এক বছরে চার-পাঁচটি আলোচিত সিনেমায় অভিনয় করা যেকোনো অভিনেতার জন্যই বড় ঘটনা। কিন্তু সান্দ্রা হুলারের কাছে বিষয়টি যতটা না তারকাখ্যাতির, তার চেয়ে বেশি কাজের বৈচিত্র্যের। জার্মান এই অভিনেত্রীকে এ বছর দেখা যাবে এমন কিছু সিনেমায়, যেগুলোর গল্প, নির্মাণশৈলী ও দর্শক আলাদা। ইউরোপীয় সিনেমা থেকে হলিউডের বড় আয়োজন—সবখানেই তার উপস্থিতি। তবু নিজেকে বিশেষ কেউ ভাবতে স্বচ্ছন্দ নন তিনি।
‘নিজেকে বিশেষ কেউ হিসেবে দেখতে আমার কষ্ট হয়’—সান্দ্রার এই স্বীকারোক্তি যেন তার ব্যক্তিত্বেরই প্রতিচ্ছবি। পর্দায় তিনি যতটা শক্তিশালী, বাস্তব জীবনে ততটাই সংযত। অভিনয়ের সাফল্য তাঁকে আলোচনায় এনেছে, কিন্তু সেই আলোয় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চান না এই অভিনেত্রী।
এক বছরে এত সিনেমা
এ বছরের আলোচিত সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফাদারল্যান্ড’, ‘রোজ’ ও ‘ডিগার’। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিনির্ভর হলিউডের সিনেমা ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’তেও তার উপস্থিতি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে দর্শকের। এ ছাড়া মার্ভেলের বহুল আলোচিত ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’ সিনেমায় তার সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও তৈরি হয়েছে কৌতূহল।
একই বছরে এতগুলো বড় প্রকল্পে যুক্ত থাকা কেবল ব্যস্ততার গল্প নয়; বরং একজন অভিনেত্রী হিসেবে সান্দ্রার পরিসর কতটা বিস্তৃত, সেটিও তুলে ধরে। একদিকে ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের গভীর ও জটিল চরিত্র, অন্যদিকে বড় পরিসরের আন্তর্জাতিক সিনেমা—দুই জায়গাতেই নিজের অভিনয় দিয়ে আলাদা হয়ে উঠছেন তিনি।

তবে সান্দ্রার কাছে সিনেমার আকার বা বাজেটই মুখ্য নয়। চরিত্রের গভীরতা, গল্পের বক্তব্য এবং কাজটির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক—এসবই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি এমন মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চান, যাদের জীবন ও সিদ্ধান্ত সহজে একক কোনো ব্যাখ্যায় ধরা যায় না।
পূর্ব জার্মানির স্মৃতি
সান্দ্রা হুলারের বেড়ে ওঠা পূর্ব জার্মানিতে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে কেটেছে তার শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ফলে ইতিহাস, রাষ্ট্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানুষের সামাজিক অবস্থান তার ভাবনায় বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা মানুষকে কীভাবে গড়ে তোলে, সেই প্রশ্ন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতকে কেবল স্মৃতির জায়গা থেকে নয়, বর্তমানকে বোঝার উপায় হিসেবেও দেখেন তিনি। তার অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যেও প্রায়ই মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব, সামাজিক চাপ এবং নৈতিক সিদ্ধান্তের জটিলতা ফুটে ওঠে।
জার্মানির বর্তমান রাজনীতি নিয়েও তার উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান এবং অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দলের মতো শক্তির প্রভাব তাকে ভাবায়। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন, কর্তৃত্ববাদী চিন্তা ও বিভাজনের রাজনীতি সমাজের জন্য কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ফ্যাসিবাদের ইতিহাস তাই তার কাছে শুধু অতীতের অধ্যায় নয়; বর্তমানকেও যাচাই করার একটি মানদণ্ড।
চরিত্রের ভেতরে প্রবেশ
অভিনয়ের ক্ষেত্রে সান্দ্রার শক্তি তার চরিত্র নির্মাণের ধরনে। তিনি চরিত্রকে কেবল ভালো বা মন্দের সরল বিভাজনে দেখতে চান না। বরং একজন মানুষ কেন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেন, তার আচরণের পেছনে কী অভিজ্ঞতা কাজ করে এবং নিজের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব কোথায়—এসব বোঝার চেষ্টা করেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে ভিন্নধর্মী চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। তার অভিনয়ে আবেগের প্রকাশ অনেক সময় সংযত, কিন্তু সেই সংযমের মধ্যেই থাকে গভীরতা। দর্শককে সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়ার বদলে চরিত্রের অনুভূতি উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে তার পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। তবু খ্যাতিকে অভিনয়ের চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখেন না সান্দ্রা। তার কাছে প্রতিটি নতুন কাজ মানে আবারও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া, নতুন একটি চরিত্রকে বোঝা এবং নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা।

তারকাখ্যাতির বাইরে
সান্দ্রা হুলারের সামনে এখন আন্তর্জাতিক সিনেমার বড় সুযোগ। এক বছরে একাধিক আলোচিত চলচ্চিত্রে কাজ করার সুবাদে তাকে ঘিরে প্রত্যাশাও বাড়ছে। কিন্তু তিনি যেন সেই প্রত্যাশার চেয়ে কাজের প্রতিই বেশি মনোযোগী।
নিজেকে বিশেষ কেউ হিসেবে দেখতে না পারার কথাটি তাই শুধু বিনয় নয়, অভিনয় সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিরও ইঙ্গিত দেয়। তারকাখ্যাতি একজন অভিনেতাকে পরিচিতি দিতে পারে, কিন্তু চরিত্রের গভীরে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা দেয় না। প্রতিটি নতুন সিনেমায় সেই কাজটি আবার শুরু করতে হয়।
সান্দ্রা হুলারের এই ব্যস্ত বছর তাকে হয়তো আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেবে। কিন্তু তার আসল পরিচয় সম্ভবত সেখানেই—যেখানে তারকার ঝলকানির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে একজন অভিনেত্রীর অনুসন্ধিৎসা, ইতিহাসবোধ এবং মানুষের জটিল জীবনকে বোঝার নিরন্তর চেষ্টা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









