বিশ্বসাহিত্যে নরওয়ের লেখক ইয়োন ফসের বিশেষত্ব ভাষার পুনরাবৃত্তি, ছন্দময় বাক্য এবং মানুষের অস্তিত্বের অনিশ্চয়তাকে তুলে ধরার অনন্য কৌশল। তার লেখায় ‘বলা’ ক্রিয়াপদের বারবার ব্যবহার কেবল ভাষার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং এক ধরনের বর্ণনাশৈলী। একই শব্দ ও বাক্যের পুনরাবৃত্তিতে তৈরি হয় ঘোরলাগা ছন্দ। পাঠক ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন এমন এক জগতে, যেখানে চরিত্ররা অনবরত কথা বলে, অথচ নিজেদের চারপাশে কী ঘটছে, তা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না।
সাহিত্যে এই স্বতন্ত্র কৌশলই ফসের লেখাকে আলাদা করেছে। ২০২৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া এই লেখকের সর্বশেষ উপন্যাস ‘হোটেল ভেইম’ সেই বৈশিষ্ট্যকে আরও পরিণত করেছে। তবে এবার তার পরিচিত গাম্ভীর্য ও রহস্যময়তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সূক্ষ্ম রসবোধ। দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি, অনিশ্চয়তা ও অস্বস্তিকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা একদিকে হাস্যরস তৈরি করে, অন্যদিকে পাঠককে ভাবিয়ে তোলে।
উপন্যাসের গল্প শুরু হয় ভেইম নামের একটি জায়গায় অবস্থিত হোটেলে এক অতিথির আগমন দিয়ে। কেন তিনি সেখানে এসেছেন, তা নিজেই জানেন না। হোটেলের মালিক ব্রিটা তাকে এমনভাবে স্বাগত জানান, যেন সারা জীবন ধরে তার অপেক্ষায় ছিলেন। অতিথির সঙ্গে রয়েছে দুটি স্যুটকেস। সেগুলোর ভেতরে কী আছে, তা নিয়েও তার স্পষ্ট ধারণা নেই। অতিথির সংখ্যা কম হলেও হোটেলটি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বড়। এরপর সাধারণ ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে অদ্ভুত ও কৌতুকপূর্ণ রূপ নিতে থাকে। অতিথি এমন কিছু নিয়ম মেনে চলতে থাকেন, যেগুলো তাকে কখনো জানানোই হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই নিয়মের কারণেই তাকে হোটেল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পুরো পরিস্থিতিতে কাফকার রচনার মতো এক ধরনের অযৌক্তিকতা ও অস্বস্তি তৈরি হয়। অথচ ফসে খুব সামান্য ঘটনাকেই এমনভাবে সাজান যে তা একই সঙ্গে ভয়, বিস্ময় ও হাসির জন্ম দেয়। ফসের চরিত্রদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তাদের সিদ্ধান্তহীনতা। বাস্তবতা তাদের সামনে কোনো নিশ্চিত উত্তর হাজির করে না। ফলে সামান্য ঘটনাও তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে, আবার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিপদের মুখেও তারা কখনো নির্বিকার থাকে। হোটেলের একমাত্র অতিথিও জরুরি ও তুচ্ছ বিষয়গুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না। তার স্মৃতি, সিদ্ধান্ত এমনকি নিজের কথার ওপরও ধীরে ধীরে অন্যের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটার প্রভাবের কাছে তার নিজের পরিচয় ও অতীত যেন গুরুত্ব হারাতে থাকে।
ফসের আগের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘সেপ্টোলজি’র তুলনায় ‘হোটেল ভেইম’ অনেক বেশি কৌতুকপ্রবণ ও দৈনন্দিন জীবনের অদ্ভুততার কাছাকাছি। ভেইমকে ঘিরে লেখা উপন্যাসগুলোর এই ধারায় আগের বইয়েও দেখা গেছে, সামান্য একটি সুঁই-সুতা কিনতে বেরিয়ে এক জেলে কীভাবে দীর্ঘ যাত্রা ও আবেগঘন ঘটনার মধ্যে জড়িয়ে পড়েন। নতুন উপন্যাসে সেই অযৌক্তিকতার মাত্রা আরও বেড়েছে। এর গদ্যে থমাস বার্নহার্ডের লেখার মতো দমবন্ধ করা অনুভূতি রয়েছে। তবে হাস্যরস সেই গাম্ভীর্যকে ভেঙে দেয়। একটি চাবি নিয়ে দীর্ঘ কথোপকথনও শেষ পর্যন্ত পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মতো উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

মাত্র ১৬০ পৃষ্ঠার উপন্যাসটিতে ঘটনা খুব বেশি নেই। প্রচলিত কাহিনিবিন্যাসের বিচারে একে দীর্ঘ ও একঘেয়ে মনে হওয়ার কথা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পাঠক পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকেন। অতিথি হোটেল থেকে বের হতে চান, অথচ পাঠক চান তার অবস্থান আরও দীর্ঘ হোক। কারণ ফসে এমন এক সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা তৈরি করেছেন, যেখানে কথোপকথনের কোনো স্পষ্ট পরিণতি না থাকলেও তা শেষ করার ইচ্ছা জাগে না।
মানুষ নিজের পরিচয় সম্পর্কে যতটা নিশ্চিত থাকে, অন্যের ধারণা ও কর্তৃত্বের মুখে সেই পরিচয় ততটাই ভঙ্গুর হয়ে উঠতে পারে। ‘হোটেল ভেইম’-এ এই উপলব্ধিই হাস্যরসের আড়ালে এক অস্বস্তিকর সত্য হয়ে সামনে আসে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









