেরিয়েছে, দর্শকের বয়স বেড়েছে, চরিত্রগুলোও যেন স্মৃতির পাতায় আরও প্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই এত বছর পরও সেই তিন বন্ধুর আবার পর্দায় ফেরার অপেক্ষা শেষ হয়নি।
সম্প্রতি ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’র ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে মুনসন ফিল্ম ফেস্টিভালে অনুপমা চোপরার সাথে এক আলোচনায় পরিচালক জোয়া আখতার সিনেমাটির নানা অজানা গল্প শেয়ার করেছেন। সেখানেই জানালেন সবচেয়ে বড় চমক—সিক্যুয়েল নিয়ে কাজ চলছে।
‘আমরা কাজ করছি’
পাঁচ বছর আগে সিক্যুয়েল নিয়ে কথা বলেছিলেন জোয়া। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি ও লেখক রিমা কাগতি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন এবং ফারহান আখতারের কাছে নাকি পুরো একটি গল্পও রয়েছে।
এবারও সিক্যুয়েল নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন জোয়া। তার ভাষায়, “আমরা কাজ করছি। এভাবেই বলা যায়, আমরা কাজ করছি।”
তবে এখনই কিছু নিশ্চিত করতে চান না পরিচালক। তাঁর মতে, এই চরিত্রগুলোকে আজকের সময়ে ফিরিয়ে এনে গল্পটি ঠিকভাবে বলা সম্ভব কি না, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারলে তবেই সিনেমাটি হবে।
জোয়া আরও জানান, ইয়াস আইল্যান্ডের একটি বিজ্ঞাপনে ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’র তিন চরিত্রকে একসঙ্গে দেখার পর দর্শকদের পুরোনো স্মৃতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। অনেকে সেটিকে সিনেমার ট্রেলার ভেবেছিলেন। পরে বোঝা যায়, সেটি শুধু একটি বিজ্ঞাপন। এতে দর্শকদের হতাশার কথাও মজা করে উল্লেখ করেন জোয়া।
কেন সিনেমাটি এত বিশেষ?
‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’র অন্যতম শক্তি ছিল এর চরিত্রগুলোর অতীত। জোয়া জানান, সিনেমার তিন প্রধান চরিত্র—অর্জুন, ইমরান ও কবির—সম্পর্কে তিনি ও রিমা বিস্তারিত ইতিহাস লিখেছিলেন।
সেই ইতিহাসের অনেক কিছুই সিনেমায় সরাসরি দেখানো হয়নি। কে কোথায় বড় হয়েছে, তার পরিবার কেমন ছিল, স্কুলজীবনে তাদের সম্পর্ক কেমন ছিল—সবকিছুরই আলাদা ব্যাকস্টোরি তৈরি করেছিলেন তিনি।
উদাহরণ হিসেবে জোয়া জানান, অর্জুনের বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা ঋণের মধ্যে পড়ে যান। সবকিছু বিক্রি করে অর্জুনকে মামার বাড়িতে যেতে হয়। অন্যদিকে ইমরান ও অর্জুনের বন্ধু কবির বড় হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে।
এই অতীতগুলো দর্শক সরাসরি না জানলেও চরিত্রগুলোর আচরণে তার প্রভাব দেখা যায়। জোয়ার মতে, একজন অভিনেতা যখন চরিত্রের পুরো ইতিহাস জানেন, তখন সেই ইতিহাস পর্দায় না বলেও দর্শক তার অনুভূতি টের পান।
ঋত্বিক-ক্যাটরিনার নাচ কেন হলো না?
সিনেমায় ঋত্বিক রোশন ও ক্যাটরিনা কাইফের জুটি তখন ছিল দারুণ জনপ্রিয়। ফলে তাদের একসঙ্গে একটি গান থাকাটা বাণিজ্যিকভাবে খুব স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত হতে পারত।
কিন্তু জোয়া তা করেননি।
তিনি বলেন, নির্মাতাদের অনেকেই চেয়েছিলেন ঋত্বিক ও ক্যাটরিনাকে একসঙ্গে নাচাতে। এমনকি সমুদ্রসৈকতে একটি গান করার কথাও উঠেছিল। কিন্তু জোয়ার মনে হয়েছিল, গল্পের মধ্যে সেটি স্বাভাবিকভাবে বসছে না।
তাই শুধু তারকা জুটির জনপ্রিয়তার জন্য তিনি দৃশ্যটি যোগ করেননি। তাঁর কাছে গল্পের প্রয়োজনই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গাড়ির দৃশ্যে তারকারাই চালিয়েছেন গাড়ি
সিনেমার বেশ কিছু গাড়ির দৃশ্যেও ছিল আলাদা অভিজ্ঞতা। প্রথমে ‘লো লোডার’ নামের বড় ট্রাকের ওপর গাড়ি রেখে শুটিং করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু জোয়ার কাছে দৃশ্যগুলো কৃত্রিম মনে হয়।
শেষ পর্যন্ত ঋত্বিক, ফারহান ও অভয় দেওল নিজেরাই গাড়ি চালিয়ে অনেক দৃশ্যে অভিনয় করেন। শুটিংয়ের সময় কখনো কখনো সেটআপ এতটাই ছোট ছিল যে গাড়ির ভেতরে থাকতেন তিন অভিনেতা, সাউন্ড টিম, ক্যামেরা ও প্রয়োজনীয় কয়েকজন সদস্য।
অভিনেতারাই নিজেদের চুল-মেকআপ সামলে নিতেন। জোয়া শুধু প্রয়োজনমতো টাচ-আপ দিতেন। ফলে শুটিং অনেকটা বন্ধুদের সত্যিকারের রোড ট্রিপের মতো হয়ে উঠেছিল।

ক্যাটরিনার সেই চুম্বন
লাইলার চরিত্রে ক্যাটরিনা কাইফের একটি চুম্বনের দৃশ্যও সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
জোয়া জানান, ক্যাটরিনা তখন আগে কখনো পর্দায় চুম্বন করেননি। কিন্তু দৃশ্যটি পড়ে তিনি বুঝেছিলেন, গল্পের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।
জোয়ার ব্যাখ্যায়, অর্জুন যেন ঘুমিয়ে থাকা একজন মানুষ, আর লায়লা তাকে বাস্তব জীবনের দিকে জাগিয়ে তোলে। তাই বিদায়ের আগে লায়লার সেই হঠাৎ সিদ্ধান্ত চরিত্রটির স্বভাবের সঙ্গেও মিলে যায়।
আসল ষাঁড় নিয়ে শুটিং
স্পেনের পামপ্লোনায় ষাঁড় দৌড়ের দৃশ্যের শুটিং ছিল পুরো সিনেমার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোর একটি। সেখানে ব্যবহার করা হয়েছিল ১২টি ষাঁড়।
জোয়া জানান, তিনি নিজেকে সেটের সবচেয়ে ছোট মানুষ মনে করছিলেন। সঙ্গে ছিল পাঁচটি ক্যামেরা, অসংখ্য কর্মী এবং স্প্যানিশ স্টান্ট টিম।
মজার বিষয়, স্থানীয় স্টান্ট দলের সদস্যরা প্রথমে বুঝতেই চাইছিলেন না যে জোয়া পরিচালক। তারা বারবার ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে কথা বলছিলেন। পরে জোয়াকে স্পষ্ট করে বলতে হয়েছিল—“আমি পরিচালক, উনি আমার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করেন।”
সেই দৃশ্যের মাত্র একটি শটেই CGI ব্যবহার করা হয়েছিল।
১৬ টন টমেটো এসেছিল পর্তুগাল থেকে
‘টোমাটিনা’ উৎসবের দৃশ্যও ছিল বিশাল আয়োজন। স্পেনের বুনিওলে বাস্তব উৎসবের জায়গাতেই শুটিং করা হয়েছিল।
কিন্তু সমস্যা হলো—শুটিংয়ের সময় পর্যাপ্ত টমেটো পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই প্রায় ১৬ টন টমেটো পর্তুগাল থেকে আনা হয়েছিল।
জোয়া জানান, প্রযোজক রিতেশ সিধওয়ানি এই বিশাল আয়োজনের দায়িত্ব সামলেছিলেন। পুরো বিষয়টি ছিল ব্যয়বহুল, কিন্তু দৃশ্যটি বাস্তবসম্মত করার জন্য সেটি প্রয়োজন ছিল।

‘নাতাশা খারাপ ছিল না’
বছর পেরিয়ে ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’র চরিত্রগুলোকে দর্শক নতুন চোখে দেখতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে কল্কি কোয়েচলিনের নাতাশা চরিত্র নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।
জোয়ার মতে, নাতাশাকে কখনোই খলনায়িকা হিসেবে লেখা হয়নি।
তিনি বলেন, নাতাশা খুব পরিষ্কারভাবে জানত সে কী চায়—বিয়ে, সংসার, একটি নির্দিষ্ট জীবন। কিন্তু কবির তখন সেই জায়গায় পৌঁছাতে প্রস্তুত ছিল না। তাদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে নাতাশা খারাপ।
জোয়ার ভাষায়, দুজনের চাওয়া একে অপরের সঙ্গে মেলেনি—এটাই মূল কথা।
বাবা-মা, সন্তান এবং অসম্পূর্ণ সম্পর্ক
সিনেমার ইমরান ও তার বাবা নাসিরের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন জোয়া। তাঁর মতে, বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত আমাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু সব সম্পর্ককে সাদা-কালো করে বিচার করা যায় না।
নাসিরের নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে তার সিদ্ধান্ত হয়তো যুক্তিযুক্ত। কিন্তু ইমরানের দৃষ্টিতে সেটিই হয়ে উঠেছে বড় এক ক্ষত।
এই কারণেই জোয়া সেই দীর্ঘ দৃশ্যে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করতে চাননি। তাঁর যুক্তি, মিউজিক দিয়ে দর্শককে বলে দেওয়া হয়—কোথায় কাঁদতে হবে, কোথায় উত্তেজিত হতে হবে। তিনি বরং দর্শককে নিজের মতো করে অনুভব করার সুযোগ দিতে চেয়েছেন।
শুটিংয়ের সময়ও বদলেছে দৃশ্য
জোয়া জানান, শুটিংয়ের আগে স্ক্রিপ্ট প্রস্তুত থাকলেও প্রয়োজন হলে পরিবর্তন করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কবিরের একটি দৃশ্যে ঋত্বিক নিজেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে তার চরিত্রকে যেন প্রত্যাখ্যাত হতে দেখানো হয়। এতে চরিত্রটি আরও বিব্রত ও মানবিক মনে হবে। প্রস্তাবটি জোয়ার পছন্দ হয় এবং দৃশ্যটি বদলে দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, অভিনেতাদের ভাবনাকেও তিনি জায়গা দেন—যদি তা গল্পকে আরও ভালো করে।
রিমা কাগতির সঙ্গে সম্পর্ক: এখন ঝগড়া নয়, বিশ্বাস।
জোয়া ও রিমা কাগতির দীর্ঘদিনের লেখক-সহযোগিতা নিয়েও কথা ওঠে।
জোয়া বলেন, ক্যারিয়ারের শুরুতে তারা লেখালেখি নিয়ে প্রচুর ঝগড়া করতেন। এখন সেই সম্পর্ক অনেক বেশি পরিণত। তারা এখনও অনেক বিষয়ে মতবিরোধ করেন, কিন্তু লেখালেখি নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর বিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
একজন বললে কোনো দৃশ্য কাজ করছে না, অন্যজন সেটি গুরুত্ব দিয়ে শোনেন। কারণ দুজনেই জানেন—কোনো ধারণা যদি দুজনকেই উত্তেজিত না করে, তাহলে সেটিকে জোর করে স্ক্রিপ্টে রাখার দরকার নেই।
‘কোনো বয়সে এসে বড় হয়ে যাওয়া শেষ হয় না’
জোয়ার কাছে ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’র অন্যতম বড় কথা হলো—বয়স বাড়লেই মানুষ পরিণত হয়ে যায় না। জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই নতুন করে শেখার সুযোগ থাকে।
তিনি মনে করেন, পৃথিবী বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, সিনেমা বানানোর মাধ্যম বদলাচ্ছে। কিন্তু গল্প বলার মূল বিষয় বদলায় না।
একজন নির্মাতার কাজ হলো গল্পের প্রয়োজন বুঝে নতুন মাধ্যমকে ব্যবহার করা—প্রযুক্তির পেছনে ছোটা নয়।
এবার কি সত্যিই ফিরবে তিন বন্ধু?
সবশেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত প্রশ্নটাই থেকে যায়—অর্জুন, ইমরান ও কবির কি আবার একসঙ্গে ফিরবে?
জোয়ার উত্তর খুব ছোট, কিন্তু আশাব্যঞ্জক: “আমরা কাজ করছি।”
তিনি এখনই গল্প, চরিত্র বা অভিনেতাদের নিয়ে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে চাননি। তবে ১৫ বছর পরও যদি এই তিন বন্ধুর গল্প দর্শকদের মনে এতটা জায়গা করে থাকে, তাহলে তাদের আবার পর্দায় ফেরানোর সম্ভাবনাও যে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না—এটাই এই আলোচনার সবচেয়ে বড় বার্তা।
হয়তো আবারও তিন বন্ধু রওনা হবে অচেনা কোনো পথে। হয়তো এবার তাদের বয়স বেড়েছে, জীবনের হিসাব বদলেছে, কিন্তু বন্ধুত্বের জায়গাটা একই রয়ে গেছে।
আর সেই কারণেই ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’র পরের অধ্যায়ের অপেক্ষা এত দীর্ঘ হলেও, এতটা সুন্দর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









