বাড়ি: শুধু থাকার জায়গা নয়
তুমি যদি ‘দর্শন’ শব্দটি শোনো, তোমার মনে কী আসে? বড় বড় দার্শনিক, কঠিন সব প্রশ্ন, রাষ্ট্র, রাজনীতি, ন্যায়-অন্যায়, যুদ্ধ কিংবা মানুষের স্বাধীনতা?
কিন্তু একটা সহজ প্রশ্ন কি কখনো মাথায় এসেছে—‘একটি বাড়ি কেমন হওয়া উচিত?’
বাড়িতে মানুষ কীভাবে একসঙ্গে থাকবে? বাবা-মা কীভাবে সন্তানকে বড় করবেন? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত? কে রান্না করবে, কে বাজার করবে, কে অসুস্থ মানুষের যত্ন নেবে? এসব কি দর্শনের বিষয় হতে পারে? প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিকেরা বলতেন, অবশ্যই পারে।
আসলে গ্রিক ভাষায় বাড়ি বা গৃহস্থালির জন্য একটি শব্দ ছিল—‘অইকস’। আর ‘অইকোনোমিকা’ বলতে বোঝানো হতো বাড়ি পরিচালনার জ্ঞান। আজ ‘ইকোনমিক্স’ বলতে আমরা অর্থনীতি বুঝি—টাকা, বাজার, ব্যবসা, উৎপাদন ইত্যাদি। কিন্তু প্রাচীন গ্রিসে বিষয়টি ছিল অনেক বড়। একটি বাড়ির মানুষ কীভাবে একসঙ্গে বসবাস করবে, সম্পদ ব্যবহার করবে, সন্তান বড় করবে এবং নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে—এসবও ছিল সেই আলোচনার অংশ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শনের এই ‘বাড়ি’ যেন হারিয়ে গেল। দার্শনিকেরা রাষ্ট্র, সরকার, আইন ও রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা বললেন; বাড়ি, পরিবার ও সন্তান পালনের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ল।
কেন?
এর একটি কারণ হয়তো খুব সাধারণ। বহু শতাব্দী ধরে দর্শনের জগতে পুরুষের সংখ্যাই ছিল বেশি। আর পুরুষদের তৈরি সমাজে বাড়ির কাজকে প্রায়ই ‘ছোট’ কাজ বলে দেখা হয়েছে। রান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তান পালন, অসুস্থ মানুষের যত্ন—এসব যেন গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো যুদ্ধ করা, রাজনীতি করা, আইন বানানো কিংবা দর্শনের বই লেখা।
কিন্তু প্রাচীন গ্রিসের গল্পটা এত সহজ নয়। চতুর্থ শতাব্দী খ্রিস্টপূর্ব এথেন্সে দার্শনিক অ্যারিস্টটল মানুষের জীবনকে অনেকটা দুটি ভাগে দেখেছিলেন। একদিকে বাড়ি, অন্যদিকে নগররাষ্ট্র। তার মতে, বাড়ি মানুষের বেঁচে থাকা, সন্তান বড় করা ও দৈনন্দিন জীবন চালানোর জন্য দরকার। কিন্তু মানুষের পূর্ণ বিকাশ ঘটে নগররাষ্ট্রে—অর্থাৎ ‘পোলিস’-এ।
অ্যারিস্টটল মনে করতেন, মানুষ স্বভাবতই রাজনৈতিক প্রাণী। তাই নাগরিক হিসেবে অন্য মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজনীতি, আইন ও সামাজিক জীবনে অংশ নেওয়াই মানুষের উচ্চতর কাজ। কিন্তু এই ধারণার সঙ্গে একটি সমস্যা ছিল। অ্যারিস্টটলের সময়ের সমাজে পুরুষ ও নারীর জীবন এক ছিল না। পুরুষেরা বাইরে যেতেন, রাজনীতি করতেন, বিতর্ক করতেন। নারীদের প্রধানত বাড়ির ভেতরেই থাকতে হতো।

এথেন্সের সম্মানিত নারীরা সাধারণত একা বাইরে যেতে পারতেন না। নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তাদের সঙ্গে অন্য কেউ থাকত। বাড়িতে বাইরের পুরুষ অতিথি এলে নারীদের থাকার জন্য আলাদা অংশ থাকত, যাকে বলা হতো ‘জিনিসিয়া’। তাই অ্যারিস্টটল এই ব্যবস্থা আবিষ্কার করেননি। সমাজে আগে থেকেই এমন ব্যবস্থা ছিল। তিনি বরং সেই প্রচলিত ব্যবস্থাকে দর্শনের ভাষায় ব্যাখ্যা করেছিলেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। অনেক সময় দার্শনিকেরা সমাজকে বদলানোর বদলে সমাজে যা চলছে, তারই একটি যুক্তি তৈরি করেন। ফলে কোনো ধারণা পুরোনো হয়ে গেলেও তা ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে হতে থাকে। তবে প্রাচীন গ্রিসের সব দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতো ভাবতেন না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ‘ইকোনমিক্স’ বা ‘ইকোনোমিকা’ নামের একটি পুরোনো গ্রন্থ। বহু শতাব্দী ধরে এই বইটি অ্যারিস্টটলের লেখা বলে মনে করা হতো। কিন্তু আধুনিক গবেষকেরা দেখেছেন, এর লেখকত্ব নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। বইটির বিভিন্ন অংশ সম্ভবত ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন লেখকের হাতে তৈরি হয়েছে। তবু বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে।
সেখানে বলা হয়েছে, মানুষের ভালো জীবনের জন্য বাড়ি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শহর তৈরি হয় বহু বাড়ির সমন্বয়ে। অর্থাৎ বাড়ি কোনো ছোট বা অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান নয়; বরং বৃহত্তর সমাজের ভিত্তি।
ভাবো, একটি শহরের প্রতিটি বাড়িতে যদি মানুষ একে অপরের সঙ্গে প্রতারণা করে, অসুস্থ মানুষের যত্ন না নেয়, শিশুদের ভালোভাবে বড় না করে এবং কোনো সম্পদ ঠিকমতো ব্যবহার না করে—তাহলে সেই শহর কি ভালোভাবে চলবে?
সম্ভবত না। তাহলে একটি ভালো রাষ্ট্রের জন্য ভালো পরিবারও দরকার।
এই ভাবনাটি আমাদের আরেকজন দার্শনিকের কাছে নিয়ে যায়—লুক্রেজিয়া মারিনেল্লা। সপ্তদশ শতকের ভেনিসের এই নারী দার্শনিক মনে করতেন, একটি ভালোভাবে পরিচালিত বাড়ি একটি ভালোভাবে পরিচালিত শহরের মতো। শহর যদি অনেক বাড়ির সমষ্টি হয়, তবে বাড়িকে ভালোভাবে পরিচালনা করা মানুষও আসলে সমাজকে গড়ে তুলছে।
এখানে নারীর কাজের গুরুত্ব নতুনভাবে দেখা যায়।
ধরো, একজন মা প্রতিদিন সন্তানের পড়াশোনা দেখছেন। একজন বাবা বাজার করছেন। কেউ রান্না করছেন, কেউ পরিবারের হিসাব রাখছেন, কেউ অসুস্থ দাদু-দাদির দেখাশোনা করছেন। এসব কাজের কোনোটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় আসে না। কিন্তু এগুলো ছাড়া একটি পরিবার চলে না। আর পরিবার ছাড়া সমাজও চলে না। প্রাচীন স্টোইক দার্শনিক মুসোনিয়ুস রুফুসও বিবাহকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক হিসেবে দেখেছিলেন। তার মতে, বিবাহ শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যবস্থা নয়। স্বামী ও স্ত্রীকে জীবন ভাগ করে নিতে হবে। শুধু টাকা-পয়সা নয়, ভালোবাসা, দায়িত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতাও ভাগ করে নিতে হবে।

অর্থাৎ ভালো পরিবার হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে দুজন মানুষ একে অপরের সঙ্গী। আরেকজন স্টোইক দার্শনিক হিয়েরোক্লিস এই ভাবনাকে আরও এগিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, মানুষের প্রথম সামাজিক সম্পর্কগুলোর একটি হলো পরিবার। মানুষ প্রথমে নিজের শরীর ও নিজেকে বুঝতে শেখে, তারপর বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়, প্রতিবেশী, নিজের দেশ এবং শেষ পর্যন্ত পুরো পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে।
এটি অনেকটা কয়েকটি বৃত্তের মতো। প্রথম বৃত্তে তুমি। তারপর তোমার পরিবার। তারপর আত্মীয় ও প্রতিবেশী। তারপর তোমার শহর ও দেশ। সবশেষে পুরো পৃথিবী। এই ধারণাটি আজও আমাদের পরিচিত মনে হতে পারে। কারণ আমরা সবাই কোনো না কোনো পরিবার থেকে শুরু করি। তারপর আমাদের পৃথিবী ধীরে ধীরে বড় হয়।
হিয়েরোক্লিসের আরেকটি মজার কথা ছিল—স্বামী ও স্ত্রীকে প্রয়োজনে একে অপরের কাজও করতে জানতে হবে। স্বামী বাইরে কাজে গেলেন। স্ত্রী তখন বাড়ির কাজ সামলাবেন। স্ত্রী অসুস্থ হলেন। স্বামীকে বাড়ির কাজ করতে হবে। স্বামী বা স্ত্রী কেউ না থাকলে পরিবারের জীবন যেন থেমে না যায়। শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও প্রাচীন গ্রিসের সমাজে এটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল। কারণ তখন নারী-পুরুষের কাজকে বেশ কঠোরভাবে আলাদা করে দেখা হতো।
হিয়েরোক্লিস এমনকি বলেছিলেন, কিছু গৃহস্থালির কাজ এত পরিশ্রমের যে সেগুলো পুরুষের শারীরিক শক্তির জন্যও উপযুক্ত—যেমন কাঠ কাটা, পানি তোলা, ভারী জিনিস সরানো কিংবা ময়দা মাখা। অর্থাৎ বাড়ির কাজ ‘নারীর কাজ’ বলে চিরকালের জন্য নির্ধারিত নয়। প্রয়োজন হলে যে যার কাজ করতে পারে।
আজ আমরা হয়তো এটিকে খুব স্বাভাবিক মনে করি। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই সাধারণ কথাটিও একসময় বেশ গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা ছিল। তাহলে এত পুরোনো দার্শনিকদের বাড়ি নিয়ে ভাবনা আমাদের আজ কী শেখায়?
প্রথম শিক্ষা হলো—‘বাড়ি কোনো ছোট বিষয় নয়।’ আমরা যে মানুষ হয়ে উঠি, তার অনেকটাই নির্ধারিত হয় বাড়িতে। আমরা প্রথম সেখানে ভাষা শিখি, ভালোবাসা বুঝি, নিয়ম শিখি, ঝগড়া করি, ক্ষমা চাইতে শিখি এবং অন্যের যত্ন নিতে শিখি। দ্বিতীয় শিক্ষা হলো—‘বাড়ি ও সমাজ আলাদা নয়।’ একটি সমাজের মানুষ যেমন, তার পরিবারগুলোও অনেকটা তেমন। পরিবারে যদি সহযোগিতা থাকে, সমাজেও তার প্রভাব পড়তে পারে। পরিবারে যদি অসম্মান ও সহিংসতা থাকে, তার প্রভাবও সমাজে পৌঁছায়। তৃতীয় শিক্ষা হলো—‘ইতিহাসে আমরা সব কণ্ঠ শুনিনি।’ অ্যারিস্টটলের ‘পলিটিক্স’ বহু শতাব্দী ধরে পড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাড়ি ও নারীর ভূমিকা নিয়ে প্রাচীন অন্যান্য লেখকদের অনেক চিন্তা হারিয়ে গেছে, অবহেলিত হয়েছে অথবা দীর্ঘদিন পড়ানো হয়নি। ফলে ইতিহাসের একটি অংশ আমাদের কাছে বেশি পরিচিত, অন্য অংশ কম।
এটি অনেকটা এমন যে তুমি একটি বিশাল বইয়ের মাত্র কয়েকটি অধ্যায় পড়ে পুরো বইটির গল্প বলে দিচ্ছ। দর্শনের ইতিহাসও তেমন একটি বই। রাষ্ট্রের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতির ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ ও বিপ্লবের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষের জীবনের সবচেয়ে কাছের জায়গা—বাড়ির ইতিহাস—তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র তৈরি হয় মানুষের জন্য। আর সেই মানুষগুলো প্রথম মানুষ হতে শেখে কোথায়? বাড়িতে।
তাই বাড়ি শুধু একটি ভবন নয়। এটি মানুষের প্রথম বিদ্যালয়, প্রথম সমাজ, প্রথম সম্পর্কের জায়গা। রাষ্ট্রের আইন আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে, কিন্তু বাড়ির প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসও আমাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।হয়তো এ কারণেই প্রাচীন দর্শনের হারিয়ে যাওয়া এই প্রশ্নগুলো আবার পড়া দরকার। ‘একটি ভালো সমাজ কেমন হবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কখনো কখনো সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে বাড়ির দরজায় দাঁড়াতে হয়।’
সেখানেই হয়তো সমাজের সবচেয়ে ছোট, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসটি লেখা হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









