অয়নদের গ্রামের পাশেই ছোট্ট একটি বন। খুব বড় নয়, তবে সেখানে সারাবছরই নানা রকম ফুল ফোটে। বুনো জুঁই, টগর, বেলি, নাম না-জানা কত ফুল! ফুলের টানে প্রজাপতিও আসে অনেক। হলুদ, সাদা, কমলা, কালো—কত রঙের প্রজাপতি যে ওড়ে, তার হিসাব নেই।
কিন্তু তাদের মধ্যে একটি প্রজাপতি ছিল একেবারেই আলাদা। তার ডানায় যেন নীল আকাশের রং মেখে আছে। রোদ পড়লে ডানাগুলো চিকচিক করে ওঠে।
অয়ন প্রায়ই স্কুলে যাওয়ার পথে প্রজাপতিটিকে দেখত। আশ্চর্যের বিষয়, অন্য প্রজাপতির মতো সে ফুলে বসত না। বরং অয়নের সামনে সামনে একটু উড়ে গিয়ে থেমে থাকত। অয়ন কাছে পৌঁছালে আবার সামনে এগিয়ে যেত। কিছু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ কোথায় যেন মিলিয়ে যেত। এমন ঘটনা অনেক দিন চলল।
একদিন ছুটির বিকেলে অয়ন ঠিক করল, আজ সে দেখবেই নীল প্রজাপতিটি কোথায় যায়।
প্রজাপতিটি যেন তার অপেক্ষাতেই ছিল। অয়নকে দেখেই ধীরে ধীরে উড়তে শুরু করল। অয়নও পিছু নিল।
প্রথমে তারা কাঁচা পথ ধরে এগোল। তারপর বাঁশঝাড় পেরিয়ে ছোট্ট বনের ভেতরে ঢুকে গেল। বনটা বিকেলের রোদেও বেশ ছায়াঘেরা। গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো মাটিতে গোল গোল ছোপ ফেলেছে। বাতাসে পাখির ডাক আর পাতার মৃদু শব্দ।
প্রজাপতিটি খুব দ্রুত উড়ছিল না। মাঝেমধ্যে থেমে ডানা ঝাপটাচ্ছিল, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে অয়ন এখনও তার পেছনেই আছে। হঠাৎ সে একটি ঘন ঝোপের চারপাশে ঘুরতে শুরু করল।
অয়ন এগিয়ে গিয়ে শুনতে পেল ক্ষীণ একটা শব্দ।
কুঁই... কুঁই...
সে পাতা সরিয়ে দেখল, একটি ছোট্ট খরগোশের বাচ্চা ঝোপের মধ্যে আটকে আছে। তার একটি পা শক্ত লতায় জড়িয়ে গেছে। বের হওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু যত নড়েছে, লতা ততই শক্ত হয়ে পায়ে পেঁচিয়ে গেছে।
খরগোশের বাচ্চাটি ভয় পাওয়া চোখে অয়নের দিকে তাকিয়ে রইল।
অয়ন ধীরে ধীরে তার পাশে বসল।
ভয় পেয়ো না। আমি তোমাকে ছাড়িয়ে দিচ্ছি।
সে খুব সাবধানে লতাগুলো খুলতে লাগল। কয়েকবার চেষ্টা করার পর লতার শক্ত বাঁধন আলগা হয়ে গেল।
মুক্ত হতেই খরগোশের বাচ্চাটি কয়েক পা দূরে সরে দাঁড়াল। তারপর একবার ঘুরে অয়নের দিকে তাকাল। তার বড় বড় চোখে যেন স্বস্তির ঝিলিক। পরের মুহূর্তেই সে লাফিয়ে বনের গভীরে মিলিয়ে গেল।
অয়ন মুচকি হেসে চারদিকে তাকাল। কিন্তু নীল প্রজাপতিটিকে কোথাও দেখা গেল না। সে অনেকক্ষণ খুঁজল। গাছের ডালে, ফুলের কাছে, রোদের ফাঁকে—কোথাও নেই। যেন কাজ শেষ হতেই সে বাতাসের সঙ্গে মিলিয়ে গেছে।
পরদিন স্কুলে যাওয়ার সময় অয়ন আবার অপেক্ষা করল। না, নীল প্রজাপতিটি এল না।
একদিন, দুই দিন, তারপর এক সপ্তাহ কেটে গেল। তবু তার আর দেখা মিলল না। অয়নের একটু মন খারাপ হলো। সে ভাবতে লাগল, প্রজাপতিটি কি অন্য কোথাও চলে গেছে?
কয়েক দিন পরে এক সন্ধ্যায় অয়ন দাদুর সঙ্গে উঠোনে বসে ছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবছে। চারদিকে পাখিরা বাসায় ফিরছে।
অয়ন পুরো ঘটনাটা খুলে বলল।
দাদু মন দিয়ে শুনলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন,
ছোটবেলায় আমিও এমন একটি নীল প্রজাপতির গল্প শুনেছিলাম। সবাই বলে, কিছু প্রজাপতি নাকি শুধু ফুলের পথ চেনে না, দয়ার পথও চেনে। যখন কোনো অসহায় প্রাণী মানুষের সাহায্যের অপেক্ষায় থাকে, তখন তারা এমন কাউকে খুঁজে আনে, যার মন নরম।
অয়ন বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল, সত্যি, দাদু?
দাদু আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, কে জানে! সব গল্পের উত্তর খুঁজতে নেই। কিছু রহস্য বিশ্বাস করলেই বেশি সুন্দর লাগে।
সেদিনের পর থেকে অয়ন যখনই বনের পথে হাঁটত, শুধু ফুল আর প্রজাপতি দেখত না। কোথাও কোনো আহত পাখি পড়ে আছে কি না, কোনো ডাল ভেঙে বাসা নষ্ট হয়েছে কি না, কিংবা কোনো ছোট্ট প্রাণী সাহায্যের অপেক্ষায় আছে কি না—সেদিকেও তার চোখ থাকত।
একদিন সে পথের ধারে উল্টে পড়ে থাকা একটি কচ্ছপকে সোজা করে দিল। আরেকদিন ঝড়ে ভেঙে পড়া একটি বুলবুলির বাসা সাবধানে গাছের নিচু ডালে তুলে রাখল। বাসার ভেতর থেকে ছোট্ট ছানাগুলো তখন চিঁ চিঁ করে ডাকছিল। তার মনে হতো, হয়তো নীল প্রজাপতিটি কোথাও লুকিয়ে থেকে সব দেখছে।
বসন্তের এক সকালে অয়ন আবার সেই পথ দিয়ে স্কুলে যাচ্ছিল। হঠাৎ চোখের কোণে নীল এক ঝলক আলো দেখা দিল। সে মুখ তুলে দেখল, পরিচিত সেই নীল প্রজাপতি তার সামনে এসে কিছুক্ষণ ভেসে রইল। সকালের রোদে তার ডানাগুলো নীল রত্নের মতো ঝলমল করছিল।
প্রজাপতিটি এবার আর কোথাও নিয়ে গেল না। শুধু অয়নের চারপাশে একবার ধীরে ধীরে চক্কর দিল। তারপর কাছে ফুটে থাকা একটি সাদা বেলি ফুলের ওপর এক মুহূর্তের জন্য বসল। পরের মুহূর্তেই ডানা মেলে নীল আকাশের দিকে উড়ে গেল। অয়ন তাকে আর অনুসরণ করল না।
সে শুধু মুচকি হেসে হাত নেড়ে বলল, ধন্যবাদ, ছোট্ট বন্ধু।
প্রজাপতিটি দূরে একটি নীল বিন্দুর মতো মিলিয়ে গেল।
অয়ন জানত না, সে আবার কোনো দিন নীল প্রজাপতিটির দেখা পাবে কি না। তবে সেই দিন থেকে সে বুঝেছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পথগুলো চোখে দেখা যায় না। সেগুলো খুঁজে পাওয়া যায় একটি দয়ালু হৃদয়ের ভেতর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









