পৃথিবী আমাদের বেঁচে থাকার জায়গা। কিন্তু সেই জায়গাটিই ধীরে ধীরে এমন এক অঞ্চলে ঢুকে পড়ছে, যেখানে মানুষের নিরাপদে বেঁচে থাকা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
বন উজাড়, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, নদী ও জলাভূমির ওপর চাপ, রাসায়নিক দূষণ, প্লাস্টিকের বিস্তার—সব মিলিয়ে পৃথিবীর জীবনধারণের মৌলিক ব্যবস্থাগুলো এমন চাপে পড়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। বিজ্ঞানীদের সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, মানবসভ্যতার টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পৃথিবীর কয়েকটি মৌলিক সীমা ইতিমধ্যেই বিপজ্জনকভাবে অতিক্রম করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর নয়টি ‘প্ল্যানেটারি বাউন্ডারি’ বা গ্রহগত সীমা নির্ধারণ করেছেন। এগুলো আসলে পৃথিবীর এমন কিছু প্রাকৃতিক ব্যবস্থার নিরাপদ সীমা, যেগুলোর ভারসাম্য বজায় থাকলে মানুষসহ জীবজগত তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশে বিকশিত হতে পারে। ২০০৯ সালে এই ধারণাটি প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সর্বশেষ ‘প্ল্যানেটারি হেলথ চেক’ বলছে, নয়টির মধ্যে সাতটি সীমাই এখন নিরাপদ মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। শুধু ছাড়িয়ে যাওয়াই নয়—এই সাতটি ক্ষেত্রেই সীমা লঙ্ঘনের মাত্রা এখন পর্যন্ত নথিবদ্ধ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই সাতটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন, জীবমণ্ডলের অখণ্ডতার পরিবর্তন, ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তন, মিঠাপানির পরিবর্তন, পৃথিবীর জৈবরাসায়নিক চক্রে পরিবর্তন, নতুন ধরনের দূষণকারী পদার্থের বিস্তার এবং সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি। শেষের বিষয়টি গত বছর প্রথমবারের মতো নিরাপদ সীমার বাইরে চলে যায়।
অন্যদিকে, নয়টির মধ্যে মাত্র দুটি ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে—বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তর ক্ষয় এবং বায়ুমণ্ডলে অ্যারোসল বা সূক্ষ্ম কণার উপস্থিতি। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, অ্যারোসল বা বায়ুদূষণ এখনও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে গুরুতর সমস্যা হয়ে আছে।
এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন ৬০ জন বিজ্ঞানী। পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের অধীনে তাঁরা পৃথিবীর এই মৌলিক ‘নিরাপত্তাবলয়’গুলোর সর্বশেষ অবস্থা বিশ্লেষণ করেছেন।
প্রতিবেদনের প্রধান লেখক বরিস সাকশেভস্কির ভাষায়, প্রতিটি সীমার ওপর চাপ বাড়ছে। এর অর্থ হলো বড় আকারের, দীর্ঘস্থায়ী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়—এমন পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে সমস্যা মোকাবিলার জন্য মানুষের হাতে থাকা ভুলের সুযোগও কমে যাচ্ছে।
এই কথাটির অর্থ বুঝতে খুব দূরে যেতে হয় না।
কোনো নদী যখন একটানা দূষিত হয়, তার পানি শুধু নোংরা হয় না; সেই নদীর ওপর নির্ভর করা মানুষের জীবনও বদলে যায়। কোনো বন যখন টুকরো টুকরো হয়ে যায়, শুধু গাছ হারায় না—হারিয়ে যায় প্রাণীর আবাস, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা, স্থানীয় জলচক্র এবং মানুষের জীবিকার একটি অংশ। কোনো অঞ্চলে বৃষ্টি যখন অনিয়মিত হয়ে ওঠে, তার প্রভাব শুধু আবহাওয়ার খবরে থাকে না; তা কৃষকের জমি, বাজারের খাদ্যের দাম এবং একটি পরিবারের খাবারের প্লেটে গিয়ে পৌঁছায়।

গত ১০ হাজার বছরে মানবসভ্যতার বিকাশ ঘটেছে তুলনামূলক স্থিতিশীল একটি জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে। কৃষি গড়ে উঠেছে, শহর তৈরি হয়েছে, নদী ও মাটির সম্পদ ব্যবহার করে সভ্যতা বিস্তৃত হয়েছে। পৃথিবীর জলবায়ু মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল বলেই মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছুটা অনুমান করতে পেরেছে।
কিন্তু সেই স্থিতিশীলতাই এখন বদলে যাচ্ছে।
জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমছে। একই সময়ে প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে স্থলভাগ ও সমুদ্রে। কৃষি ও শহর সম্প্রসারণের জন্য বন, জলাভূমি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক আবাসস্থল ভেঙে টুকরো করা হচ্ছে।
এর ফলে শুধু প্রাণী ও উদ্ভিদ নয়, মানুষের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থা এত দিন মানুষের তৈরি ক্ষতির কিছুটা নিজেদের মধ্যে শোষণ করে নিয়েছে। বন ও সমুদ্র বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়েছে। জলাভূমি বন্যার পানি ধরে রেখেছে। মাটি পানি ও পুষ্টি ধরে রেখেছে। প্রকৃতি যেন মানুষের জন্য একটি অদৃশ্য বাফার হিসেবে কাজ করেছে।
কিন্তু সেই বাফারও এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
নতুন প্রতিবেদনের সতর্কতা হলো, জলবায়ু সংকট সামলাতে বন ও সমুদ্র যে ভূমিকা রাখছে, আমরা হয়তো তার সক্ষমতাকে অতিরিক্ত ধরে নিচ্ছি। তারা যতটা কার্বন শুষে নিতে পারবে বলে আমরা আশা করছি, বাস্তবে হয়তো ততটা পারবে না।
এর একটি বড় উদাহরণ আমাজন বনভূমি।
আমাজন শুধু পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বন নয়; এটি বিপুল পরিমাণ কার্বন ধরে রাখে এবং আঞ্চলিক জলচক্র নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বন উজাড়, আগুন ও উষ্ণায়নের চাপ একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যখন আমাজনের একটি বড় অংশ বনভূমি থেকে সাভানায় রূপান্তরিত হতে শুরু করবে।

যদি এমন কোনো ‘টিপিং পয়েন্ট’ বা সংকটসীমা অতিক্রম করে, তার প্রভাব শুধু দক্ষিণ আমেরিকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক জলবায়ু স্থিতিশীলতা, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।
এই সতর্কতা এসেছে এমন এক বছরে, যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রকৃতি যেন একই সঙ্গে একাধিক সংকেত পাঠাচ্ছে।
গত বছর পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। এ বছর ইউরোপজুড়ে রেকর্ড তাপমাত্রা ও দাবানল দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীষ্ম ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম। তিব্বত-নেপাল সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতি করেছে। সমুদ্রও তার নিজের সংকেত দিচ্ছে—অতিরিক্ত তাপ শোষণ করতে করতে বিশ্বের মহাসাগরগুলো নতুন নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড ছুঁয়েছে।
এই ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা দুর্যোগ হিসেবে দেখলে হয়তো তাদের যোগসূত্র চোখে পড়ে না। কোথাও বন্যা, কোথাও দাবানল, কোথাও তাপপ্রবাহ, কোথাও খরা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এগুলো একই বৃহত্তর পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রকাশ হতে পারে।
প্ল্যানেটারি গার্ডিয়ানস নামের বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী ও পরিবেশকর্মীদের জোটের চেয়ার হিন্দু ওমারু ইব্রাহিমের কথায়, এগুলো আলাদা আলাদা জরুরি অবস্থা নয়। পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চল থেকে যেন একই সময়ে একটি বার্তা আসছে—গ্রহের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তবু এই গল্পের শেষ এখানেই নয়।
জলবায়ুবিজ্ঞানী ও গবেষণাটির সহলেখক জোহান রকস্ট্রম মনে করেন, পরিস্থিতি কঠিন হলেও মানুষের হাতে এখনও প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সক্ষমতা রয়েছে। নিরাপদ সীমার মধ্যে ফিরে আসার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই পদক্ষেপ কত দ্রুত এবং কত ব্যাপকভাবে নিতে পারি।
কারণ ‘প্ল্যানেটারি বাউন্ডারি’ কোনো বিমূর্ত বৈজ্ঞানিক ধারণা নয়। এগুলো শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের সীমারেখা।
একটি নিরাপদ জলবায়ু মানে কৃষকের জন্য তুলনামূলক পূর্বানুমানযোগ্য মৌসুম। একটি সুস্থ নদী মানে পানির নিরাপত্তা। অক্ষত বন মানে জীববৈচিত্র্য, বৃষ্টির জলচক্র ও অসংখ্য মানুষের জীবিকা। সুস্থ সমুদ্র মানে খাদ্য, উপকূলীয় জীবিকা এবং বৈশ্বিক জলবায়ুর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।
সীমাগুলো যখন অতিক্রম করি, তখন শুধু পৃথিবীর কোনো বৈজ্ঞানিক সূচক বদলায় না। বদলে যায় মানুষের জীবনযাপনের শর্ত।
আর তাই পৃথিবীর স্বাস্থ্য নিয়ে এই প্রতিবেদন আসলে মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়েই একটি প্রতিবেদন। আমরা যে পরিবেশকে নিজেদের সম্পদ বলে ব্যবহার করেছি, সেই পরিবেশেরও কিছু সীমা আছে। সেই সীমাগুলো একের পর এক পেরিয়ে গেলে প্রকৃতি হয়তো আমাদের কোনো নোটিশ পাঠাবে না। তার বদলে নদী বদলাবে, বন শুকোবে, সমুদ্র উষ্ণ হবে, বৃষ্টি অনিশ্চিত হবে, খাদ্যের দাম বাড়বে—আর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে তাদের ওপর, যাদের সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য সবচেয়ে কম।
পৃথিবীর নিরাপদ সীমা তাই কেবল পৃথিবীকে বাঁচানোর প্রশ্ন নয়। শেষ পর্যন্ত এটি নির্ধারণ করবে—এই গ্রহে মানুষ কীভাবে, কোথায় এবং কতটা নিরাপদে বাঁচতে পারবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









