যখন একটি ভূখণ্ডের মানুষ প্রতিদিন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত, যখন ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা কি বিলাসিতা? নাকি এমন সময়েই ভবিষ্যৎ কল্পনা করা সবচেয়ে জরুরি? গাজার ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একটি জনগোষ্ঠীকে শুধু তার ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেই নিঃশেষ করা হয় না; তার ইতিহাস, পরিচয়, অধিকার এবং ভবিষ্যৎ কল্পনা করার ক্ষমতাকেও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলে। কিন্তু নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু বর্তমানের অন্যায়ের প্রতিবাদ নয়। এটি এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রচেষ্টাও, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে, নিজের ভূমিতে ফিরে যেতে পারবে এবং সমান অধিকার নিয়ে সমাজ গড়ে তুলতে পারবে। এই ভাবনা থেকেই ফিলিস্তিনি লেখক ও গবেষক তারেক বাকোনি লিখেছেন তার নতুন বই ‘হোয়াট নাউ: অন প্যালেস্টাইন, ফ্রিডম অ্যান্ড আওয়ার গ্লোবাল ফিউচার’। বইটি নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন লেখক ও সাংবাদিক নাওমি ক্লেইন। আলোচনায় উঠে এসেছে ফিলিস্তিনের মুক্তি, উপনিবেশবাদ, জায়নবাদ, আন্তর্জাতিক সংহতি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নানা দিক।
নাওমি ক্লেইন সাবস্ট্যাক ডট কম থেকে দৈনিক এদিন অনলাইন কথপোকথনটি পাঠকের জন্য অনুবাদ করল।

আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর
নাওমি ক্লেইন: তারেক, আপনার বইয়ের একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আমরা এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন চারদিকে সহিংসতা, ধ্বংস ও হতাশা। এই পরিস্থিতি মানুষকে একধরনের মানসিক স্থবিরতার মধ্যে আটকে রাখে। মানুষ যেন চিন্তা করার, প্রশ্ন করার কিংবা সামনে কী হতে পারে তা কল্পনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে আপনি কেন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবাকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেন?
তারেক বাকোনি: প্রথমেই বলতে চাই, এই সময়ে আশা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি তাদের বন্ধু, সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যরাও ভয়াবহ সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেক সময় মনে হয়, যা ঘটছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো শব্দও আমাদের হাতে নেই। তবে ফিলিস্তিনিদের জন্য যেমন, তেমনি বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে উপনিবেশবাদ ও নিপীড়নের শিকার আদিবাসী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্যও স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ কল্পনা করা জরুরি। আমি মনে করি, মুক্তির স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে রাখা নিজেই একধরনের প্রতিরোধ। কারণ নিপীড়নকারী শক্তি চায় মানুষ বিশ্বাস করুক, বর্তমান পরিস্থিতির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমরা যখন অন্য একটি ভবিষ্যতের কথা ভাবি, তখন সেই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করি।
এটি শুধু আবেগের বিষয় নয়; এর রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। আমাদের বুঝতে হবে, আমরা নিজেরাই ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতা রাখি। প্রতিপক্ষের জয় অবধারিত নয়। তবে আমাদের এটাও স্বীকার করতে হবে, ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মতো ভয়াবহ ভবিষ্যৎও সম্ভব। সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করেই আমাদের মুক্তির সম্ভাবনার পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
নাওমি ক্লেইন: আন্দোলনের অনেক মানুষের কাছ থেকে আমি শুনেছি, আগে গণহত্যা বন্ধ হোক, তারপর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা যাবে। আপনি কিন্তু বইয়ে এই ধারণার সঙ্গে দ্বিমত করেছেন। কেন?
তারেক বাকোনি: কারণ ফিলিস্তিনিদের অভিজ্ঞতায় সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের উচ্ছেদ, দখলদারত্ব ও নিপীড়নের ধারাবাহিকতা। গাজায় হত্যাযজ্ঞের মাত্রা কমে এলেও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান দমন-পীড়ন শেষ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পশ্চিম তীরেও একই ধরনের বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতা দেখা যাচ্ছে। হেবরনসহ বিভিন্ন এলাকায় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। তাই আমাদের জন্য সংগ্রামকে ভবিষ্যতের কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত রাখার সুযোগ নেই। লড়াই করতে হবে চলমান সংকটের মধ্যেই।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। গাজায় কোনো পরিবার যখন তাবুতে বসবাস করছে, খাবার সংগ্রহ করতে পারছে না কিংবা সন্তানদের শীত ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে, তখন তাদের কাছে ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক চিন্তার চেয়ে বেঁচে থাকাটাই বেশি জরুরি। ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা একরকম নয়। কেউ সরাসরি জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে ব্যস্ত, আবার কেউ তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থান থেকে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পাচ্ছেন। আমাদের সম্মিলিতভাবে এই দুই বাস্তবতাকে ধারণ করতে হবে।
নাওমি ক্লেইন: আপনার বইয়ে কিছু মৌলিক নীতির কথা বলা হয়েছে। এগুলো কি একটু ব্যাখ্যা করবেন?
তারেক বাকোনি: বইটিতে আমি তিনটি কৌশলগত বিষয় সামনে এনেছি। এগুলো কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা ও রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করার ভিত্তি।
প্রথমত, ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করার ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভূখণ্ড ভাগ করে একটি অংশে ফিলিস্তিনিদের এবং অন্য অংশে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা উপনিবেশবাদী বাস্তবতাকে অক্ষুণ্ন রাখে। আমাদের এমন একটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে হবে, যেখানে পুরো ভূখণ্ডের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারবে।
দ্বিতীয়ত, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য পুনর্গঠন করতে হবে। প্রত্যাবর্তনের অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং উপনিবেশবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অধিকার—এসব নীতিকে আবার রাজনৈতিক আন্দোলনের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে।
তৃতীয়ত, ফিলিস্তিনের উপনিবেশবাদী কাঠামো ভেঙে দিতে হবে। শুধু শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। যে কাঠামো মানুষকে অসম অধিকার ও বিভাজনের মধ্যে আটকে রেখেছে, সেটিকেও পরিবর্তন করতে হবে।

নাওমি ক্লেইন: এক রাষ্ট্র কিংবা দুই রাষ্ট্রের সমাধান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার তাদেরই। একজন ইহুদি হিসেবে আমি কেন তাদের হয়ে সিদ্ধান্ত দেব? কিন্তু আপনার বই আমাকে এই প্রশ্ন নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। আপনি কী মনে করেন?
তারেক বাকোনি: ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রধান অধিকার ফিলিস্তিনিদের। কারণ তারাই এই উপনিবেশবাদী ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। তবে কোনো সমাধান নিয়ে আলোচনার আগে ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের সামগ্রিক পরিচয়ে পুনর্গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। যারা ফিলিস্তিনে আছেন এবং যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছেন, তাদের সবাইকে এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে হবে। এখানে প্রত্যাবর্তনের অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত না করে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমার কাছে এক রাষ্ট্র কিংবা দুই রাষ্ট্রের সংখ্যা মুখ্য নয়। মুখ্য হলো, যে কাঠামো প্রতিদিন ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা চালাচ্ছে এবং তাদের প্রত্যাবর্তন বাধাগ্রস্ত করছে, সেটির অবসান ঘটানো।
নাওমি ক্লেইন: দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার সময় বান্টুস্তান নামে আলাদা অঞ্চল তৈরি করে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে সীমিত ভূখণ্ডে আটকে রাখার চেষ্টা হয়েছিল। আমার মনে হয়, ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে ভূখণ্ড ভাগ করার ধারণার সঙ্গে এর একটি মিল রয়েছে।
তারেক বাকোনি: ঠিক তাই। বর্ণবাদী ব্যবস্থার মূলনীতি হলো বিচ্ছিন্নতা। মানুষকে আলাদা ভূখণ্ডে রেখে বৈষম্যকে স্থায়ী করা। ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও ভূখণ্ড ভাগ করার ধারণা সেই বিচ্ছিন্নতার নীতিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি উপনিবেশমুক্ত সমাজ, যেখানে ভূখণ্ডের সব বাসিন্দা সমতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে বসবাস করতে পারবেন।
নাওমি ক্লেইন: আমি মনে করি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক করে ফেলার প্রবণতা শুধু ফিলিস্তিনের সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রে খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধেও অনেক ধর্মবিশ্বাসী মানুষ নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের হাতিয়ার হতে দিতে চান না। ইহুদি পরিচয়কেও রাজনৈতিক রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতা রয়েছে। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
তারেক বাকোনি: ইহুদি পরিচয়কে জায়নবাদী রাজনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে এক করে দেখার ফলে ইহুদি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের স্বাধীনতাও সংকুচিত হয়। ইহুদি পরিচয়কে এমন একটি রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়, যেখানে একটি জনগোষ্ঠীর অধিকার অন্য জনগোষ্ঠীর অধিকার কেড়ে নেওয়ার ওপর নির্ভরশীল। জায়নবাদের সমালোচনা এবং ইহুদিবিদ্বেষ এক বিষয় নয়। এই পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান নিপীড়নের বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে কেবল কারও ব্যক্তিগত অস্বস্তিকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখা যায় না। ফিলিস্তিনের মানুষের জীবন ও অধিকারের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে। ইহুদি পরিচয়কে একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রকল্প থেকে আলাদা করার কাজও এই বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনার অংশ।
নাওমি ক্লেইন: যুক্তরাজ্যে সম্প্রতি গ্রিন পার্টির একটি প্রস্তাবে জায়নবাদকে বর্ণবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখানো হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু মানুষকে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু প্রস্তাব গ্রহণই কি যথেষ্ট?
তারেক বাকোনি: না, শুধু একটি প্রস্তাব গ্রহণ করলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। রাজনৈতিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে, আন্দোলনের নীতিগুলো বারবার পর্যালোচনা করতে হবে এবং আমাদের কৌশল ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে জনপরিসরে প্রচলিত ভুল ধারণার বিরুদ্ধেও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক ভাষ্য যখন বিকৃত হয়ে যায়, তখন তা সংশোধনের জন্য সাহসী বক্তব্য দরকার। তবে এই বক্তব্যই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। এরপর প্রয়োজন ব্যাখ্যা, আলোচনা, সংগঠন এবং আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ। রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা এবং মানুষকে সেই অবস্থানের গুরুত্ব বোঝানো—দুটি কাজ একসঙ্গে চলতে হবে। গাজায় ব্যবহৃত নজরদারি ও দমন-পীড়নের কৌশল কি বিশ্বের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে?
নাওমি ক্লেইন: গাজায় ব্যবহৃত কৌশল এখন পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি শুধু ফিলিস্তিনে সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে হচ্ছে। এই প্রযুক্তি ও দমন-পীড়নের মডেল কীভাবে বিশ্বের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে?
তারেক বাকোনি: গাজায় যে সামরিক কৌশল, নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে, তার বিভিন্ন দিক পশ্চিম তীরেও দেখা যাচ্ছে। জেনিন ও তুলকারেমের মতো শরণার্থীশিবিরে অবরোধ, ধ্বংস এবং বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। হেবরনেও পরিবারগুলোকে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকাতেও গ্রাম ধ্বংস ও জনবসতি উচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সামরিক অভিযান পরিচালনায় ব্যবহৃত হতে পারে, তা বিশ্ব দেখছে। গাজা যেন এমন একটি পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে, যেখানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও সামরিক প্রযুক্তির নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এরপর এসব প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা অন্য জায়গায়ও ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

নাওমি ক্লেইন: অর্থাৎ এখানে শুধু সামরিক দখলদারত্বের বিষয় নেই। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত?
তারেক বাকোনি: অবশ্যই। দখলদারত্বের একটি অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। ফিলিস্তিনিরা নিজেদের অর্থনীতি স্বাধীনভাবে গড়ে তুলতে পারছেন না। একই সঙ্গে তাদের এমন একটি বাজারব্যবস্থার মধ্যে আটকে রাখা হচ্ছে, যেখানে ইসরায়েলি পণ্য ও পুঁজির প্রভাব রয়েছে। ফলে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দখলদারত্ব শুধু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নয়; এটি অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা তৈরিরও একটি ব্যবস্থা।
নাওমি ক্লেইন: আপনি ফিলিস্তিনের পরিস্থিতিকে বৃহত্তর বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। আমার মনে হয়, ফ্যাসিবাদের ঔপনিবেশিক শিকড় নিয়ে বিশ্ব এখনো যথেষ্ট আলোচনা করেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও সেই ইতিহাসের অনেক অংশ অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
তারেক বাকোনি: ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি বুঝতে হলে উপনিবেশবাদের অসমাপ্ত ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। গত শতাব্দীতে এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। কিন্তু ফিলিস্তিনের উপনিবেশমুক্তির প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি। এই অসমাপ্ত ইতিহাস আজও ফিলিস্তিনিদের জীবনে প্রভাব ফেলছে। আমার মতে, গাজার অভিজ্ঞতা বিশ্বকে আবারও উপনিবেশমুক্তির প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলোকে আরও ন্যায়ভিত্তিক করতে হলে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের মোকাবিলা করতে হবে। এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। হলোকাস্টের ভয়াবহতা মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত। কিন্তু সেই ইতিহাসের দায় থেকে পশ্চিমা শক্তিগুলো নিজেদের মুক্ত করতে গিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর নতুন অন্যায় চাপিয়ে দিতে পারে না। হলোকাস্টের ইতিহাস, উপনিবেশবাদ এবং বর্ণবাদের উত্তরাধিকার—সবকিছুর সঙ্গেই ন্যায়বিচারের প্রশ্ন জড়িত। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নকে এই বৃহত্তর ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
নাওমি ক্লেইন: আমরা দেখছি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিবাদ ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নামছে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও জনসেবায় বেশি অর্থ বরাদ্দের দাবি জানাচ্ছে। ব্রাজিলেও মানুষ কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে।যদি ক্ষমতাবানদের মধ্যে আধিপত্য ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সংহতি তৈরি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আন্তর্জাতিক সংহতি কীভাবে গড়ে উঠতে পারে?
তারেক বাকোনি: এটি আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি। আমাদের এমন একটি আন্তর্জাতিক সংহতির কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে ব্রাজিলের মানুষের সংগ্রাম এবং ফিলিস্তিনের মানুষের সংগ্রামকে আলাদা করে দেখা হবে না। আমরা যেসব শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছি, সেগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ, উপনিবেশবাদ ও বর্ণবাদ বিভিন্ন দেশে ভিন্ন রূপে প্রকাশ পেলেও তাদের মূল কাঠামোর মধ্যে মিল রয়েছে। তাই আমাদের আন্দোলনও আন্তর্জাতিক হতে হবে। এক দেশের মানুষের সংগ্রাম অন্য দেশের মানুষের সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে ক্ষমতাবানদের পক্ষে আন্দোলনকে দুর্বল করা সহজ হয়। আমাদের এমন রাজনৈতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করতে হবে, যা শুধু প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য সংগঠিত শক্তি তৈরি করবে।
নাওমি ক্লেইন: অনেকেই ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে পোশাকে জলপাইগাছ কিংবা তরমুজের প্রতীক ব্যবহার করেন। এসব প্রতীক মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে। কিন্তু কখনো কখনো প্রতীকই কি রাজনীতির জায়গা দখল করে নিচ্ছে না?
তারেক বাকোনি: প্রতীকের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এগুলো মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে, সংহতির বার্তা ছড়িয়ে দেয় এবং রাজনৈতিক আলোচনার পথ খুলে দেয়। কিন্তু প্রতীকই চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। আমাদের বাস্তব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে হবে। যে জায়গায় আমরা আছি, সেখান থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত ভূমিকা রাখতে হবে। শুধু কোনো প্রতীক ব্যবহার করলেই পরিবর্তন আসবে না। প্রয়োজন মানুষের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা, সংগঠিত হওয়া এবং ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের জন্য কাজ করা। আমাদের হতাশ হয়ে পড়লে চলবে না। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, মানুষের সম্মিলিত শক্তি অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
নাওমি ক্লেইন: এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ ও গণহত্যার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের মালিকানা অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও এমন এক বাস্তবতা তৈরি করছে, যেখানে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে মানুষের সামনে নির্দিষ্ট ধরনের তথ্য ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা সম্ভব। এসব বিষয়কে আপনি কীভাবে দেখেন?
তারেক বাকোনি: এসব প্রবণতার সম্মিলিত প্রভাব হলো মানুষের চিন্তার জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করা। মানুষ যেন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে মুক্তি অসম্ভব, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় এবং বর্তমান ব্যবস্থার বাইরে কোনো বিকল্প নেই। গণহত্যার সময় আমরা এর একটি ভয়াবহ উদাহরণ দেখেছি। মানুষ নিজের চোখে ধ্বংস, মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতি দেখেছে। অথচ সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার জন্য নানা ধরনের ভাষ্য তৈরি হয়েছে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষাদানের জায়গা নয়; এটি ইতিহাস বোঝা, ক্ষমতার কাঠামো বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করার জায়গা। একইভাবে গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কোন বাস্তবতাকে সামনে আনা হচ্ছে—এসব প্রশ্ন করতে হবে। আমাদের নিজেদের চিন্তা ও রাজনৈতিক সচেতনতাকে মুক্ত করা জরুরি। মানুষকে শুধু তথ্য গ্রহণকারী হিসেবে নয়, বরং নিজের সমাজ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে ভাবতে হবে।
নাওমি ক্লেইন: আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে বাস করছি, যখন অনেকেই ভবিষ্যৎকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যেতে দেখছেন। যেন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ আগে থেকেই নির্ধারিত। এই ভয় ও হতাশা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?
তারেক বাকোনি: আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষেরই পরিবর্তন আনার সক্ষমতা রয়েছে। পরিস্থিতি যত ভয়াবহই হোক, ক্ষমতাবানদের জয় নিশ্চিত নয়। আমাদের একটি নতুন পৃথিবীর কথা ভাবতে হবে। সেই পৃথিবী কেমন হবে, সেখানে মানুষ কীভাবে বসবাস করবে, কীভাবে একে অপরের অধিকার রক্ষা করবে—এসব প্রশ্ন নিয়ে ভাবা জরুরি। রাজনৈতিক কল্পনাশক্তি ছাড়া মুক্তির কোনো প্রকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়। আমাদের শুধু বর্তমান ব্যবস্থার সমালোচনা করলেই হবে না; এর বিকল্প কী হতে পারে, সেটিও ভাবতে হবে।
নাওমি ক্লেইন: আলোচনার শেষ পর্যায়ে এসে আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই। এতগুলো সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে যারা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য আপনার শেষ বার্তা কী?
তারেক বাকোনি: আমার কথা খুব সহজ। প্রত্যেক মানুষেরই ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। পৃথিবী এখন অন্ধকার ও ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফিলিস্তিনিরা এই সংকটের সবচেয়ে সামনের সারিতে রয়েছেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানুষের সম্মিলিত শক্তি রয়েছে। আমাদের প্রতিপক্ষের জয় অবধারিত নয়। অন্য একটি পৃথিবী সম্ভব। সেই পৃথিবী গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই। আমাদের প্রথম কাজ হলো সেই পৃথিবীকে কল্পনা করা। তারপর সেই কল্পনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









