এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পর স্পেনের দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তিনি বলেছেন, রেলব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা শেষ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে শুধু কারণ অনুসন্ধান নয়, কার্যকর পদক্ষেপও নিতে হবে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) স্পেনের তোলেদো প্রদেশে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর এসব কথা বলেন সানচেজ।

বুধবার সকালে উর্দা এলাকায় দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৯ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। স্পেনের রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেনফের একটি ট্রেনের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইরিওর একটি ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনায় ট্রেনের একাধিক বগি লাইনচ্যুত হয়।
সানচেজ বলেন, স্পেনের মতো উন্নত দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার দেশে এক বছরের মধ্যে এ ধরনের দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আন্দালুসিয়ার আদামুজ এলাকায় আরেকটি ট্রেন দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব শুধু দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা নয়; বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সমাধান বের করাও জরুরি। দেশের দ্রুতগতির রেলব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ ও শক্তিশালী করতে সরকার কাজ করছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বুধবারের দুর্ঘটনার আগে রেললাইনের স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেয়। এতে কয়েকটি ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে একটি ট্রেনকে স্বাভাবিক গতিতে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়। অথচ সামনের লাইনে আরেকটি ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। ফলে পেছন থেকে আসা ট্রেনটি সেটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের সময় রেনফের ট্রেনটির গতি ছিল ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ২০০ কিলোমিটার। নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটির পর নির্ধারিত প্রটোকল অনুযায়ী ট্রেনটির গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটারে সীমিত রাখার কথা ছিল।
এদিকে দুর্ঘটনার দায় নিয়ে স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তের ওপর পদত্যাগের চাপ বাড়ছে। তবে তিনি পদত্যাগের দাবি নাকচ করে বলেছেন, এ মুহূর্তে তার প্রধান দায়িত্ব পদে থাকা না থাকা নিয়ে আলোচনা নয়, বরং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করা এবং সমস্যার সমাধান করা।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার আগে মাদ্রিদের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি তদন্তের আওতায় রয়েছে। কোনো সাংগঠনিক ত্রুটি বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ব্যর্থতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যক্তিগত দায় প্রমাণিত হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে রেলকর্মীদের সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে শুধু একজন কর্মীকে দায়ী না করে অতিরিক্ত কাজের চাপ, জনবলসংকট এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
স্পেনের দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক ইউরোপের সবচেয়ে বিস্তৃত এবং বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম। দেশটির রেল যোগাযোগব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে উন্নত অবকাঠামোর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। কিন্তু একই বছরে দুটি বড় দুর্ঘটনায় দেশটির রেল নিরাপত্তা, অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত ও জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন স্পেন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









