অযান্ত্রিক ছবির বিষয়বস্তু নিয়ে আমি দীর্ঘ বারো বছর ধরে ভেবেছি। ছবিটি নির্মাণের আগেই গল্পটি আমার মনজুড়ে ছিল। প্রথম যখন গল্পটির কথা শুনি, কিংবা বলা যায়, গল্পটি যখন প্রথম আমার কাছে আসে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা এক তরুণ আমি। জীবনের সোনালি যৌবন তখনো অতীতের স্মৃতি হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু অযান্ত্রিক আমার সামনে এসেছিল হঠাৎ, একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে। টানা দশ দিন ধরে আমি ছবিটি নিয়ে ভেবেছিলাম। যদিও বিষয়টি নিয়ে এর আগেও অনেকবার ভেবেছি। কিন্তু তখনো ভাবনাগুলো কোনো নির্দিষ্ট রূপ পায়নি। সেগুলো ছিল এলোমেলো, অসংলগ্ন কথাবার্তার মতো। গল্পটির গভীর জীবনদর্শন আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। একই সঙ্গে মনে হয়েছিল, আমাদের দেশের সাহিত্যজগতে গল্পটি জীবনের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদ ও অভিজ্ঞতার সন্ধান দেয়। গল্পটির মেজাজ, তার ভাষা—সবই ছিল আমাদের কাছে অচেনা।
মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্কের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব রয়েছে, তার কোনো চিহ্নই আমাদের সাহিত্যের পরিচিত পরিসরে খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই পরিসরে মানুষ ও যন্ত্রের সংঘাতের কোনো জায়গা নেই। আমাদের সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসে যন্ত্রের একটিই পরিচয়—তা মানুষের তৈরি এক অমানবিক বস্তু। জীবনের শূন্যতা ও নেতিবাচকতার সঙ্গে যন্ত্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, ভেতরে ভেতরে যান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠলে তার পরিণতি হতে পারে গভীর হতাশা কিংবা অন্তঃসারশূন্যতা। যন্ত্রের সঙ্গে আমাদের অতীত ও বর্তমান জীবনব্যবস্থার টানাপোড়েন এখন একেবারে মৌলিক সংঘাতের পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমি অবশ্য সমাজবিজ্ঞানী নই। তাই এই জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারব না। তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তি আমাদের দেশে যন্ত্রের ব্যবহার চালু করেছিল বলেই আমরা যন্ত্রের প্রতি একধরনের সাধারণ, অবৈজ্ঞানিক উদাসীনতা দেখিয়ে এসেছি। পশ্চিমা জীবনের শূন্যতাও আমাদের মনে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। কিন্তু বর্তমান ও ভবিষ্যতের ভারত এ রকম আত্মরক্ষামূলক মানসিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে আমাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের নিজের সত্তার সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।

গল্পটির গঠন, এর সহমর্মিতা এবং বর্ণনাভঙ্গি আমাদের সামনে এমন এক জগৎ হাজির করে, যা আশ্চর্যজনকভাবে পরিচিত। এই জগৎ সম্পূর্ণভাবে মিশে আছে এ দেশের জীবনবোধ ও সংস্কৃতির সঙ্গে। শুধু তা-ই নয়, গল্পটি জীবনের এক গভীর সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। গল্পের প্রতিটি পঙ্ক্তিকেই আমার জীবন্ত মনে হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে বিমলের মতো মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তাই বিমলের প্রতিটি অভিজ্ঞতাই আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। গল্পটির শক্তি আসলে এই বিশ্বাসযোগ্যতার মধ্যেই। ছবিটি নির্মাণের একটি ভালো সুযোগ পেয়েছিলাম। সুযোগ পাওয়ামাত্রই কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। পুরো অভিজ্ঞতাটাই ছিল দারুণ আনন্দের—এখনো তাই। কারণ, আর্থিক দিক থেকে ছবিটি কোনো মূল্যই তৈরি করতে পারেনি।
ছবিটি নির্মাণের পেছনে আমার আরও কয়েকটি উদ্দেশ্য ছিল।
প্রথমত, গল্পটি আমাদের এমন এক অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যে অঞ্চল সম্পর্কে আমাদের প্রায় কিছুই জানা নেই। ছবির জগতের মধ্যে থাকা মূল্যবোধগুলো সম্পর্কে অনুসন্ধান ও প্রশ্ন তোলার জন্য আমাকে সতর্ক থাকতে হয়েছিল। ছোটনাগপুরের উপত্যকা তার সমস্ত বৈচিত্র্য নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, প্রকৃতির এই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু তৈরি করা যায় না কেন? নদী-উপত্যকার মানুষেরা এই নতুন জগতের ভাষা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, আদিবাসী মানুষের জীবন সব সময়ই আমাদের ভাবিয়েছে। গল্পটি যেমন এই অঞ্চলের প্রকৃত অধিবাসীদের নিয়ে, ছবিটিও তেমনই তাদের জীবনকে কেন্দ্র করে। তাদের বাদ দিলে গল্পটির কোনো অর্থই থাকে না।
গল্পটি খুবই সরল। ঈশ্বরের পরিত্যক্ত একটি গাড়ির মধ্যে প্রাণ আছে—এমন কথা বিশ্বাস করবে কে? কোনো অদ্ভুত স্বভাবের মানুষ ছাড়া আর কে এমন কথা বিশ্বাস করতে পারে? আপনি কিংবা আমি কেউই তা বিশ্বাস করব না। কিন্তু শিশুরা বিশ্বাস করতে পারে। সাধারণ গ্রামাঞ্চলের মানুষও পারে। পারে আদিবাসীরা, কারণ তারা আত্মা ও অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস করে। আমাদের মতো শহুরে মানুষের কাছে এসব বিশ্বাস অর্থহীন প্রলাপ ছাড়া আর কিছু নয়। তবে যন্ত্র সম্পর্কে যে সংশয় আমাদের মধ্যে রয়েছে, সমস্যাটি আসলে সেখানেই। আমি যদি কোনো গরু, হাতি কিংবা নদীকে নিয়ে গল্প বলতাম, তাহলে কোনো অসুবিধা হতো না। কিন্তু আমরা কথা বলছিলাম একটি গাড়িকে নিয়ে—অর্থাৎ যন্ত্রকে নিয়ে। আপত্তির সূত্রপাত সেখানেই। কিন্তু সরল, অকৃত্রিম আদিবাসীদের কাছে এ ধরনের প্রশ্নের কোনো গুরুত্ব নেই। নতুন যা কিছু আসে, তারা তা গ্রহণ করে, তার সঙ্গে নিজেদের পরিচিত করে তোলে। আদিবাসীদের জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সেখানে পুরোনো ও নতুনের মিশে যাওয়ার একটি অবিরাম প্রক্রিয়া চলছে।
মধ্য ভারতের আদিবাসীদের মধ্যে এই প্রক্রিয়াটি বিশেষভাবে স্পষ্ট। একসময় তাদের নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে আমি ওরাঁও জনগোষ্ঠীর জীবন বেছে নিয়েছিলাম। পাঁচ বছর ধরে তাদের সঙ্গে থেকেছি। তাদের জীবন সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা তৈরি হয়েছিল। তাদের সহ্যশক্তির গভীরতা ও ব্যাপ্তি, জীবনের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং প্রাণশক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক—এসব আমি কাছ থেকে দেখেছি। বিমলকে বুঝতে তাদের কোনো অসুবিধা হয়নি। বাইরের জগৎ সম্পর্কে তাদের মানসিকতার সঙ্গে বিমলের চিন্তাভাবনার একটি মিল রয়েছে। সে কারণেই ছবিতে তাদের উপস্থিতি জরুরি ছিল। তাদের জীবনযাপন ও চিন্তাভাবনার ধরন আমি ছবিতে তুলে ধরেছি। নানা দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের বৈরাকী বা উঁচু পতাকাগুলোর ছবি ধারণ করেছি। এসবের মধ্যে তাদের নিজস্ব শিল্পভাবনার একটি আভাস রয়েছে। যদিও এই প্রতীকগুলো এখনো কোনো সর্বজনীন সত্যে পরিণত হয়নি, তবু হয়তো আরেকটু সতর্কভাবে দেখলে এগুলোকে পরিচিত গণ্ডি অতিক্রম করিয়ে নতুন তাৎপর্য দেওয়া সম্ভব হতো।
তৃতীয়ত, গল্পটির অন্যতম প্রধান চরিত্র হলো সেই ভাঙাচোরা গাড়িটি। এই চরিত্রটির উপস্থিতিই নানা সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। অযান্ত্রিক ছবিতে আমি এমন অনেক মুহূর্ত ধারণ করেছি, যখন যন্ত্রটি বিকল হয়ে পড়ে, কিংবা মুহূর্তের মধ্যে জগদ্দল যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। চতুর্থত, ছবিটি নির্মাণের সময় আমাকে অনেক পুরোনো যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করতে হয়েছিল। প্রতিটি মুহূর্তই ছিল একেকটি চ্যালেঞ্জ। তাই প্রতিনিয়ত নিজেকে অভিশাপ দিয়েছি, আবার একই সঙ্গে কাজের প্রেরণাও পেয়েছি।

এই সব কারণই আমাকে ছবিটি নির্মাণের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। তাই প্রথম সুযোগ পাওয়ামাত্রই আমি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। ওই মানুষগুলো, পাহাড়ি অঞ্চলটি এবং এই অসাধারণ গাড়িটির কথা আমি প্রবলভাবে বলতে চেয়েছিলাম। আমার যা বলার ছিল, তা আমি বলে ফেলেছি। এরপর আর কিছু বলার নেই—শুধু নীরবতা। কিছুদিন আগে একটি সিনেমা হলের বাইরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। অযান্ত্রিক তখন সেই হলে চলছে। প্রচারের জন্য হল কর্তৃপক্ষ বাইরে একটি ট্রাকের ওপর জগদ্দলকে বসিয়ে রেখেছিল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছিলাম। এমন সময় দেখি, একটি ছোট্ট চড়ুই পাখি ঠোঁটে শুকনো সরু ডাল নিয়ে উড়ে এসে গাড়ির হর্নের হাতলে বসার চেষ্টা করছে।
আমি নিঃশব্দে সেখান থেকে চলে এলাম। মনে মনে খুব করে চাইছিলাম, চড়ুইটি যেন জগদ্দলের ভেতরেই বাসা বাঁধে। আমার এই ইচ্ছা পূরণ না হওয়ার সম্ভাবনাটুকুও মন যেন সহ্য করতে পারছিল না। পাখিটি যদি উড়ে গিয়ে কোনো বাড়ির ছাদ কিংবা জানালার কার্নিশে বাসা বাঁধত, তাহলে তা আমার কাছে বড়ই বেদনাদায়ক হতো। যেন পুরো দৃশ্যটির মধ্যে কোথাও একটি বেসুরো সুর বেজে উঠত। ছবির শেষ দৃশ্যে আমি জীবনের এক অবিচ্ছিন্ন ধারার কথা বলেছি। সেখানে বুলাকী নতুন পাত্রের মোহে পুরোনো পাত্রের চিরন্তন অস্তিত্বের কথা ভুলে যায়। সেই নির্মম দৃশ্য, কিংবা ছোট্ট ছেলেটি যখন ভাঙা হর্নের একটি টুকরো নিয়ে খেলতে খেলতে বিমলকে দেখে হাসে—এসবের মধ্যে রয়েছে জীবনের অবিরাম প্রবাহের এক সত্য। জীবন সব সময় পুরোনো থেকে নতুনের দিকে, নতুন থেকে আরও নতুনের দিকে এগিয়ে যায়। একদিকে সে পুরোনোকে পেছনে ফেলে, অন্যদিকে নতুনকে আঁকড়ে ধরে। এই চলমানতার মধ্যেই জীবনের একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে।
জগদ্দলের জীবনের শেষ দিনগুলোতে এই সত্য যেন কিছুটা অস্পষ্ট ও ধোঁয়াটে হয়ে আসে। সেই কষ্টকর গরমের রাতগুলোর কথা মনে পড়ে। বাড়ি ফেরার পথে কয়েক মাইল হেঁটে আসার পর বারবার জগদ্দলের কথা মনে হতো আমার। জগদ্দল আমাকে আমার মৃত মায়ের কথা মনে করিয়ে দিত। সারা জীবনেও আমি হয়তো তাদের দুজনের মধ্যে কী আশ্চর্য মিল ছিল, তা ব্যাখ্যা করতে পারব না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









