বহু মানুষ মহৎ গুণাবলি অর্জন করা এবং ভালো কাজের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের পিছিয়ে রাখে। আর এর জন্য অজুহাত হিসেবে ব্যস্ততা ও অভাব-অনটনের কথা বলে।
অথচ প্রকৃত সমস্যা অনেক সময় তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সংকল্পের দুর্বলতায় লুকিয়ে থাকে। অনেকেই ভুলে যায়, জীবনের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে না পারার অর্থ এই নয় যে তাকে পাহাড়ের পাদদেশে নেমে আসতে হবে। কোনো কাজের সম্পূর্ণটা অর্জন করতে না পারলেও তার বেশির ভাগ ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
মানুষ যদি কোনো কাজ করতে সক্ষম না হয়, তবু তার জন্য সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে থাকা জরুরি নয়। কেউ দানশীল হতে না পারলে তাকে কৃপণ হতে হবে কেন? সাহসী হতে না পারলে ভীরু হতে হবে কেন? জ্ঞানী হতে না পারলে অজ্ঞ হয়েই থাকতে হবে কেন?
কিছু মানুষ নিজেরা সৎ পথে চলতে পারে না, সত্কর্মশীলদের মতো কাজ করতে পারে না। তখন নিজেদের অক্ষমতা স্বীকার না করে তারা সত্কর্মশীলদের মর্যাদা ছোট করে দেখে এবং তাদের উপহাস করে। কোরআন মাজিদে এ ধরনের মানুষের আচরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপরাধীরা মুমিনদের নিয়ে হাসাহাসি করত।
আর যখন তারা তাদের পাশ দিয়ে যেত, তখন পরস্পর চোখ টিপে ইশারা করত। যখন তারা নিজেদের পরিবারের কাছে ফিরে যেত, তখন আনন্দ করতে করতে ফিরে যেত। আর যখন তারা মুমিনদের দেখত, তখন বলত, ‘নিশ্চয়ই এরা পথভ্রষ্ট।’(সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ২৯-৩২)
মানুষের মধ্যে এমন কথাও প্রচলিত আছে—কোনো ব্যক্তি নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় কিছু পথভ্রষ্ট লোক তাকে বিদ্রুপ করে বলে, ‘হুজুর, জান্নাতে গিয়ে আমাদের জন্যও দুই কাঠা জায়গা বুক করে রাখবেন!’
এ ধরনের বিদ্রুপের পেছনে অনেক সময় থাকে নিজের অক্ষমতা থেকে জন্ম নেওয়া বিদ্বেষ ও হিংসা। এই দুই ব্যাধি যখন মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেয়, তখন সেখানে আর মহৎ গুণাবলি ও সম্মানজনক চরিত্রের জন্য জায়গা অবশিষ্ট থাকে না।
ফলে মানুষ কল্যাণ ছেড়ে অকল্যাণের পথে যায়, সত্য ছেড়ে মিথ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং উত্তম চরিত্রের পরিবর্তে নিকৃষ্ট আচরণ গ্রহণ করে। অন্যদিকে যে মন মহৎ গুণাবলি অর্জনের স্বপ্ন দেখে, তার উচিত নয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া। মুমিনের মনোবল হবে দৃঢ়। ব্যর্থতা তাকে থামিয়ে দিতে পারবে না, হতাশা তাকে দুর্বল করতে পারবে না, আর অন্যের সাফল্য তার অন্তরে হিংসার আগুন জ্বালাবে না।
অন্যের মধ্যে কোনো কল্যাণ দেখতে পেলে কিভাবে আচরণ করতে হবে, সে বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আমাদের পথনির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ যার মাধ্যমে তোমাদের কাউকে অন্য কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, তোমরা তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কোরো না। পুরুষেরা যা অর্জন করেছে, তার অংশ তাদের জন্য আছে; আর নারীরা যা অর্জন করেছে, তার অংশ তাদের জন্য আছে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।’
(সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ৩২)
আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। কারণ তাঁর কাছে চাওয়া মানুষকে প্রতিটি আকাঙ্ক্ষার পেছনে অসহায়ভাবে ছুটে বেড়ানো থেকে রক্ষা করে। কোনো কিছু না পাওয়ার কারণে মন ভেঙে গেলেও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা মানুষকে আবার শক্তি জোগায়। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে চাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলে, সে চেষ্টা ও কাজ করা বন্ধ করে দেয় না। সে যদি পূর্ণতার শিখরে উঠতে না-ও পারে, তবু অধঃপতনের দিকে নেমে যায় না।
মুমিন নিজের আশপাশের মানুষের মধ্যে যেসব মহৎ গুণ দেখতে পায়, সেগুলো নিজে অর্জন করতে না পারলেও সেগুলোর প্রতি আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে না। কারণ সে জানে—কাজের মূল্যায়ন নিয়তের ভিত্তিতে হয়। কেউ আন্তরিক নিয়ত থাকা সত্ত্বেও কোনো ভালো কাজ করতে না পারলে, আল্লাহর কাছে সে কাজ সম্পাদনকারীর মতো প্রতিদান পেতে পারে।
ভালো কাজের সর্বনিম্ন স্তর হলো একটি আন্তরিক নিয়ত। কারণ মানুষ যখন কোনো ভালো কাজের নিয়ত নিয়ে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে থাকে, তখন সেই নিয়ত একসময় কাজে পরিণত হতে পারে। আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। এভাবেই আন্তরিক নিয়তের অধিকারী মুমিন ধীরে ধীরে আমলের পথে এগিয়ে যায় এবং একসময় মহৎ গুণাবলি অর্জন করে। অনুশীলনের মাধ্যমে স্বভাবও পরিবর্তিত হতে পারে।
আজকের পৃথিবীতে সফলতার সব উপাদানকে জাগিয়ে তোলা আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। আমাদের এমন মন চাই, যে হোঁচট খাওয়ার মুহূর্তেই আবার উঠে দাঁড়ায়; দিনের পর দিন নিজের ব্যর্থতা ও দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে শুধু কাঁদতে থাকে না। আমাদের এমন মানুষ প্রয়োজন, যারা অল্প অল্প করেও নিয়মিত কাজ করে যায়।
ফরাসিদের একটি কথার ভাবার্থ হলো—একটি সিংহ আসলে কয়েকটি হৃষ্টপুষ্ট ভেড়ার সমষ্টি মাত্র। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে দুর্বল মানুষরাও যখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করে, তখন তাদের শক্তি অপরিসীম হয়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের অল্প কিংবা ছোট কোনো ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে না করার শিক্ষা দিয়েছেন।
ছোট ছোট পাপও একত্র হয়ে মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তেমনি সামান্য একটি ভালো কাজও কখনো বড় কল্যাণের সূচনা হয়ে উঠতে পারে। রাতে দীর্ঘ সময় নামাজ পড়তে না পারলে ঘুমানোর আগে অন্তত দুই রাকাত নামাজ ও বিতর আদায় করা যায়।
প্রতিদিন এক পারা কোরআন পড়তে না পারলে অন্তত এক পৃষ্ঠা পড়া যায়। সুন্নাহর সব বিষয় আয়ত্ত করতে না পারলে অন্তত সুন্নাহর প্রকাশ্য ও পরিচিত বিষয়গুলো মেনে চলা যায়। বেশি অর্থ দান করতে না পারলে অন্তত অর্ধেক খেজুর দান করা যায়। সব পথে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করতে না পারলে নিজের স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানদের ভালো কাজের দাওয়াত দেওয়া যায়।
প্রতিটি মানুষ আল্লাহর এক বিশাল সম্ভাবনাময় সৃষ্টি। আল্লাহ সবাইকে অসংখ্য যোগ্যতা ও সামর্থ্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘অচিরেই আমি তাদের আমার নিদর্শনসমূহ দেখাব দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে, যতক্ষণ না তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে নিশ্চয়ই এটি সত্য।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৫৩)
তাই নিজের ভেতরের মহত্ত্ব ও সম্ভাবনাগুলো খুঁজে বের করা দরকার। আল্লাহ যেসব প্রতিভা দান করেছেন, সেগুলোকে বিকশিত করা প্রয়োজন। কারণ তিনি কাউকেই কোনো না কোনো যোগ্যতা ছাড়া সৃষ্টি করেননি। মনে রাখতে হবে যে আজকের ছোট্ট ভালো কাজটিই হয়তো আগামী দিনের বড় কল্যাণের সূচনা মাত্র।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









