যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের মধ্যে চলতি বছর বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসছে। ওয়াশিংটন ও সিউলের কর্মকর্তাদের ধারণা, দুই নেতার সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে না। আগামী মাসে চীনে আঞ্চলিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচ ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তাদের মধ্যে চারজন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। অন্যজন দক্ষিণ কোরিয়ার একজন কর্মকর্তা।
ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আবারও আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী। কিন্তু দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগে পিয়ংইয়ংয়ের আগ্রহ কম। ফলে দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্য থাকলেও বাস্তবে আলোচনার পথ এখনো তৈরি হয়নি।
চীনের সম্মেলন ঘিরে অনিশ্চয়তা
আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর চীনের শেনজেনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প ও কিমের বৈঠক হতে পারে বলে আগে ধারণা করা হয়েছিল।
গত আগস্টে ট্রাম্প বলেছিলেন, বছরের শেষ দিকে কিমের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হতে পারে। একই মাসে তিনি দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা তাঁর যোগাযোগের উদ্যোগে সাড়া দিয়েছেন।
গত মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা দেশটির আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছিল, এপেক সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতার বৈঠকের সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। তবে গত সোমবার ট্রাম্প নিজেই এমন বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কিমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো। তবে কেউ বৈঠকের অনুরোধ জানাচ্ছে কি না, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত কাং কিয়ং-হোয়া জানিয়েছিলেন, বৈঠকের বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি হয়নি।
আলোচনার শর্ত নিয়ে প্রশ্ন
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বক্তব্য অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সম্মত হওয়ার ক্ষেত্রে পিয়ংইয়ং কঠোর শর্ত দিতে পারে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টিও থাকতে পারে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এখনো কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই কিমের সঙ্গে আলোচনায় বসতে আগ্রহী। তবে ঘোষণা দেওয়ার মতো কোনো বৈঠক নির্ধারিত হয়নি। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছিলেন, ট্রাম্প আলোচনায় প্রস্তুত এবং এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব উত্তর কোরিয়ার।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের পারমাণবিক নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক অঙ্কিত পান্ডা মনে করেন, এপেক সম্মেলনে দুই নেতার বৈঠকের সম্ভাবনা ১০ শতাংশেরও কম। তাঁর মতে, বৈঠকে রাজি করাতে ওয়াশিংটনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনের সহায়তায় আলোচনার পথ তৈরির চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা হলেও পিয়ংইয়ংকে নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
পারমাণবিক কর্মসূচিই বড় বাধা
কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দুই নেতার সম্ভাব্য বৈঠককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটেছিল যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে। ফলে দুই কোরিয়া এখনো কার্যত যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে।
উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তায় সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ সেনা মোতায়েন রেখেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাবের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়ার হাতে আনুমানিক ৮০ থেকে ১২০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে কিমের সঙ্গে তিনবার বৈঠক হয়েছিল। ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও ওই বৈঠকগুলো থেকে কোনো কার্যকর চুক্তি আসেনি।

দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মিশেল স্টিলও জানিয়েছেন, দুই নেতার বৈঠক কবে হবে, তা তিনি জানেন না। তবে এমন বৈঠক আয়োজন করা সম্ভব হলে খুব অল্প সময়ের নোটিশে ঘোষণা আসতে পারে।
অর্থাৎ, বৈঠকের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার সাড়া, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য এবং নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নের সমাধান ছাড়া ট্রাম্প-কিমের নতুন বৈঠক বাস্তবে রূপ নেওয়া কঠিন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









