এক: সৃষ্টিশীল কোচিং সেন্টারের পরিচালক আব্দুল মালেক ক্লাসে ঢুকতেই একগাদা প্রশ্ন বাক্যবাণের মতো ছুটে এলো। তিনি টেনেটুনে ডিগ্রি পাস করেছেন। কপালগুণে আজ তিনি একটি কোচিং সেন্টারের মালিক।
এখন ছিল বাংলা ক্লাস। কিন্তু যে শিক্ষক এই ক্লাস নেওয়ার কথা, তিনি আজ আসেননি।
সেক্ষেত্রে মালেক নিজেই সেই ক্লাসটি নিয়ে নেন। কখনো বাংলার। কখনো অর্থনীতির।
কথার মারপ্যাঁচে তিনি ঠিকই ক্লাসটি নিয়ে বের হয়ে আসে। প্রশ্ন শুনে ভড়কানো পাত্র তিনি না।
আজও প্রশ্ন শুনে হড়কালেন না মালেক।
প্রশ্নগুলো এমন-
ভাইয়া, বাংলা বোর্ড বই কি কিনতে হবে ?
এত বড় কোর্স কীভাবে শেষ করব?
ভাইয়া কোন কোন লেখকের গাইড বই কিনব?
সবার প্রশ্ন শুনে হাসলেন মালেক ভাইয়া। এরা সবাই এবছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। রেজাল্ট হয়নি। রেজাল্টের পর এসএসসি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নাম্বারের ভিত্তিতে ভালো ভালো কলেজে ভর্তির আবেদন করবে সবাই।
কলেজের ক্লাসরুমে কোর্স কমপ্লিট হয় না। তাই ওরা আগাম কোচিং-এ ভর্তি হয়েছে।
কোনো লেখকের বইই কেনার প্রয়োজন নেই। হাসিমুখে বললেন মালেক।
সবাই বিস্মিত হলো।
কেন স্যার?
কারণ সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর সিস্টেমে বই থেকে কোনো প্রশ্ন আসেই না। তাই খামোখা বই কিনে কী করবে?
তাহলে কি স্যার মূল বই পড়ব না? সবাই যে বলে ভর্তি পরীক্ষায় মূল বই থেকে প্রশ্ন আসে।
মনে মনে শংকিত হলেন মালেক। সব ব্যাচেই দু একটা আঁতেল ছাত্রছাত্রী থাকে যারা নিজেকে সবজান্তা শমসের মনে করে।
হাসিটা মুখে ধরে রাখলেন তিনি। হাসিই হচ্ছে যাদুকরী এই ব্যবসার প্রধান অস্ত্র।
আরে প্রস্তুতির জন্য আমরা তো আছিই। আমরা এমনভাবে পড়াব যেন সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিংও হয়ে যাবে।
আচ্ছা ভাইয়া,গাইড বই যদি না কিনি তাহলে পরীক্ষায় বড় বড় প্রশ্নের উত্তর দেব কীভাবে? সুলতা জানতে চাইল।
আমরা তোমাকে নোট দেব। তিন বছর খেটেখুটে তোমাদের জন্য আমরা নোট তৈরি করেছি। শুধু আমাদের নোট পড়লেই হবে।
তাহলে বোর্ড বইগুলো কেন প্রকাশিত হয়েছে ভাইয়া? আনিস জানতে চাইল।
আরে এসব হচ্ছে খালি ব্যবসা। বোর্ড বই প্রকাশিত হলে লাখ লাখ ছাত্র ছাত্রী সেই বই কিনবে। অথচ সেই বই থেকে কোনো প্রশ্ন আসবে না। তাহলে তুমি কী করবে? গাইড বই কিনবে। একবছর পড়ার পর জানতে পারবে সেই গাইড থেকেও প্রশ্ন আসবে না। মালেক হাসিমুখে বললেন।
তাহলে ভাইয়া,কলেজে কী পড়ায়? সুলতা জানতে চাইল।
পড়ায় না।
পড়ায় না! উপস্থিত সব ছাত্র ছাত্রী একসাথে বিস্ময় প্রকাশ করল।
তাহলে কলেজে স্যাররা কী করে ভাইয়া?
তারা কলেজে যায়। নাম প্রেজেন্ট করে। তারপর চলে আসে।
শুধু নাম প্রেজেন্ট করে! পড়ায় না? রেশমী জানতে চাইল।
কলেজে একেকটা সেকশনে থাকে দেড়শো থেকে দু'শ ছাত্র ছাত্রী।শিক্ষকরা নাম প্রেজেন্ট করতে করতেই ক্লাসের পিরিয়ড পার হয়ে যায়।
তাই কলেজে পড়াশোনা হয়না বললেই চলে। আমাদের মতো কোচিং সেন্টার আছে বলেই না দেশে পড়াশোনা হচ্ছে। এই যে দেখ,তিন বছর খেটে আমরা তোমাদের জন্য বাংলা নোট তৈরি করেছি। সেই নোট পড়ে কত ছাত্র ছাত্রী এ প্লাস পেয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে চাকরি করছে।
কিন্তু স্যার! আপনারা নোট তৈরি করেছেন মাত্র তিন বছর হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেই তো কমপক্ষে চার বছর লাগে। তাহলে বছর পাঁচ-ছয় আগে সেই ছাত্র ছাত্রীরা কোন নোট পড়তো?মানস হেসে জানতে চাইল।
অমনি ছাত্র ছাত্রীদের সবাই হেসে উঠল।
মালেকও হাসলেন। শুষ্ক হাসি।
দুই: প্রশ্ন পড়ে বুকের ভেতর শুকিয়ে গেল আনিসের। আজ বাংলা পরীক্ষা।
বেশ কয়েকটি সৃজনশীল প্রশ্ন এসেছে। উপরের উদ্দীপক পড়ে নিচের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
প্রশ্ন পড়ে আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না ও।
টেস্ট পেপার বা কোচিং-এর নোট কোনোটা থেকেই প্রশ্ন কমন পড়েনি। দেখে মনে হচ্ছে প্রশ্নগুলো এসেছে মঙ্গলগ্রহ থেকে।
আবার প্রশ্নটা পড়ল আনিস।
“নয়নের বাবা নয়নকে বিয়ে দিতে চান। কিন্তু তিনি যৌতুকবিরোধী।”
এটুকু পড়ে বিরক্ত হলো সে।
নয়ন কে!
ছেলে না মেয়ে?
আর নয়নের বাবা কেন যৌতুকবিরোধী হবেন! আজকের যুগে এটা কি বাস্তবসম্মত!
“নয়নের বাবা সবুর করতে চান না। তিনি চান দ্রুতই নয়নের বিয়ে হয়ে যাক।”
আশ্চর্য! নয়নের মতামতের কোনো মূল্য নেই। আর বাবা কেনই বা ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অত উতলা হবেন! নিশ্চয়ই তার নিজেরই আরেকটা বিয়ে করার ধান্ধা।
প্রশ্ন পড়ে আবার ধাক্কা খেল আনিস।
লেখা আছে - হৈমন্তীর চরিত্র বিশ্লেষণ করো।
আশ্চর্য! কোথায় নয়ন আর কোথায় হৈমন্তী!
নয়ন একটা ছেলে আর হৈমন্তী মেয়ে।
উদ্দীপকে নয়নের কোনো বর্ণনাই নেই। তাহলে সেটা থেকে হৈমন্তীর কোন দিকটা খুঁজে বের করব আমি- নিজেকে প্রশ্ন করল আনিস।
মালেক স্যারের কথা মনে পড়ল তার। তিনি বলেছিলেন যত পার বানিয়ে বানিয়ে লিখবে। যত বানাবে ততই সৃজনশীল তুমি।
অনেক ভেবে আনিস খাতায় উত্তর লিখল- হৈমন্তী হলো নয়নের বোন। বোনের বিয়ে না দিয়ে নয়ন বিয়ে করতে চায় না। নয়ন ছেলে ভালো। সে যৌতুক নিতে চায় না একথা ঠিক না। সে বিয়ে করতে চায়। যৌতুকও চায়।তবে বোনের বিয়ে দেওয়ার পর সে বিয়ে করবে। নয়তো যৌতুকের সব টাকা বোনের বিয়েতেই খরচ হয়ে যাবে।
এটুকু বানিয়ে লিখতেই নিজের রিজার্ভ ফুরিয়ে গেল আনিসের।
দাঁত দিয়ে কলম চাবালো কিছুক্ষণ।
শেষে লিখল -আজকের যুগে যৌতুক না নেওয়াটা মারাত্মক ভুল হয়ে যাবে। আমি মনে করি যৌতুক নেওয়া উচিত। যৌতুক ছাড়া ছেলেদের বিয়ে করা উচিত না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









