ভৌতিক সিনেমা দেখলেই যে ভয় পেতে হবে, এমন নয়। বাস্তব জীবনের নিষ্ঠুরতা, মানুষের অন্ধকার মানসিকতা, অপরাধ, সামাজিক অবিচার কিংবা প্রযুক্তির ভয়াবহ পরিণতিও দর্শকের মনে তৈরি করতে পারে আতঙ্ক। হ্যালোইন উপলক্ষে হরর ঘরানার বাইরে এমনই ভীতিকর ১০টি সিনেমার তালিকা প্রকাশ করেছেন দ্য গার্ডিয়ানের চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখকেরা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) প্রকাশিত ‘আই লেফট শেলশকড: রাইটার্স অন দেয়ার স্ক্যারিয়েস্ট নন-হরর মুভিজ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সিনেমাগুলোর কথা তুলে ধরা হয়েছে। লেখকদের মতে, এসব সিনেমায় প্রচলিত ভৌতিক উপাদান না থাকলেও গল্প, চরিত্র ও বাস্তবতানির্ভর দৃশ্য দর্শকের মনে গভীর আতঙ্ক তৈরি করে।
তালিকায় রয়েছে—
১. বার্নিং (২০১৮)

দক্ষিণ কোরীয় নির্মাতা লি চ্যাং-ডং পরিচালিত এই সিনেমায় এক তরুণীর রহস্যজনক অন্তর্ধান এবং এক ধনী যুবকের সন্দেহজনক আচরণকে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়েছে। সিনেমাটিতে মানুষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, হতাশা ও সহিংস প্রবণতা ধীরে ধীরে প্রকাশ পেয়েছে। রহস্য ও অনিশ্চয়তা দর্শকের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তিকর আতঙ্ক তৈরি করে।
২. দ্য হাঞ্চব্যাক অব নটর ডেম (১৯৯৬)

ডিজনির অ্যানিমেশন সিনেমাটিকে শিশুতোষ বিনোদন মনে হলেও এর গল্পে রয়েছে মানুষের নিষ্ঠুরতা, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র। বিশেষ করে কুঁজো কোয়াসিমোদোকে জনসমক্ষে অপমান ও নির্যাতনের দৃশ্য দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। ধর্মীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষও উঠে এসেছে সিনেমাটিতে।
৩. দ্য স্নাইপার (১৯৫২)

এডওয়ার্ড দিমিট্রিক পরিচালিত এই সিনেমায় নারীদের প্রতি বিদ্বেষে উন্মত্ত এক ব্যক্তির গল্প দেখানো হয়েছে। সে নিজের ঘরের জানালা থেকে রাস্তায় চলাচলকারী নারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পুলিশের কাছে চিঠি লিখে নিজের অপরাধের কথা জানানোর পাশাপাশি তাকে দ্রুত গ্রেপ্তারের অনুরোধও করে। বন্দুক সহিংসতা ও নারীবিদ্বেষের বাস্তবতার সঙ্গে মিল থাকায় সিনেমাটি নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করে।
৪. ২০০১: আ স্পেস ওডিসি (১৯৬৮)

স্ট্যানলি কুবরিক পরিচালিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিনির্ভর এই সিনেমায় মানুষের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং তার সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে। মহাকাশযানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হ্যাল ৯০০০ একপর্যায়ে মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। প্রযুক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা সিনেমাটিকে ভিন্ন মাত্রার ভীতিকর অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।
৫. হাওয়ার্ড দ্য ডাক (১৯৮৬)

উইলার্ড হাইক পরিচালিত এই সিনেমায় ভিনগ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসা মানুষের মতো দেখতে এক হাঁসের গল্প দেখানো হয়েছে। সিনেমাটির অস্বাভাবিক চরিত্রের অবয়ব, অদ্ভুত দৃশ্য ও কিছু অস্বস্তিকর মুহূর্ত দর্শকদের মনে ভয় তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু বয়সে সিনেমাটি দেখা অনেকের কাছে ভীতিকর অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল।
৬. হাউ টু হ্যাভ সেক্স (২০২৩)

মলি ম্যানিং ওয়াকার পরিচালিত এই সিনেমায় গ্রিসে ছুটি কাটাতে যাওয়া তিন কিশোরীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ-উল্লাসের মধ্যেই যৌন হয়রানি, সম্মতি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা তাদের ঘিরে ধরে। সিনেমাটিতে বড় কোনো ভয়াবহ ঘটনা না ঘটলেও সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কা পুরো গল্পজুড়ে দর্শকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে।
৭. এইট এমএম (১৯৯৯)

জোয়েল শুমাখার পরিচালিত এই থ্রিলার সিনেমায় নিকোলাস কেজ একজন বেসরকারি গোয়েন্দার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। একটি কথিত স্নাফ ফিল্মের সত্যতা অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি ভয়াবহ অপরাধজগতের সন্ধান পান। কিশোরী নিখোঁজ হওয়া, নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড এবং অপরাধীদের মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্য সিনেমাটিকে ভীতিকর করে তুলেছে।
৮. অ্যাওয়েক (২০০৭)

জোবি হ্যারল্ড পরিচালিত এই সিনেমায় ধনী এক যুবকের হৃদ্যন্ত্র প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারের ঘটনা দেখানো হয়েছে। অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেসথেশিয়া কাজ না করলেও রোগী পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় সবকিছু অনুভব করতে থাকে। চিকিৎসক ও আশপাশের মানুষের ষড়যন্ত্রের বিষয়টিও ধীরে ধীরে সামনে আসে। অস্ত্রোপচারের সময় জ্ঞান ফিরে পাওয়ার ভয়াবহ সম্ভাবনাই সিনেমাটির অন্যতম আতঙ্কের উৎস।
৯. ডার্ক ওয়াটার্স (২০১৯)

টড হেইনস পরিচালিত এই আইনি থ্রিলারে মার্ক রাফালো একজন আইনজীবীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি একটি বড় রাসায়নিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার বাসিন্দাদের বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে ফেলার অভিযোগ ওঠে। মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি জেনেও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতা সিনেমাটিকে ভীতিকর বাস্তবতায় পরিণত করেছে।
১০. দ্য হান্ট (২০১২)

থমাস ভিন্টারবার্গ পরিচালিত এই ড্যানিশ সিনেমায় ম্যাডস মিকেলসেন একজন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। একটি শিশুর ভুল অভিযোগের কারণে তাকে যৌন নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। যদিও দর্শক শুরু থেকেই জানেন যে অভিযোগটি সত্য নয়, তবু পুরো সমাজ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মিথ্যা অভিযোগ, সামাজিক অবিশ্বাস ও গণমানুষের প্রতিক্রিয়ায় একজন নির্দোষ মানুষের জীবন কীভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে, তা সিনেমাটিতে তুলে ধরা হয়েছে।
১১. রিকুইয়েম ফর আ ড্রিম (২০০০)

ড্যারেন অ্যারোনফস্কি পরিচালিত এই সিনেমায় মাদকাসক্তি ও স্বপ্নভঙ্গের ভয়াবহ পরিণতি দেখানো হয়েছে। চারটি চরিত্রের জীবন কীভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়, তা অত্যন্ত নির্মমভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মাদকাসক্তির কারণে শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়, অপরাধ এবং মানবিক মর্যাদা হারানোর দৃশ্য দর্শকের মনে গভীর অস্বস্তি তৈরি করে।
দ্য গার্ডিয়ানের লেখকদের মতে, এসব সিনেমার বিশেষত্ব হলো—ভয় দেখানোর জন্য এখানে ভূত, দানব কিংবা অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির প্রয়োজন হয়নি। বরং বাস্তব জীবনের নিষ্ঠুরতা, মানুষের আচরণ এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতিই দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









